বিশ্বের সেরা সব ট্রেকের ভিতরে অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেককে অন্যতম বিবেচনা করা হয়। অন্নপূর্ণা পর্বতসারির পাশ দিয়ে চলে যাওয়া এই ট্রেককে ট্রেকারদের স্বর্গও বলা যেতে পারে।  তবে সাম্প্রতিক কালে অব্যহত সড়ক নির্মাণ এই অনন্য ট্রেকের প্রাকৃতিক এবং নৈসর্গিক সৌন্দর্য ক্ষুন্ন করছে। তারপরেও গাড়ি চলার রাস্তা এড়িয়ে ট্রেকিং ট্রেইল ধরে তীব্র খরস্রোতা মারসিয়াংদি নদীর তীর ঘেঁষে অন্নপূর্ণা পর্বতসারি উপত্যাকা ঘিরে চলা  এই ট্রেকে প্রকৃতির এমন সব অসামান্য বৈচিত্র দেখা যায় যা বর্ণনাতীত এবং প্রকৃত প্রস্তাবেই অতুলনীয়।

এই ট্রেক চারটি অঞ্চলের ভিতরে দিয়ে চলে গিয়েছেঃ লামজুং, মানাং, মুসতাং এবং মায়াগদি। কম উচ্চতার লামজুং এবং মায়াগদি দুটিই মুলত হিন্দু অধ্যুষিত এবং প্রায় সবুজ  গ্রীষ্মমন্ডলীয় উপত্যকা, আর এখানকার গ্রামের অধিবাসীরা অধিকাংশই পর্বতের ঢালে জুম চাষ করে।

মানাং এবং মুসতাং তুলনামূলকভাবে বেশী উচ্চতায় এবং এগুলো মূলত তিব্বতিয়ান বৌদ্ধ অধ্যুষিত। মানাং এর লোকেরা গুরুং (তিব্বতি বংশোদ্ভূত নয়) এবং তারা তাদের অদ্বিতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং নিম্নতর ভূমি গুরঙ ও তিব্বতীয় সংস্কৃতির সংমিশ্রন নিয়ে গর্বিত।

মুস্তাং অঞ্চলকে দুই ভাগে বিভক্ত, লোয়ার মুস্তাং এবং আপার মুস্তাং। মুক্তিনাথ, কাগবেনি এবং জমসম এলাকা লোয়ার মুস্তাং এর অন্তর্ভুক্ত এবং কাগবেনি থেকে উত্তরে চীন সীমান্ত পর্যন্ত পুরোটাই আপার মুস্তাং এর অন্তর্ভুক্ত।

মুসতাং এর মানুষ নিজেদের তিব্বতীয় বলে পরিচয় দেয় এবং আদতে মুসতাং ঐতিহাসিকভাবেই তিব্বতের অংশ। এছাড়া মুস্তাং এ এখনো প্রাচীন বোনপো ধর্মের চর্চা আছে যা একমাত্র এখানেই দেখতে পাওয়া যায় এবং এই সব ঐতিহাসিক নিদর্শন, জনপদ এবং এই প্রাচীন ধর্মের চর্চা যাতে সংরক্ষিত থাকে তাই আপার মুস্তাং কে নেপাল সরকার পর্যটকদের জন্য সংরক্ষিত করে রেখেছে তবে নিষিদ্ধ করেনি। শর্ত সাপেক্ষে – যেমন অবশ্যই একজন গাইড (নেপাল গাইড এসোসিয়েশন কর্তৃক নিবন্ধিত) নিয়ে আর নুন্যতম দশ দিন থাকার খরচ ৫০ মার্কিন ডলার প্রতিদিন হিসেবে ৫০০ মার্কিন ডলার দিয়ে আপার মুস্তাং এ ট্রেক করার জন্য অনুমতি পাওয়ায় যায় । বোনপো ধর্মের লোকেরা জমসমের কাছে থিনি আর লুপরা এবং কোবাং এর কাছে নারগন এলাকায় বসবাস করে।

এই ট্রেক সাধারণত ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিক থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় অর্থাৎ বেসিশহর স্থানীয় ভাষায় বানসিসাহার) থেকে বেনি পর্যন্ত। তবে মুক্তিনাথ থেকে জিপে জমসম গিয়ে সেখান থেকে বিমান অথবা বাসে পোখারা চলে যাওয়াই এখনকার রেওয়াজ হয়ে গিয়েছে। তারপরেও অনেকে মুক্তিনাথ থেকে ট্রেক করে কাগবেনি হয়ে জমসম পর্যন্ত আসে। আর অনেকেই জমসম থেকে গাসা এমনকি বেনি পর্যন্ত ট্রেক করে যায়।

তবে এর উল্টো রেওয়াজ ও চালু আছে, অর্থাৎ পোখারা থেকে বিমান / বাসে জমসম গিয়ে সেখান থেকে জীপে মুক্তিনাথ পৌছে সেখান থেকেই ঘড়ির কাঁটার দিকে ট্রেক করে বেসিশহর চলে আসা।

এই ট্রেকের সবচাইতে উঁচু যায়গা হচ্ছে থরং লা পাস (৫৪১৬ মি), তবে ইচ্ছে করলে দুটো সাইড ট্রেইল অর্থাৎ কাং লা পাস এবং তিলিচো লেইক ট্রেক করলে এই ট্রেকে তিন তিনবার ৫০০০ মিটারের উপরে আরোহন করা যাবে।

ট্রেকটি নিম্নলিখিত পর্বতগুলোর পাশ দিয়ে যায়ঃ মানাসলু (একটি ৮,০০০ মিটারের বেশী উঁচু পর্বত), ল্যাংটাং হিমাল, অন্নপূর্ণা ২ ও অন্নপূর্ণা ৪, অন্নপূর্ণা ৩ ও গঙ্গাপূর্ণা এবং অবশ্যই অন্নপূর্না ১ ও ধবলগিরি- যে দুইটি আট হাজার মিটারের বেশী উচ্চতার পর্বতের মাঝখান দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর গিরিখাত প্রবাহিত হচ্ছে। এই ট্রেকের শেষ মাথায় পুন পর্বত, যেখান থেকে এই পুরো অন্নপূর্ণা পর্বতসারি, গঙ্গাপূর্ণা সাথে মাছাপুছছর এবং ধাউলাগিড়ি দেখা যায়।

ট্রেকটি বৌদ্ধ গ্রাম এবং হিন্দুদের পবিত্র স্থানের মাঝখান দিয়ে গেছে যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মুক্তিনাথ-যেটি হিন্দু এবং বৌদ্ধ উভয়ের কাছেই পবিত্র স্থান এবং এই অঞ্চলের অন্যতম পুরোন মঠ আছে ব্রাগা তে। ধারাপানি থেকে কাগবেনী পর্যন্ত দ্যা গ্রেট হিমালয় ট্রেইল ধরে অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেক নেপালকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সংযুক্ত করেছে।

এই ট্রেকের পূর্বদিকের অংশ মারসিয়াংদি নদীর উজান ধরে এগিয়ে গিয়েছে, যেই নদীর উৎপত্তিস্থল মানাং এর কাছাকাছি। সেখানে পৌছতে বেশ কয়েক দিনের পর্বতাহোরণ প্রয়োজন। এরপরে রুটটি থরং লা পাসের উপর দিয়ে একটি কষ্টকর দিনের হাইকিং শেষে অন্যদিকে নামার পর এটি কালিগান্ধাকি নদীতে মেশে । থরং লা পাস পার হবার পরে হাটার বদলে মোটরসাইকেল অথবা বাইসাইকেল ভাড়া নেয়া যায় (মুক্তিনাথ বা জমসমে), এবং নিচের দিকে জিপের রাস্তা বা বিকল্প ট্রেইল দিয়ে বাইকচালিয়ে নেমে আসা যায়। চমৎকার দৃশ্যাবলী এবং চার হাজার মিটার উঁচু থেকে ১২০০ মিটারে নেমে আসার কারনে মুসতাং দুনিয়ার অন্যতম প্রধান মাউন্টেন-বাইকিং এর স্থান হয়ে উঠছে। এই কারনে রাস্তা নির্মাণ এই অঞ্চলের পর্যটনের জন্য সুফল বয়ে আনছে। ট্রেকের শেষে কয়েকটি বিকল্প আছেঃ নদী বেয়ে আরো সামনে বেনীর রাস্তা ধরে যাওয়া এবং পোখরাগামী বাস ধরা, অথবা অন্নপূর্না বেস ক্যাম্পের (এবিসি ক্যাম্প)দিকে, যেটিকে অন্নপূর্না স্যংচুয়ারি ট্র্যাক বলে, সেদিকে একটি ট্র্যাক যোগ করা।

এটি একটি ‘টিহাউজ ট্রেক’, অর্থাৎ পুরো রুটের মধ্যে ২/৩ ঘন্টা ট্রেকিং করেলেই ছোট বড় গ্রাম পাওয়া যাবে যেগুলোতে ট্যুরিস্টদের থাকার জন্য লজ এবং খাবার জন্য রেস্তোরা আছে। প্রতিটি ট্যুরিস্ট লজেই থাকা এবং খাবারের ব্যবস্থা আছে।  লজগুলোর ভাড়া তুলনামূলক কম, কারন খাবার ও পানীয় বিক্রি করে বেশী লাভ করতে চান লজের মালিকেরা আর এই জন্যই কিছু কিছু লজে দু বেলা খাবার চুক্তিতে ফ্রিতেও থাকা যায়। লজগুলোতে সাধারণত বিদ্যুৎ থাকে তবে সব জায়গাতেই ইন্টারনেট ওয়াইফাই পাওয়া দুস্কর এবং উচ্চতাভেদে ইন্টারনেট ব্যবহারের মুল্যও বাড়তে থাকে। সাধারণত যে সব লজে বিদ্যুৎ থাকে যেগুলোতে মোবাইল, ইলেক্ট্রনিক গেজেট, ক্যামেরার ব্যাটারি ইত্যাদি চার্জের ব্যবস্থা থাকে।

সব লজের টয়লেটেই আধুনিক হাই কমোডের ব্যবস্থা থাকে না তবে স্বীকৃত হোটেলগুলোতে থাকে। কিছু কিছু জায়গায় অবশ্য সব ধরনের টয়লেটের জন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে, যেমন খোলা, রাতে আলোর ব্যবস্থা নেই, পানির ব্যবস্থা নেই অথবা পানি ঠান্ডায় বরফ হয়ে যাওয়া এবং সর্বোপরি দুর্গন্ধ। কিন্ত সেগুলো সংখ্যায় খুবই কম এবং যেখানে উচ্চতা আর ঠান্ডায় ত্রাহি মধুসুদন অবস্থা সেখানে টয়লেটের সুবিধা অসুবিধাগুলো বেশ গৌণ পর্যায়ে পরে। এছাড়া এই লজগুলো প্রতিনিয়ত একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে সুবিধা বাড়াচ্ছে, যেখানে আগে ভালো টয়লেট ছিল না সেখানে এখন হাই কমোড আর ওয়াইফাই আছে, তাই ট্রেকে কোথাও থাকার আগে লজগুলো ঘুরে দেখে বাছাই করে নেয়া ভালো।

রাউট ম্যাপ (মাউস ক্লিক / ট্যাপ করলে সচল হবে)

 

খরচ
যদি আপনি খুব হিসেবী ট্রেকার হন তবে দিনপ্রতি ১২০০ / ১৫০০ নেপালী রুপিতে আপনার চলে যাবে, তবে এর সাথে সুবিধা বাড়াতে থাকলে খরচ ও বেড়ে যাবে যেমন দু কাপ চা খেলেও ১০০ রুপি লেগে যেতে পারে আর সাথে মোবাইল / ব্যাটারি চার্জ – ওয়াইফাই ইত্যাদি ত আছেই। খেয়াল রাখা ভালো যে অন্নপূর্ণা সংরক্ষিত এলাকার নিয়ন্ত্রকদের চেষ্টা সত্ত্বেও কিছু কিছু জায়গায় অত্যাধিক খরচ চোখ কপালে তোলার মত । কোন কারনে তাল এবং চামে অঞ্চলের মাঝামাঝি এলাকা চামে এবং মানাং এর থেকে অনেক বেশি খরুচে, যদিও দ্বিতীয়টি অধিকতর দুর্গম! যেহেতু একটি গ্রামে দাম প্রায় নির্দিষ্ট করা থাকে তাই কম দামের আশায় একই গ্রামে ঘুরে খুব একটা লাভ নেই, আর ট্রেক করে গ্রামে প্রবেশ করে প্রথমে চোখে পরা  লজে না থামাই ভালো, এতে গ্রামটিতে ট্রেকারদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিশ্চিত হয়। বেশীরভাই সময়েই সবচেয়ে সুন্দর লজগুলো গ্রামের পেছন দিকে অবস্থিত হয়। সাধারনত এই অঞ্চলটি এভারেষ্ট বেস ক্যম্প ট্রেকিং অঞ্চলের চেয়ে অনেক সস্তা।

খাওয়া
বেশিরভাগ লজের মেনু প্রায় একই রকম, এমনকি সবগুলো মেনুর লিস্টও একই রকম, স্রেফ লজের নাম টা ভিন্ন হয়। অবশ্য কোন কোন লজে উন্নতমানের ইউরোপিয়ান স্টাইলের পাস্তা, ন্যুডুলস আপেল পাই আর স্যান্ডউইচ থাকে। সাধারন মেনুতে থাকে ডাল ভাত(অতিরিক্ত সহ!) এবং নানাধরনের ফ্রাইড রাইস, চাউমিন, ফ্রাইড পটেটো, পিজা, স্প্যাগেটি/মারকোনি, ভারতীয় ডিস, স্যান্ডউইচ, ওমলেট, টোষ্ট, মুসেলি এবং কখনো কখনো বার্গার, চকোলেট বন, সিনামন বন ইত্যাদি।

তবে উপমহাদেশের ট্রেকারদের জন্য এই খাবার গুলো অচিরেই বিরক্তিকর হয়ে উঠবে, কারন সচরাচর এই এলাকার অধিবাসীরা একটু বেশী ঝাল এবং মশলাযুক্ত খাবার পছন্দ করে না। তাই শেষ পর্যন্ত ডাল-ভাত মেনুই তাদের পছন্দ। তবে কেউ নেপালে আসার সময়ই শুকনা মরিচ ভেজে এয়ারটাইট বক্সে নিয়ে আসতে পারে সাথে মরিচের গুড়ো সহ লবন / বিট লবন ইত্যাদি মিশিয়ে, তাহলে খাবারে অরুচি ধরবে না।

থাকা
বেশিরভাগ গ্রামেই এমন কিছু লজ পাবেন যেখানে দুবেলা খাওয়া নিশ্চিত করলে থাকা ফ্রি পাবেন তবে সেগুলো জিজ্ঞেস করে নিতে হবে বিনয়ের সাথে, কোনরকম জোর জবরদস্তি করা থেকে বিরত থাকা উচিত। সম্প্রতি এমন জোর জবরদস্তি করায় এক লজের নারী মালিক ট্রেকারদের দিকে লাঠি নিয়ে তেড়ে যাবার ভিডিও ডেইলি মেইলে প্রকাশ পেয়েছিল।

লজগুলোর প্রতি রুমে সাধারণত তিন থেকে চারটা করে বেড থাকে, তবে স্বীকৃত হোটেলগুলোতে ডাবল বেড আর ডরমেটোরি থাকে। ইচ্ছে করলে প্রতি রুমে অতিরিক্ত একজন থাকা যায়, তবে লজের মালিক কে জানাতে হবে যে সেটার জন্য অতিরিক্ত কম্বল আর বালিশের ব্যবস্থা আছে কিনা। ট্রেকের কিছু এলাকা আছে যেখানে ঠান্ডা অনেক বেশী যেমন তিলিচো বেস ক্যাম্প,  ইয়াক খারকা, থরং ফেদি এবং থরং হাই ক্যাম্প, এই সব জায়গার লজ গুলোতে দুটি কম্বল দেয়া হয় আর চাইলে অতিরিক্ত পাওয়ায় যায়।

সূচী
অভিজ্ঞ অথবা নবীন যে কোন ধরণের ট্রেকারদের ক্ষেত্রে এই ট্রেকে পোর্টার এবং গাইডের খুব বেশী প্রয়োজন নেই আর এই ট্রেকে সোলো ট্রেকিং করা যায় অর্থাৎ সরকারী ভাবে গাইড এবং পোর্টার নেয়ার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তারপরেও ব্যাকপ্যাক পোর্টারকে দিয়ে ফটোগ্রাফি ট্রেকিং অথবা ভারি ডাউন স্লিপিং ব্যাগ এবং বাড়তি কোন জিনিস অথবা স্রেফ নিজের সুবিধার জন্য  পোখারা অথবা কাঠমান্ডুর অনেক ট্রাভেল এজেন্সি কিংবা শহর বা সার্কিট থেকে পোর্টার ভাড়া করা যায়। অনেক সময় যাত্রী বা পণ্য পরিবহনের জন্য খচ্চর ভাড়া করা যায় আর বেসিশহর থেকে মানাং পর্যন্ত ত ফোরহুল ড্রাইভ জীপই যায় । একটি ক্লাসিক ‘টি-হাউস ট্রেকে’ গ্রাম থেকে গ্রামে ঘোরার জন্য ট্রেকারদের খাবার কিংবা ক্যাম্পিং ইকুইপমেন্ট বহন করতে হয় না, যদিও অনেক ট্রেকার তারপরেও সেগুলো বহন করতে পছন্দ করেন তাদের ক্যাম্পিং / টেন্টিং ট্যুরের জন্য।

পুরো ট্রেইলজুড়ে সমস্ত গ্রামেই গেষ্টহাউসগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, ফলে আপনি আপনার মনমতো গতিতে চলাফেরা ও সৌন্দর্য আস্বাদন করতে পারবেন। বেসিশহর থেকে ভুল্ভুলে পর্যন্ত লোকাল বাস চলাচল করে। বেসিশহর থেকে নগাদির ট্রেকিং ট্রেইলটি খুবই মনোহর। এই ট্রেক অনেকটা জঙ্গুলে অনুভূতি দেয় এবং পরবর্তী দিনগুলোতে যেরকম বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রাকৃতিক অবস্থার সাথে পরিচিত হতে হবে এটা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তবে ইদানিং মারসিয়াংদি নদী ঘিরে জলবিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপিত হওয়ায় বড় বড় ট্রাক চলার জন্য রাস্তার বেশ উন্নতি হলেও প্রচন্ড ধুলোবালি আর ধীরে ধীরে চলার কারনে স্রেফ স্থানিয়রা ছাড়া এই ট্রেইলে বাসে ট্যুরিস্ট খুব কম যায় আর পায়ে হেঁটে প্রাকৃতিক বৈচিত্র দেখে যাওয়ার সাথে কোন কিছুর তুলনাই চলেনা।

আপনি নিচু এলাকায় জোরে হাটার চেষ্টা করতে পারেন, এর ফলে উঁচু এলাকায় অভ্যস্ত হয়ে নেয়া ও আস্তে হাটার সুযোগ ও সময় পাওয়া যাবে। উদাহরণস্বরুপ মানাং এ দুইদিন বেশী কাটানো যায় এবং এই বাড়তি সময় কাজে লাগিয়ে এর আশেপাশে অনেকগুলো চূড়ার একটিতে উঠে আবার নেমে আসা যায়। এতে করে শরীরের লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও এর ফলে আপনি মানাং এ মারসায়ান্দি নদীর উৎসমুখ দেখারও সময় পাবেন। পিয়াসাং থেকে ঘাইয়ারু এবং গাওয়াল হয়ে মানাং গেলে এবং ঐ দুই গ্রামের একটিতে রাতে থাকলে এক্লেমাটাইজেশন হয়ে যাবে। যেহেতু ঐ দুইটি গ্রাম মানাং এর থেকে উঁচুতে অবস্থিত, তাই মানাং এর উচ্চতায় এক্লেমাটাইজেশনের জন্য অতিরিক্ত একদিন খরচ হবে না। এই ট্রেকের সেরা জিনিস হচ্ছে এর চারধারে দারুন সব দৃশ্য। শুরুটা হবে বেসিশহর এর গ্রীষ্মমন্ডলীয় বন থেকে, মানাং এর কাছে গঙ্গাপূর্ণা গ্লেশিয়ার এবং এর পরে থরং লা এর তুষাররেখা এবং তার পরে মুস্তাং ও মুক্তিনাথের নিচু ল্যান্ডস্কেইপ ধরে যাওয়া।

বেসিশহর(৮২০ মিটার) থেকে খুদিঃ ৭ কিলোমিটার, ২ ঘণ্টা
কাঠমান্ডু থেকে বেসিশহর কয়েকভাবে যাওয়া যায়।কাঠমান্ডু শহরের ট্যুরিস্ট বাস পার্ক থেকে ভোর ৬টা থেকে ৭ঃ৩০ মিনিট পর্যন্ত ট্যুরিস্ট বাস গুলো পোখারা, বেসিশহর এবং অন্যান্য জেলার দিকে ছেড়ে যায়, সেখান থেকে বাসে সরাসরি বেসিশহয় যাওয়া যায়। আবার কালানকি বাসস্ট্যান্ড, যেখানে আসলে দুটো মাক্রোবাস স্ট্যান্ড আছে, যেখান থেকেও পোখারা এবং বেসিশহরের দিকে যাওয়া যায়। আর কালানকি থেকে বেসিশহরের সরাসরি গাড়ী না পেলে পোখারার গাড়িতে চড়ে ‘ডুমরে’ নামক একটি জায়গাতে নেমে যেতে হবে। ডুমরে হচ্ছে কাঠমান্ডু আর পোখারা মাঝামাঝি একটি জায়গা, যেখান থেকে আরেকটি রাস্তা আলাদা হয়ে উত্তরে বেসিশহরের দিকে চলে গিয়েছে। ডুমরে থেকে কোন লোকাল বাসে বেসিশহর যাওয়া যায়।

কাঠমান্ডু থেকে বাস যদি দুপুরবেলায় বেসিশহর নামিয়ে দেয় তাহলে বেসিশহরে Permit আর TIMS এর কাজ সেরে হাল্কা নাস্তা করে একটু হেঁটেই খুদি পৌছে যাওয়াই সব চাইতে ভালো। সার্ক (SAARC) ভুক্ত দেশের জন্য পারমিট ২০০ রুপি আর টিআইএমএস ৬০০ রুপি, সাথে আপনার পাসপোর্ট সাইজের ৪ কপি ছবি থাকতে হবে দুটো কাগজে লাগানোর জন্য।

বেসিশহর

বেসিশহর থেকে দেখা

খুদি’র লজ গুলো খুব সাধারন এবং বেসিশহরের তুলনায় অনেক সস্তা। খুদি না গিয়ে বেসিশহর থেকে যদি পরের দিন রউনা দেন তাহলে এমনিতেই দেরি হয়ে যাবে যদি কাঠমান্ডু থেকে Permit আর TIMS না করে এনে থাকেন, কারন বেসিশহরের এই অফিস গুলো খোলে সকাল আটটায়। একে ত সময় নষ্ট তার উপরে সকালে খাঁড়া রোদের উপরে বাহুনডান্ডা পর্যন্ত উঠতে গেলে বেশ কষ্টই হতে পারে প্রথম দিন। তাই আগেই কিছু পথ পাড়ি দিয়ে ট্রেকে ঢুকে যাওয়াই ভালো সিদ্ধান্ত।

খুদি (৭৯০ মিটার) ভূলভূলে: ২ কিমি,  ০.৩০ ঘন্টা

ভুল্ভুলে (৮৪০ মিটার) থেকে নগাদি:৪ কিমি, ১.১৫ ঘন্টা
সকালে নগাদি থেকে বরফে ছাওয়া উঁচু পর্বতের খুব সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়।

ভুলভুলে

ভুলভুলে থেকে নগাদি যাবার পথে

নগাদি (৮৯০ মিটার) বাহুনডান্ডা: ৪ কিমি, ১.৪৫ ঘন্টা

বাহুনডান্ডা (১৩১০ মিটার) থেকে গেরমু: ৫ কিমি,  ১.৩০ ঘন্টা

ঘেরমু (১১৩০ মিটার) থেকে জগৎ: ৩ কিমি,  ১.৩০ ঘন্টা
ঘেরমু এর অবস্থান একটি খোলা উপত্যকায় হওয়ায় এখান থেকে আশেপাশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র আর দুরে উঁচু পর্বতের দৃশ্য দেখা যায় এবং জগতের চাইতে এখানে থাকাটা অনেক অনেক ভালো। জগত একটি অপরিস্কার ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম এবং এটা একটা উঁচু সংকীর্ণ ঢালে অবস্থিত হওয়ায় এক লজ থেকে আরেক লজে যেতেই বেশ কষ্টকর হাইকিং হয়ে যায়।

জগৎ (১৩০০ মিটার) থেকে চামজে: ৪ কিমি, ১.০০ ঘন্টা
চামজে থেকে একটু বারলেই হাতের ডানে অনেক গুলো ঝর্না  দেখা যায় যেগুলোর ভিতরে একটি ঝর্না বেশ বড় এবং তন্ময় হয়ে তাকিয়ে দেখার মত। এই ঝরনার দৃশ্য দেখার জন্য এখানে টিহাউজ এবং চারিদিকে কাঁচ দেয়া জানালার রেস্টুরেন্ট আছে যাতে বসে চা/কফি খেয়ে ঝর্ণার দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

চামজে ঝর্না

 

চামজে (১৩৮৫ মিটার) তাল: ৫ কিমি,  ২.৩০ ঘন্টা
মারসিয়াংদি নদীতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বাধের পাশে একটি উন্মুক্ত উপত্যকায় তাল গ্রামের অবস্থান। এখানে একটি নয়নাভিরাম উঁচু পাহাড়ি ঝর্না আছে যার উৎপত্তিস্থলের বেশে কাছেই রাস্তা করে দেয়া আছে উঠার জন্য।

সাবধানতাঃ ঝর্ণার পাশের উঠার রাস্তাটি অত্যন্ত খাঁড়া এবং পানিতে বেশ পিচ্ছিল হয়ে থাকে, তাই সেখানে উঠতে গেলে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরী। ট্রেকিং করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত অযথা আহত হওয়ার মত হতাশা আর কিছুই হতে পারে না।

উপর থেকে দেখা তাল

তাল (১৭০০ মিটার) কার্তে: ৪ কিমি, ১.৩০ ঘন্টা

কারতে (১৮৭০ মি) ধারাপানি থেকে: ২ কিমি, ১.০০ ঘন্টা
দুপাশের দুটো গভীর গিরিখাদের শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্যের মাঝে ধারাপানি অবস্থিত। এখান থেকে ডান পাশের উপত্যকা ধরে একটা সাইড ট্রেইল আছে যা তিলজে, খারচে, ফুকতু খারকা হয়ে বিমথাং পর্যন্ত গিয়েছে। এই সাইড ট্রেইলটি মানাসলু ট্রেক / মানাসলু সার্কিট ট্রেকের শেষ অংশ, অর্থাৎ মানাসলু সার্কিট ট্রেকের সরবোচ্চ স্থান লারকে লা পার হয়ে বিমথাং এসে পরে এই ট্রেইলেই ধারাপানি হয়ে বেসিশহর ফিরে যায় অথবা কেউ কেউ মানাসলু সার্কিট করে এসে ধারাপানি থেকে আবার অন্নপূর্ণা সার্কিটে যুক্ত হয়ে সামনে এগিয়ে যায়।

*** তিব্বতীয় ভাষায় থাং মানে সমতল জায়গা।

ধারাপানি (১৯০০ মিটার)থেকে বাগারচাপঃ ২ কিলোমিটার, ১ ঘন্টা

বাগারচাপ (২১৬০ মিটার) থেকে দানাকইয়ুঃ ২ কিমি, ০.৪৫ ঘন্টা

দানাকুইয়ু (২২০০ মিটার) থেকে তিমাংঃ ৪ কিমি ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট
তিমাং খুব জনপ্রিয় কোন গ্রাম নয় কিন্ত তিমাং থেকে আপনি এক পাশে সবুজ পর্বতের মাঝে মেঘের খেলা দেখতে পাবেন আর তার পিছনে পাবেন বরফ আচ্ছাদিত  সব পর্বতের চুড়া। শান্ত এই গ্রামটিতে একদম স্থানীয়ভাবে তৈরি খাবার স্থানীয়দের সাথে বসেই কোন কিচেনের চুলার পাশে বসে খেতে পারবেন। এমনকি এখানে এক রাত থাকাও যেতে পারে যদি সময় থাকে কারন মারসিয়াংদি নদীর ধারে স্রোতের গর্জন আর বাতাসের শিষে এখানে সব সময়ই একটি নৈসর্গিক পরিবেশ বিরাজ করে।

তিমাং থেকে দেখা সবুজ পর্বতের মাঝে মেঘের খেলা

তিমাং (২৬২৭ মিটার) থেকে থানচক: ৩.৬ কিমি, ১ ঘন্টা

থানচক (২৬৬০ মিটার) থেকে কোতো: ৩ কিমি, ৫০ মিনিট
কোতো হচ্ছে ছোট্ট, ছিমছাম, শান্ত এবং পরিষ্কার একটি গ্রাম, যেখান থেকে দূরের সাদা পর্বতগুলোর এক অবর্ণনীয় রুপ দেখা যায় আর সাথে আছে তিব্বতীয় বৌদ্ধ মঠ। সামনে চামে এর মত ব্যস্ত, অশান্ত এবং ঘিঞ্জি এলাকার চাইতে কোতোতে রাতে থেকে পরের দিন দু ঘন্টা পিছনে থেকে ট্রেক করলে ক্ষতি নেই।

কোতো

কোতোঃ এই চেকপোস্টের ডান দিক দিয়েই নার-ফু ভ্যালির রাস্তা চলে গিয়েছে, আর বামে চামে এর রাস্তা

কোতো (২৬২২ মিটার) থেকে চামে: ২ কিমি, ০.৪৫  ঘন্টা
চামে তে বেশ ভালো এবং বিভিন্ন রকমের গেস্ট হাউজ লজ আছে যার কয়েকটা স্বীকৃত হোটেল। তার ভিতরে রয়েল টি গার্ডেন এবং মারসিয়াংদি মান্দালা অন্যতম, যেখানে গ্যাসে চালিত হট শাওয়ার, আধুনিক পরিষ্কার টয়লেট, রুম হিটার অথবা ফায়ার প্লেস থেকে শুরু করা নানা সুবিধা রয়েছে, আর বিভিন্ন পদের মুখরোচক ইউরোপিয়ান এবং নেপালি স্টাইলের সুস্বাদু খাবার ত আছেই। এখানে সরকারী ফার্মেসি আছে যেখান থেকে ট্রেকাররা বিনামুল্যে ঔষধ এবং সেবা নিতে পারেন।

(সাইড ট্রেক) নার-ফু ভ্যালি
কোতো তে একটি ACAP চেকপোস্ট আছে যার ডান দিক দিয়ে নার-ফু ভ্যালি ট্রেকের ট্রেইল চলে গিয়েছে। এটি একটি ট্রেকিং ট্রেইল। ট্রেকারদের জন্য নার-ফু ভ্যালি ট্রেক উন্মুক্ত করে দেয়া হয় ২০০২ সালে। এর আগে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে এই নার এবং ফু গ্রামে বিদেশী ট্রেকার দের প্রবেশ নিষেধ ছিল। এখনো অবশ্য এটাকে সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবেই পরিচালনা করা যায়, অর্থাৎ বিদেশী ট্রেকার দের অবশ্যই গাইড নিয়ে এবং অন্নপূর্ণা সংরক্ষিত এলাকার সাধারন ফি ছাড়াও এই ট্রেকের জন্য অতিরিক্ত ৫০ মার্কিন ডলার ফি পরিশোধ করতে হয় এবং এটা অন্নপূর্ণা ট্রেকের পারমিট নেবার সময় দিতে হয়।

৪০০০ মিটার উচ্চতায় ফুগাও এবং নার নামের এই দুই গ্রামে পুরোপুরিভাবে তিব্বতীয় সভ্যতা এবং সংস্কৃতি বিদ্যমান। এখানে এই ট্রেকের পূর্ববর্তী এবং পরিবর্তী যে কোন টিহাউজের তুলনায় সুযোগসুবিধা একদম সাধারন মানের। এই গ্রামগুলোতে এক রাত থাকলে ১ দিনের এক্লেমাটাইজেশন হবে। এই ট্রেইল কাং লা পাস হয়ে গাওয়াল এ গিয়ে মিশেছে। গাওয়াল গিয়ে আরেক রাত থাকলে পুরো দুই দিনের এক্লেমাটাইজেশন হয়ে যাবে অর্থাৎ এর পরে মানাং এ থেকে এক্লেমাটাইজেশন করার কোন প্রয়োজন নেই এমনকি মানাং কে উপেক্ষা করেও চলে যাওয়া যেতে পারে। তবে এই ট্রেকে নতুন যারা তাদের জন্য অবশ্যই মানাং এ থাকা উচিত।

চামে  (২৭১০ মিটার) থেকে ভ্রাতংঃ ৭ কিলোমিটার, ২ ঘণ্টা
ভ্রাতাং এর ভিতর দিয়ে ট্রেকের দুপাশেই আপেল এর বাগান আছে এবং বছর বছর ক্রমাগত এই আপেল চাষের পরিধি বাড়ছেই, মনে হচ্ছে অচিরেই আপেলের ক্ষেত চামে পর্যন্ত চলে যাবে। এখানে সিডার প্ল্যান্ট আছে এবং ফ্রেশ আপেল সিডার পাবেন কাপ প্রতি ১৫০ রুপি। সিডার এ জুসের পার্থক্য হচ্ছে, সিডার অপরিশোধিত আর জুস পরিশোধিত। চাইলে এখান থেকে সস্তায় বাগান থেকে মাত্র তুলে আনা আপেল কেজি দরে কিনে নিতে পারবেন।

ভ্রাতাং এর আপেল বাগান

ভ্রাতাং এর আপেল বাগান

ভ্রাতাং (২৮৫০ মিটার) থেকে ধুকুর পোখারীঃ ৬ কিমি, ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট

ধুকুর পোখারী (৩২৪০ মিটার) থেকে হুমদেঃ
ধুকুরপোখারি থেকে একটু সামনে গিয়ে রাস্তা দু-দিকে ভাগ হয়ে গিয়েছে, বামের লোয়ার ট্রেইল লোয়ার পিসাং থেকে হুমদে হয়ে মানাং আর ডানের আপার ট্রেইল আপার পিসাং গিয়ে ঘাইয়ারু, গাওয়াল হয়ে ব্রাগা তে গিয়ে আবার মুল লোয়ার ট্রেইলের সাথে মিশেছে। ট্রেকার রা সাধারণত আপার ট্রেইলেই যায় আর জীপ / মিউল ট্রেইন যায় লোয়ার ট্রেইল ধরে। ঠিক এখান থেকে আপার পিসাং হয়ে যেই আপার ট্রেইল টা গিয়েছে সেটাই হচ্ছে এই ট্রেকের মুল আকর্ষণ, কারন এই আপার ট্রেইল থেকেই পুরো অন্নপূর্ণা রেঞ্জ টা বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে কোন বাধা ছাড়াই দেখা যায়। কেউ ট্রেক করে অন্নপূর্ণা গিয়ে এই ট্রেইলে না উঠলে তার সেই ট্রেকের ১২আনাই বৃথা। আরো একটা কারন আছে। হাই আল্টিচিউড ট্রেকিং এ সাধারণত ৩৫০০ মিটারে অন্তত দু দিন এক্লেমাটাইজেশন করতে হয়। সেক্ষেত্রে মানাং এ দু দিন না থেকে গাওয়াল যদি এক রাত থাকা হয় তাহলে আরেক দিন মানাং এ থাকলে এক্লেমাটাইজেশন পুরো হয়ে যায়, অর্থাৎ এক্লেমাটাইজেশনের জন্য একটা বাড়তি দিনের প্রয়োজন হয়না।

(আপার ট্রেইল) ধুকুর পোখারী থেকে আপার পিসাংঃ ১.৫ কিলোমিটার, ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট
ইদানিং আপার পিসাং এ প্রচুর লজ হয়েছে এবং নিরাপদ এটাচড টয়লেট এবং গরম পানির শাওয়ার সহ বাথ্রুম এবং ইন্টারনেট ও আছে। উল্লেখ্য আপার পিসাং থেকে পরবর্তী গন্তব্য ঘাইয়ারু’র ট্রেইল  প্রায় ৪২০ মিটার পর্যন্ত অত্যন্ত খাঁড়া ট্রেইলের ভিতর দিয়ে গিয়েছে। কাজেই এই ট্রেইলে উঠতে গিয়ে যাদের মাথা ব্যাথা, শ্বাসকষ্ট এবং বমিবমি আসা ইত্যাদি উচ্চতাজনিত অসুস্থ্যতার লক্ষন প্রকাশ পাবে তাদের উচিৎ আপার পিসাং এ আরেক দিন থেকে পরের দিন চেষ্টা করা অথবা আপার পিসাং গিয়ে সেখান থেকে লোয়ার পিসাং গিয়ে হুমদে’র ট্রেইল ধরা, যা বেশ সমতল। কারন ঘাইয়ারু’র উচ্চতা ৩৭০০ মিটার এবং উচ্চতাজনিত অসুস্থ্যতায় সেখানে গিয়ে রাতে ঘুমানো জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুকির কারন হবে।

(আপার ট্রেইল) ঘাইয়ারু (৩৭৩০ মিটার) থেকে গাওয়ালঃ ৫ কিমি, ১.৪৫ ঘন্টা

(আপার ট্রেইল) গাওয়াল থেকে হুমদেঃ ২ কিমি, ০.৪৫ ঘন্টা
গাওয়াল থেকে তিনটি ট্রেইল চলে গিয়েছে। একটি নীল ও সাদা রঙের মারকিং করা এবং এটি সোজা হুমদে এ নেমে গিয়েছে। আরেকটি ট্রেইল লাল ও সাদা রঙের মারকিং করা যা সামনে উঁচু একটি সমতল মালভুমি হয়ে একটি উপত্যকা হয়ে ব্রাগা’র দিকে নেমে যায়। সমতল উঁচু মালভুমি তে কয়েকটি ভিউ পয়েন্ট আছে যা থেকে অন্নপূর্ণা পর্বতসারির অপার্থিব দৃশ্য দেখা যায়। মালভুমি পার হয়ে সামনের উপত্যকা ধরে এগিয়ে গেলে একটা চৌরাস্তার মত পাওয়া যাবে, এর ডানের ট্রেইল সোজা ৪০০০ মিটার উঁচু আইস লেইকে চলে গিয়েছে আর বামের টা ব্রাগা তে নেমে গিয়েছে। ইচ্ছে করলে ব্রাগা যাবার পথেই আইস লেক দেখে আবার ব্রাগা হয়ে মানাং চলে যাওয়া যায় এবং এটাই ভালো পরিকল্পনা, কারন তা না হলে আইস লেক দেখতে হলে আবার পিছিয়ে এই ট্রেইলের আসতে হবে।

(লোয়ার ট্রেইল) ধুকুর পোখারী থেকে লোয়ার পিসাং: ৬ কিমি, ১ ঘন্টা

(লোয়ার ট্রেইল) লোয়ার পিসাং (৩২৫০ মিটার) থেকে হুমদেঃ ৭ কিমি, ২ ঘন্টা
হুমদে তে একটি এয়ারস্ট্রিপ আছে যাতে নেপালের ভিতরে যেই টাইপের বিমান গুলো চলে সেগুলো উঠা-নামা করতে পারে। এটাকে হুমদে এয়ারপোর্ট ও বলে আবার হুমদে মানাং এর অন্তর্গত হওয়ায় এটাকে মানাং এয়ারপোর্ট ও বলে। তবে এখানে নিয়মিত বিমান চলাচল করে না। মালামাল আনা নেয়া এবং চার্টার্ড বিমানই এখানে চলাচল করে আর মাঝে মাঝে থরং ফেদি / হাই ক্যাম্প / থরং লা পাস থেকে কোন ট্রেকার এর রেস্কিউ হেলিকপ্টার প্রয়োজনে থামে। হুমদে শহরটা অনেকটা পুরনো দিনের ওয়েস্টার্ন গল্পের মত। প্রধান রাস্তা কে কেন্দ্র করে একদিকে সাপ্লাই মজুদ করা জালানি কাঠ আরেক দিকে হোটেল /লজ।

হুমদে (৩৩৩০ মিটার) থেকে ব্রাগাঃ ৬ কিমি, ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট
ব্রাগা তে হোটেল নিউ ইয়াক এ ইলেক্ট্রিক ওভেনে ইউরোপিয়ান স্টাইলে চকোলেট কেইক, সিনামন ইত্যাদি অনেক মুখরোচক স্ন্যাক্স পাওয়া যায় যা এতদুর ট্রেক করে এসে কাচের শার্সির ভিতরে দেখেই খেতে ইচ্ছে করবে। এই হোটেল স্টিম বাথ, ওয়াইফাই সহ সব অত্যাধুনিত সুযোগ সুবিধা রয়েছে।

ব্রাগা (৩৪৫০ মিটার) থেকে মানাং : ২ কিলোমিটার, ৩০ মিনিট
মানাং শহরের ঘেঁষে  উত্তরে চুলু ইষ্ট এর পর্বতসারি উঠে গিয়েছে আর দক্ষিনে মারসিয়াংদি নদী আর তারে পর থেকেই শুরু হয়েছে অন্নপূর্ণা পর্বতসারি।

মানাং হচ্ছে এই ট্রেকের একটি অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান, বলা যায় এই ট্রেকের মধ্যমণি। রাস্তা ভালো থাকলে সাধারণত সারা বছরই বেসিশহর থেকে মানাং পর্যন্ত জীপ যাওয়া আসা করে। অনেকেই হয়ত জানে না যে মানাং থেকে খাংসার যাবার পথে একটা সমতল ভুমি / মালভূমি টাইপের জায়গা আছে যেখানে ছোট প্রপেলার  চার্টার্ড বিমান নামে।

নেটিভ মানাং বাসিদের বলা হয় মানাঙ্গি। এরা মুলত পর্বতের গুহা এবং পাহাড়ী নদী থেকে মুল্যবান পাথর সংগ্রহ করত আর ভেড়া পালত। মানাঙ্গিরা সেই অনেককাল আগে থেকেই চিনের সাথে ব্যবসা করত কারন তখন মানাং থেকে নেপালের মুল শহর গুলোর রাস্তা ছিল অনেক দুর্গম কিন্ত কাছেই চিনের সীমান্তের সাথে যোগাযোগ ভালো ছিল । এখন সার্বিক যোগাযোগ অনেক ভালো হলেও সেই পুরোনো ব্যবসার বদৌলতে মানাঙ্গিরা বংশগত ভাবেই অনেক টাকা পয়সার মালিক।

মানাং স্রেফ একটি শহর বললে ভুল হবে, এটিকে অন্যভাবে বললে ট্রেকার দের স্বর্গরাজ্য বলা যেতে পারে। ট্রেকিং এবং ক্লাইম্বিং এর যত গিয়ার দরকার সব এখানে পাওয়া যায় আর সেগুলোর মান থামেল এর থেকে অনেক অনেক ভালো এবং দাম অনেক কম।

মানাং হচ্ছে অন্নপূর্ণা র একটি ভ্যালি যেখান থেকে যে কোন হোটেলের বারান্দায় বসে বসেই অন্নপূর্ণা পর্বতসারিকে স্রেফ খেয়ে ফেলা যায়। ভ্যালি থেকে ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাওয়া পর্বতের দৃশ্য দেখে এখান অনেকেই সপ্তাহের পর সপ্তাহ পার করে দেয়। এখানে মারসিয়াংদি নদীর উজানে, শহর থেকে একটু নিচে একটি জলবিদ্যুত কেন্দ্র আছে যা থেকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যায় আর সব হোটেলেই  ইন্টারনেট / ওয়ায়ফাই সুবিধা আছে।

প্রায় সব ধরণের নাগরিক সুবিধা সম্বলিত এই শহরে তিনটি মুভি থিয়েটার আছে এবং প্রতিদিন কি কি মুভি চলবে তার লিস্ট লিখে দেয়া থাকে বাইরে। এখান থেকে মোটর সাইকেল ভাড়া করে থরং লা পাস পার হয়ে মুক্তিনাথ যাওয়া যায় এবং ঝুকি নিতে যারা ভালোবাসেন এবং মাউণ্টাইন বাইক চালাতে যারা অভিজ্ঞ তারা এই সুযোগটা নেয়।

এখানে একটি  হিমালয়ান রেসকিউ এসোসিয়েনের ভলান্টারি ইউনিট আছে সেখানে সোলো ট্রেকারদের উচ্চতায় আরোহনের সমস্যা লক্ষন এবং প্রতিকারের বিষয়ে আলোচনা করা হয় প্রতিদিন বিকাল তিনটায়। এখানে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা, প্রেশার ব্যাগ, উচ্চতা আরোহন জনিত অসুখের নিরাময় ঔষধ পাওয়া যায়। তবে এটাই হচ্ছে চিকিৎসা পাবার শেষ স্থান মুক্তিনাথের আগে। তাই এই ক্লিনিকের ফোন নাম্বার নিয়ে রাখলে ভালো, যাতে পরে কোন সমস্যা হলে ফোন করে পরামর্শ নেয়া যায়।

মানাং শহর

মানাং সাইট সিইংঃ
গঙ্গাপূর্ণা গ্লেশিয়ার লেইকঃ মানাং মুল শহর থেকে দক্ষিনে ঢাল বেয়ে মারসিয়াংদি নদী পার হলেই একটি লেইকের দেখা মিলবে। অন্নপূর্ণা ৩ এবং গঙ্গাপূর্ণার মাঝে একটি গ্লেশিয়ার আছে যা থেকে পানি গলে গলে পড়ে এই লেকের সৃষ্টি। এই লেকের পানি উপচে আবার একটি নালা বেয়ে মারসিয়াংদি নদীতে গিয়ে মিশেছে। বছরের যেই সময় তাপমাত্রা শুন্যের নিচে নেমে যায় তখন এই লেকের পানি স্রেফ বরফ হয়ে যায় এবং জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এই বরফের আস্তর থাকে পানির উপরে। এইজন্য অনেকেই এটাকে আবার আইস লেক বলে ভুল করে অথবা গাইডরা ইচ্ছে করে এটাকেই আইস লেক বলে দেখিয়ে দেয়। প্রকৃত আইস লেক হচ্ছে ব্রাগা থেকে উত্তরে ৪০০০ মিটার উচ্চতায়।

গঙ্গাপূর্ণা গ্লেইশিয়ার লেইক

আপার মানাংঃ গঙ্গাপূর্ণা গ্লেশিয়ার লেকের পাশ দিয়েই একটি পর্বতের ঢাল উপরের দিকে উঠে গিয়েছে যেটার পায়ে হাটার ট্রেইল শহরের থেকেই দেখা যায়। এখানে দুটো ট্রেইল আছে, অবশ্য দুটো ট্রেইলই কিছু দূর গিয়ে এক জায়গায় মিশে উপরের দিকে উঠে গিয়েছে। বামের ট্রেইল জিগ-জ্যাগ করে পাহাড়ি ঝোপ-ঝাড় আর গাছপালের ভিতর দিয়ে উঠে গিয়েছে আর ডানের ট্রেইল যেটা গ্লেশিয়ার লেইকের পাশ দিয়ে গিয়েছে সেটা থেকে এই গ্লেশিয়ারের উৎপত্তি এবং লেকে মিশে যাওয়ার এক আভাবনীয় দৃশ্য দেখা যায়। তবে ডানের ট্রেইলে গেলে একটু সাবধানতা অবলম্বন করতেই হবে কারন ট্রেইলের প্রস্থ কম এবং ছবি তুলতে গিয়ে অজান্তে পা হড়কে গিয়ে নিচের লেকে পরে যাবার মত মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

দুটো ট্রেইল এক হয়ে মিশে উপরের দিকে আবার জিগ-জ্যাক করে উঠে গিয়েছে এবং এই ট্রেইল আপনাকে নিয়ে যাবে একটি বিস্ময়কর মালভূমির মত জায়গাতে সেখান থেকে মানাসলু থেকে চুলু পিক একসাথে দেখা যাবে। মারসিয়াংদি নদীর সাপের মত একেবেকে মানাং হয়ে এগিয়ে যাওয়ার মত একটি অভাবনীয় দৃশ্য এখান থেকে দেখা যাবে। এখানে একটি ছোট ক্যান্টিন আছে যেখানে পানি কফি পাওয়া যায় আর আছে কিছু স্টূপা, সামনে উপরের দিকে আরেকটি ট্রেইল উপরে আরেকটি স্টূপার দিকে চলে গিয়েছে, সেই ট্রেইল ধরে চললে আপনি মারসিয়াংদি আর মানাং এর আরো দিগন্ত বিস্তৃত দৃশ্য দেখতে পারবেন।

আপার মানাং থেকে দেখা মানাং

(সাইড ট্রেক) তিলিচো লেইকঃ
প্রায় ৫০০০ মিটারে অবস্থিত তিলিচো লেক পৃথিবীর উচ্চতম লেকগুলোর একটি এবং মানাং থেকে সেখানে যেতে ২-৩ দিন সময় লাগে। তিলিচো লেইকে যাবার আগে মানাং শহরের ভিতরে ACAP চেকপোস্টে আপনার Permit আর TIMS কার্ড দেখিয়ে সত্যায়ন করে নিতে হবে এবং তিলিচো লেকের রাস্তা খোলা আছে কিনা অর্থাৎ ভূমিধ্বস অথবা বরফের কারনে রাস্তা বন্ধ আছে কি না তা এই অফিস থেকেই দেখে নিতে পারবেন এবং একটি নোটিশবোর্ডে এই এলাকার সব রাউটের অবস্থা সম্পর্কে ধারনা পাবেন।

ব্রাগা থেকে মানাং আসার আগে একটি গাড়ীর জীপ ট্রেইল বামে চলে গিয়েছে আর ডানের ট্রেইল মানাং মুল শহরে চলে গিয়েছে। বামের এই ট্রেইলটি মারসিয়াংদি নদী ধরে মানাং এর নিচে দিয়ে জলবিদ্যুত কেন্দ্র পার হয়ে উপরে উঠে গুনসাং আর খাংসার ট্রেইলের সাথে মিশেছে। কেউঁ মানাং বাইপাস করতে চাইলে মানাং এ যাবার আগেই এই বামের গাড়ীর রাস্তা ধরে খাংসার চলে যেতে পারে তবে ট্যুরিস্ট হিসেবে মানাং এর ACAP চেকপোস্টে অবশ্যই পারমিট আর টিআইএমএস কার্ড সত্যায়ন করতে হবে। তাই ট্যুরিস্ট রা শহরে চলে যায় আর স্থানীয়রা বামে ঢুকে মানাং মুল শহর কে ডানে রেখে নিচে দিয়ে সামনে এগিয়ে যায় যদি প্রয়োজন হয়।

মানাং এর মুল শহর থেকে মারসিয়াংদি নদীর দিকে নেমে জীপ ট্রেইল ধরে এগিয়ে গেলে একটি জংশন পরবে যেটার ডানের রাস্তা গুনসাং হয়ে ইয়াক খারকার দিকে চলে গিয়েছে আর বামেরটা খাংসারের দিকে। একইভাবে মানাং এর মুল শহরের ভিতর দিয়ে যেই রাস্তা সামে এগিয়ে গিয়েছে সেটি শহর ছেড়েই একটি জংশনে পরবে এবং একি ভাবে ডানে গুনস্নগ হয়ে ইয়াক খারকা আর বামে খাংসার। অবশ্যই গঙ্গাপূর্ণা লেক ধরে লেক কে হাতের বামে রেখে আরেকটি ট্রেইল খাংসারের মুল ট্রেইলের সাথে মিশেছে কিন্ত এটি অনেক পুরনো পথ এবং ভূমিধ্বসে এই ট্রেইল বন্ধ আছে এবং অপ্রচলিত ট্রেইল হওয়ায় সামনে মারসিয়াংদি নদীর উপরে সাস্পেনশন ব্রিজের কি অবস্থা কে জানে। তারপরেও সময় বাঁচাতে শর্টকাট এই ট্রেইলে যেতে চাইলে অবশ্যই চেকপোস্ট এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে নিবেন।

খাংসার থেকে তিনটি ট্রেইল বের হয়ে গিয়েছে যার একটি একদম নিচ দিয়ে যা ভূমিধ্বসে প্রবন এবং এতে কোন টি-হাউজ পরে না আর মাঝেরটার অবস্থাও ভালো না তাই ডানের মুল একটি রাস্তা সামনে চলে গিয়েছে সেটিই ব্যবহার করা উচিৎ। যেহেতু সেটিই সবাই এখন ব্যবহার করে তাই বাকি ট্রেইলগুলো সাধারনভাবে দৃষ্টিগোচর নাও হতে পারে। এই ট্রেইল ধরে আপনি শ্রীখারকা পৌছে যাবেন।

শ্রীখারকা তে অবশ্যই আপনাকে রাতে থাকতে হবে কারন পরের দিন খুব ভোরে (যেমন ভোর ৩টা) সামনের ল্যান্ড স্লাইড এলাকা অতিক্রম করতে হবে। গাছপালা এবং ঝোপঝাড়হীন স্রেফ ঝুলে থাকা আলগা পাথর আর বালুর পাহাড়ের  উপর দিয়ে এই ল্যান্ড স্লাইড ট্রেইল চলে গিয়েছে যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সতর্ক না থাকলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সাধারণত রাতে অত্যাধিক ঠান্ডায় পাথর বালু এগুলো জমে থাকে আর সূর্যোদয় হওয়ার সাথে সাথে সূর্যরশ্মির উত্তাপে আলগা নুড়ী পাথর ট্রেইলের উপরে গড়িয়ে পরতে থাকে। আপনি হয়ত দেখবেন অনেকেই সকাল বেলা সূর্য উঠার পরে এই রাস্তা পার হচ্ছে, তারা অবশ্যই অত্যন্ত বেশী ঝুঁকি নিচ্ছেন।

শ্রীখারকা থেকেও কিন্ত তিনটি ট্রেইল আছে, একটি সেই খাংসার এর নিচের ট্রেইল যেটি নদীরধার ধরে গিয়েছে এবং এই ট্রেইল সর্বাবস্থায় পরিত্যাজ্য। বাকি দুটি ট্রেইলের ভিতরে উপরের ট্রেইলটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এখন এটি আর ব্যবহার করা হয় না আর সাধারন ভাবে মাঝের ট্রেইলটিই ব্যবহার করা হয়। কিন্ত এখানে আপনি বিভ্রান্ত হতে পারেন, কারন অনেকেই মাঝের এই প্রচলিত ট্রেইলটাকেই লোয়ার ট্রেইল বলে কিন্ত আসলে লোয়ার ট্রেইল সেটিই যেটি খাংসার থেকে নদীর পাড় ধরে গিয়েছে। সুতরাং আপার লোয়ার যাই হোক মাঝের ট্রেইলটিই আপনাকে ধরতে হবে। শ্রীখারকা থেকে সামনে এগিয়ে গেলে আরেকটি টি-হাউজ পেতে পারেন তবে সেটা মাঝেমধ্যই বন্ধ থাকে, তাই শ্রীখারকা থেকেই জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন।

শ্রীখারকা থেকে তিন ঘন্টা গেলে আপনি তিলিচো বেস ক্যাম্পে পৌছাবেন যাতে এখন তিনটি টি-হাউজ আছে। রাত কাটানোর জন্য তিলিচো বেসক্যাম্প দারুন একটি জায়গা, ডাইনিং এ অন্যান্য টিহাউজের চাইতে বড়সড় ফায়ারপ্লেস আছে, ঘরগুলো পরিস্কার এবং গেষ্ট রুমগুলোর অর্ধেকের সাথে এটাচড বাথরুম আছে।

তিলিচো বেস ক্যাম্প থেকে তিনঘন্টা হাটলে প্রায় ৫০০০ মিটার উচ্চতায় তিলিচো লেকে পৌছনো যায়। এটি বেশ কঠিন, খাড়া এবং এ যাবত আপনার ট্রেকিংগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উচু। এই এলাকায় স্নো লেপার্ড আছে তবে সম্ভবত আপনি বেশী দেখা পাবেন নীল ভেড়া এবং ইয়াক এর। বেস ক্যাম্পে গিয়ে একইদিনে শ্রী খারকায় পৌছানো সম্ভব, তবে সবচেয়ে ভালো হয় রাতে বেস ক্যাম্পে থাকলে, এর পর খুব ভোরে উঠে ফিরতি পথে রওনা দেয়া।

তিলিচো লেকে সকাল ১১টার পর প্রবল বাতাস বইতে থাকে আর সাথে মিহি তুষার কণা এবং মেঘ জমতে পারে। লেকে থাকার সময় প্রচন্ড ঠান্ডা অনুভব হতে পারে- তাই গরম জামাকাপড় সাথে নিতে ভুলবেন না। সেখানে একটি টি হাউজ আছে যেটিতে আপনি খাবার ও চা পাবেন, তবে একান্ত জরুরী না হলে থাকার ব্যবস্থা নেই। অফ সিজনে টি হাউজ খোলা নাও থাকতে পারে। এর কর্মীরা বেস ক্যাম্প থেকে সেখানে গিয়ে প্রতিদিন এটি চালু করেন, তাই সেখানে যাবার আগে চেক করে নিন।

বেস ক্যাম্পে ফিরে আসতে দেড় ঘন্টা লাগে। একবার নেমে গেলে আপনি সেখানে রাত কাটাতে পারেন কিংবা ৩ ঘন্টা হেটে শ্রী খারকা ( অথবা ২ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে শ্রী খারকার একটু আগে) পৌছাতে পারেন। পরেররদিন আপার খাংসার হয়ে সরাসরি ইয়াক খারকায় যাওয়া যায় যাতে আবার একেবারে মানাং পর্যন্ত ফেরত যেতে না হয়। শ্রী খারকার একটু পরেই একটি পরিস্কার সাইনপোষ্ট আছে যাতে আপার খাংসারের রাস্তা দেখানো আছে। শ্রী খারকা থেকে ইয়াক খারকা যেতে প্রায় চার ঘণ্টা লাগে।

মানাং (৩৫৪০ মিটার) থেকে ইয়াক খারকা : ৯ কিলোমিটার, ৩ ঘন্টা
অনেকেই গুনসাং থেকে ইয়াক খারকার মাঝে লেদারে থাকার পরামর্শ দেন তবে ইয়াক খারকাতেই থাকা ভালো কারন এখানে থেকে থেকে অনেক টিহাউজ আছে যাতে মানাং এর মত সব আধুনিক সুবিধা পাবেন। ইন্টারনেট এখানে অপ্রতুল, হয়ত একটি কি দুটি টিহাউজে পাবেন তবে চার্জ করবে আকাশচুম্বী।

ইয়াক খারকা (৪০৫০ মিটার) থেকে থরং ফেদি:  ৬ কিলোমিটার, ৪ ঘন্টা
প্রায় ৮০০ মিটার এলিভেসনের এই ট্রেইলে ট্রেকারদের সামর্থের পরীক্ষা বেশ ভালো ভাবেই হয়।যদিও ট্রেকের উচ্চতা বেশ ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে গিয়েছে তথাপি ৪০০০ মিটারের উপরে স্রেফ সমতলে হেঁটে যাওয়াটাই অনেক শারীরিক এবং মানসিক শক্তির বিষয়।এই ট্রেকের শেষের দিকে অর্থাৎ থরং ফেদির একটু আগে তিলিচো লেকের ট্রেইলের মত আরেকটা ল্যান্ড স্লাইড এরিয়া আছে যেটি এক অর্থে তিলিচো লেকের চাইতে বিপজ্জনক! কারন তিলিচো লেকের ল্যান্ড স্লাইড আপনি ইচ্ছে করলেই ভোরের আগে যেতে পারবেন কিন্ত থরং ফেদির আগেরটা আপনাকে সকাল ১০/১১ টার দিকেই মোকাবিলা করতে হবে।গোদের উপর বিষফোঁড় হিসেবে এই ল্যান্ড স্লাইডের উপরে ঘাস আছে যাতে পাহাড়ি ছাগল চড়ে বেড়ায় আর তাদের চলাফেরাতেই পাথর গুলো নিচে গড়িয়ে পড়তে থাকে।

থরং ফেদি তে একটি রেস্টুরেন্ট আছে যাতে প্রবেশ করা মাত্রই আপনি ভুলে যাবেন কোথায় আছেন।সম্পূর্ণ ইউরোপিয়ান স্টাইলে গড়ে তোলা এই রেস্টূরেন্টে কিছু খাবার আগেই খাবারের তৃপ্তি চলে আসেবে।এখানে থাকার টিহাউজ গুলোও বেশ আধুনিক তবে ইন্টারনেট স্বাভাবিকভাবেই অনেক ব্যায়সাপেক্ষ।

অনেকেই এখানেই থেকে যায় এবং আর ২/৩ টার দিকে হাইক্যাম্প হয়ে থরং লা পাস চলে যায়।আবার কেউ কেউ দুপুরে থরং ফেদি থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে হাইক্যাম্পের দিকে চলে যায় এবং সেখান থেকে ভোরে থরং লা পাস এর দিকে রওনা দেয়।

থরংফেদি (৪৪৫০মিটার) থেকে হাইক্যাম্পঃ ১ কিলোমিটার ২ঘন্টা
১ কিলোমিটার ২ ঘন্টা দেখেই বুঝে নিন এই ট্রেইল কতটূকু খাঁড়া।যারা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে হেলিকপ্টার উদ্ধার সুবিধা নিয়ে এখানে আসেন তাদের অধিকাংশই এই ট্রেইলের রেস্কিউ চপার ডাকেন এবং প্রায়ই দেখা যায় থরং ফেদি অথবা হাই ক্যাম্প থেকে হেলিকপ্টার ট্রেকারদের উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে।কাজেই এই ট্রেইল অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কচ্ছপের মত ধীরে ধীরে আরোহন করা উচিৎ যাতে উচ্চতা জনিত জটিলতা না দেখা দেয়।আর সোলো ট্রেকার এবং ইন্স্যুরেন্স নেই তাদের ত আরো বেশী সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ।

আগে হাই ক্যাম্পের কেবলমাত্র একটি লজ ছিল তবে অধুনা এখানে থাকার জন্য আরো বেশ কয়েকটা ডরমেটোরি বানানো হয়েছে তবে রেস্টুরেন্ট একটাই। ভরা মৌসুমে সকাল সাড়ে এগারোটার মধ্যে লজ ভরে যায়। হাই ক্যাম্পের বাথরুমগুলো সাধারনত বাড়ির বাইরে থাকে এবং ভরা মৌসুমে এর জন্য লাইন ধরতে হতে পারে। কিছু কিছু টয়লেটে লাইট কাজ নাও করতে পারে, তাই সব সময় হেডল্যাম্প সাথে রাখা উচিত আর বরফ এর সময় টয়লেট খুব বেশী অপরিষ্কার থাকে এবং ব্যাপক দুর্গন্ধ হতে পারে।

হাইক্যাম্প থেকে সাধারণত ট্রেকাররা ভোর ৪টার দিকে বের হয়ে যায় যাতে থরং লা পাস এ বেশী সময় ব্যয় করতে পারে। এমন অনেক ট্রেকার আছে যারা থরং লা পাস এ গিয়ে আবার হাই ক্যাম্পে ফিরে আসে এবং এরকম বেশ কয়েকবার করে তার পরে মুক্তিনাথ চলে যায়। তিলিচো লেক বেইসক্যাম্পেও এমন ধরা ট্রেকার পাওয়া যায় যারা তিলিচো লেক উঠে  বেস ক্যাম্পে নেমে আবার পরের দিন একই কাজ করে।

হাই ক্যাম্প (৪৮৫০ মিটার) থেকে থরাং পাসঃ ৫ কিলোমিটার, ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট
হাই ক্যাম্প থেকে থরং লা পাস যাবার পথে অনেক ফলস পিক দেখা যায়, অর্থাৎ ট্রেক করে একটি উঁচু জায়গা পার হলে মনে হয় দূরের ঐ উঁচু জায়গাটার পরেই কিছু, কিন্ত সেটি পার হলে দেখা যায় তার পরে আর উঁচু আরেকটা এবং এভাবে চলতেই থাকে।  সামনে যখন আর উঁচু কিছু দেখা যায় না তখনি আপনি থরং লা পাস পৌছে যাবেন। হাই ক্যাম্পের কিছু দুরেই একটা গভীর খাদ আছে যা বরফের সময় বেশ সংকীর্ণ হয়ে যায় আর পাহাড়ি পশুরা চলাচলে করে ট্রেকে বড় বড় গত করে রাখে যা শীতের সময় জমে শক্ত বরফ হয়ে যায় এবং এতে পা পিছলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাই বরফ পড়ার সময় এই ট্রেকে ক্র্যাম্পন এবং দুই হাতে দুটি ট্রেকিং পোল থাকা জরুরী। অবশ্য ঠিক এইটূ রাস্তার জন্য ক্রাম্পন ব্যাবহার ছাড়া একটু সাবধানে হেঁটে গেলেও হয়।

হাইক্যামপ থেকে প্রায় ১ ঘন্টা ট্রেক করার পরে প্রথম ক্যান্টিন চোখে পড়বে। এখানে চা / কফি এবং বোতলজাত পানি পাওয়া যায় যা যৌক্তিক কারনেই অনেক ব্যয়সাপেক্ষ (চা / কফি ২০০ থেকে ৩০০ রুপি আর পানি ১৫০ রুপি)। ঠিক থরং লা পাস এর উপরেই আরেকটি ক্যান্টিন আছে। শেষের ক্যান্টিন থেকে অবশ্যই পানির রিজার্ভ ভরে নিবেন কারন এখান থেকে ছারাবু ফেদি পর্যন্ত কোথাও পানি পাওয়া যাবে না আর অত্যন্ত গরমে চরম তৃষ্ণার্ত হয়ে ডিহাইড্রেশন হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে, তাই অতিরিক্ত পানি নিয়ে যাওয়াটাই উত্তম।

পাসের সাথেই একটি ছোট ট্রেইল উপরে উঠে গিয়েছে যেখান থেকে পুরো পাস এর একটা এরিয়াল ভিউ পাওয়া যায়।

থরাং পাস (৫৪১৬ মিটার) থেকে ছারাবু ফেদিঃ ৬ কিলোমিটার, ২ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট
থরং লা পাস থেকে ট্রেইল শুধু নিচের দিকে নেমে গিয়েছে এবং প্রমাগত নেমে যাওয়াতে পা এর হাঁটুর উপরে বেশ চাপ পরে, তাই খুব দ্রুত দৌড়ে নামে গেলে কষ্ট কম হয়। শীতের সময় এই ট্রেইলের প্রায় ৯০ ভাগ বরফে ঢাকা থাকে আর তখন বাচ্চাদের মত স্লিপ কেটে নেমে যাওয়ার প্রচলন আছে। অবশ্যই এই ট্রেইল পানি পরিমিত হারে খেতে হবে কারন পানি শেষ হয়ে যাবেই তাই একদম গলা শুকিয়ে না গেলে পানি না খাওয়াই উচিত আর যারা সাথে পোর্টার অথবা গাইড নিচ্ছেন তারা বাড়তি ২/৩ টা পানির বোতল তাদের কাছে রাখতে পারেন তাহলে সুস্থভাবে ট্রেক শেষ করতে পারবেন।

ছারাবু (৪২৩০ মিটার) থেকে মুক্তিনাথঃ ৪ কিলোমিটার, ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট
দীর্ঘক্ষণ কেবল নিচের দিকে নামতে থেকে এবং পানির স্টোরেজ শেষ হয়ে যাওয়ায় ছাড়াবু ফেদি কে উপরে থেকে দেখলে স্রেফ একটা মরূদ্যানের মত লাগবে। এখানে বেশ কয়েকটি টিহাউজ আছে যেখানে আপনি এই ট্রেকে প্রচলিত সব ধরের খাবার পাবেন আর অবশ্যই পানি। চাইলে এখানে থেকেও যেতে পারেন কারন তখনও আপনার সাথে আছে থরংগ লা পাস এর তাজা স্মৃতি আর ছারাবু ফেদির একটি উপত্যকার ঢালে হওয়ায় আশেপাশের বিশেষ করে আপার মুস্তাং এর বর্ণিল পাহাড় গুলো আপানকে রোমাঞ্চিত অনুভূতি এনে দেবে। কটেজগুলো থেকে বামে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটা ট্রেইল গিয়ে মুক্তিনাথের দিকে আরেকটা গিয়েছে ডান দিক দিয়ে যেটি বামে টার্ন নিয়ে মুক্তিনাথের দিকে গিয়েছে যেটির দৈর্ঘ কম।

মুক্তিনাথ (৩৮০০ মিটার) থেকে কাগবেনীঃ
মুক্তিনাথে পা রাখার সাথে সাথেই আপনার মনে হবে আপনি সমতলের সভ্যতায় প্রবেশ করেছেন। এই অনুভূতি আনন্দের এবং যুগপৎ বেদনারও। এই এলাকার বৃহত্তর নাম হচ্ছে রানিপাও। মুক্তিনাথে দুটো মন্দির আছে পাশা পাশি, একটি সনাতন আরেকটা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের। অনেক লোক এই মন্দিরে পুজো দিতে আসেন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এবং পুজোর সিজনে এলাকা একদম গম গম করতে থাকে, তাই মুক্তিনাথ থেকে পোখারা পর্যন্ত রাস্তায় ট্রান্সপোর্ট সব সময়ই ব্যস্ত থাকে।  এখানে আধুনিক সুবিধা সম্বলিত বেশ কয়েকটি রেস্টূরেন্ট আছে, এদের মধ্যে বব মার্লি রেস্টুরেন্ট বেশ বিখ্যাত আর বাস স্ট্যান্ডের কাছে একজন রাশান ভদ্রলোক স্থায়ীভাবে একটি টিহাউজ দিয়েছেন যাতে খাশ ইউরোপিয়ান খাবার পাওয়া যায়। মুক্তিনাথ বাসস্ট্যান্ডের ঠিক পাশেই একটি উঁচু পাহাড় আছে যেটাতে উঠলে আপনি আশে পাশের অনেক গুলো বরফাচ্ছাদিত পর্বত দেখতে পাবেন। ঠিক এই জায়গায় টেন্ট করেও থাকতে পারেন।

মুক্তিনাথ থেকে কাগবেনীঃ ১২ কিমি, ৪ ঘন্টা
(যারা মুক্তিনাথ থেকে আর ট্রেকিং করতে চান না তারা ভোরে বাসস্ট্যান্ড থেকে জীপ অথবা বাস ধরে জমসম গিয়ে সেখান থেকে সরাসরি পোখারার বাস ধরে রাতে পোখারা পৌছে যেতে পারেন।)

কাগবেনীর উঁচু ট্রেইল থেকে আশেপাশের পর্বতের দারুন দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় এবং উপরের মুস্তাং উপত্যাকার চমৎকার গ্রামগুলোর ( ঝং এবং পুরাং) এর দৃশ্য ও এর রংবেরঙের সব পাহাড় দেখতে পাওয়া যায়। তবে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এই উঁচু ট্রেইলে জীপ এবং বাস চলাচল করে ধুলোর একটা কুয়াশার  সৃষ্টি করে যা ট্রেকারদের জন্য খুবই বিরক্তিকর এবং স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। তাই ঝাড়কোট পর্যন্ত গিয়ে নিচের একটি ট্রেইল ধরতে পারেন যা গান্ধাকি নদীর ধার দিয়ে খিংগা হয়ে কাগবেনী পৌঁছেছে। এই লোয়ার ট্রেইলটি ট্রেকারদের ব্যবহার করা উচিত কারন এতে ধুলোবালির অত্যাচার থেকে বাঁচা যাবে আর আপার মুস্তং এর পাহাড় গুলোও থেমে থেমে মন ভরে দেখা যাবে আর সাথে পাহাড়ি নদী ত আছেই। এই গান্ধাকি নদীই কাগবেনীতে গিয়ে কালী গান্ধাকি নদীর সাথে মিশেছে।

চোরা গলি (অনেকটা গোলকধাঁধার মত) এবং ইউরোপীয় স্বাদের দারুন এক ছোট শহর কাগবেনী। জায়গাটি অনায়াসে দুইরাত থাকার যোগ্য যাতে এর চোরাগলিগুলো খুজে বের করে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সারাদিনই পার করে দেয়া যায়। এখানে থাকার মতো ভালো জায়গা হচ্ছে ইয়াক ডোনাল্ডস, যেখানে ঝকঝকে তকতকে একেকটি ঘর এমনকি ৩০০ রুপিতেও পাওয়া যায়। যদি স্থানীয় খাবার ভালো লাগে তাহলে ড্যন্সিং ইয়াক রেস্তোরাঁতে চেষ্টা করতে পারেন। যদিও এর মালিক ইংরেজী বোঝেন না কিন্তু আপনার একটি দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা হবে, মাঝে মাঝে রান্নাঘরেও দাওয়াত পেতে পারেন।

কাগবেনী থেকেই আপার মুস্তাং যেতে হয় এবং এখানেই একটি চেকপোস্ট আছে যা আপনার আপার মুস্তাং এর পারমিট আর তাদের নিয়ম অনুযায়ী গাইড নিয়েছেন কিনা ইত্যাদি চেক করবে। কাগবেনীতে নদীর ধারে একটি ভিউ পয়েন্ট আছে যেখান থেকে আপার মুস্তাং এর অনেক সুন্দর ভিউ পাওয়ায় যায়। অবশ্য চেকপোস্টে বলে কয়ে একটি উঁচু ভিউ পয়েন্টেও যাওয়া যায়।

কাগবেনী (২৮০০ মিটার) থেকে জমসমঃ ১২ কিলোমিটার , ৩ ঘণ্টা
ঠিক মুক্তিনাথ থেকে কাগবেনীর রাস্তার মতই এই রাস্তাতেও নিয়মিত জীপ চলাচল করে তাই এই ট্রেইলে ট্রেক করার আগে নাকে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। ধুলোয় ধূসরিত এই রাস্তায় জীপে আসাটা আরো বেদনাদায়ক, কারন জীপ ব্রেক করলেই পিছনের ধুলোয় জীপ ঢেকে যায়।

কাগবেনী থেকে জমসমে প্রবেশের সময় আশেপাশের পাথরের আর মাটির পাহাড় গুলো খাঁজকাটা খাজকাটা আলো আধারি ছায়ায় জনমানবহীন ঘরবাড়ি দেখে মনে হতে পারে এটি একটি ভুতুরে শহর, আসলে মুল শহর হচ্ছে নদীর অন্য পাড়ে এয়ারপোর্টের সাথে। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এই এলাকাটিতে কেবলমাত্র এটিএম চালু রয়েছে। কয়েকটি ব্যাংক ও আছে এবং মানি চেঞ্জারও আছে। এটি তেমন আকর্ষণীয় শহর না হলেও এখানে থ্রি স্টার হোটেল আছে। ট্রেকাররা প্রায়ই এখানে ট্রেক শেষ করে দেয় কারণ এটি  শুষ্ক এবং ধূলিধূসরিত এবং এখান থেকে প্রচুর বাস ও জিপ চলাচল করে। জমসম থেকে আপনি ১০০ ডলার খরচ করে ১৫ মিনিটের ফ্লাইটে পোখরা ফিরতে পারেন অথবা সকাল সকাল পৌছালে একটি বাসে করে সরাসরি সন্ধ্যার পর পোখারায় পৌছে যেতে পারবেন। সরাসরি বাস না পেলে জমসম থেকে গাশা পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে বাস পরিবর্তন করে গাশা থেকে বেনি গিয়ে সেখান থেকে জীপে পোখারা যেতে হবে।

জমসম (২৭২০ মিটার) থেকে মারফাঃ ৬ কিলোমিটার, ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট
মারফাতে নেপালের অন্যতম সেরা আপেল পাওয়া যায় এবং মৌসুমে শেষ না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণে আপেল এবং আপেল জাত পণ্য এবং ডিস্টিলারী থেকে ব্র্যান্ডি পাওয়া যায়। মারফা থেকে আপেল নিয়ে স্থানীয়রা থরং লা পার হয়ে সার্কিট ট্রেকের ভিতরে বিক্রি করত তবে এখন ভ্রাতাং এ আপেলের অনেক বাগান হওয়ায় মানাং পর্যন্ত আপালের চাহিদা এখান থেকেই পূরণ হয়। মারফাতে একটি দর্শনীয় বৌদ্ধ মঠ আছে।

পুরো মারফা গ্রামটাই একটি ছবির মত। ধাউলাগিড়ি সার্কিট ট্রেকের শেষ অংশ এসে  মারফা তে মিশেছে, অনেকেই আবার উল্টো পথে মারফা থেকেই ধাউলাগিড়ীর সার্কিট ট্রেকে রওনা দেয়।

জমসম থেকে ট্রেক করে তাতোপানিঃ

মারফা (২৬৭০ মিটার) টুকুচে: ৬ কিমি, ১ঘন্টা ৩০ মিনিট

টুকুচে (২৫৯০ মিটার) থেকে কোবাং: ৪ কিমি,  ১ ঘণ্টা

কোবাং (২৬৪০ মিটার) থেকে লারজুং: ১  কিমি, ১ ঘন্টা

লারজুং (২৫৫০ মিটার) থেকে কোখেথান্তি: ৩ কিমি, ১ ঘন্টা

কোখেথান্তি (২৫২৫ মিটার) থেকে কালোপানি / লেটে: ৩ কিমি,  ১ঘন্টা

কালোপানি / লেটে (২৫৩৫ মিটার) থেকে ঘাসা: ৭ কিমি, ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট

ঘাসা (২০১০ মিটার) থেকে কোপোচেপানিঃ
৪ কিমি, ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট (বায়ের রাস্তা, সাদা ও লাল দাগ দেয়া) যা আপনাকে একটি খাড়া ঢাল বেয়ে ঠিক পথে চলতে সাহায্য করবে। এই ট্রেইল টি কিছুটা কষ্টদায়ক হলেই আশেপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য অসাধারন। ঘাসা বাসস্ট্যান্ডের কাছেই একটা গেস্ট হাউজ আছে যেখানে ইচ্ছে করেই হোক আর বাস মিস করেই হোক থাকার জন্য অসাধারন।

কোপোচেপানি (১৪৮০ মিটার) থেকে রূপসীচাহারাঃ  ২ কিমি,  ৪৫ মিনিট

রুপসীচাহারা (১৫০০ মিটার) থেকে ডানাঃ ৩ কিমি, ১ ঘণ্টা

ডানা (১৪০০ মিটার) থেকে তাতোপানিঃ ৪ কিমি, ১ ঘন্টা ৩০ মিনিটঃ
তাতোপানিতে প্রচুর গরম স্প্রিং আছে এবং রাত কাটানোর জন্য বেশ ভালো জায়গা। তাতোপানির পুলগুলোতে ১৫০ রুপি  ফি। এখানে রেস্তোরাঁ এবং ম্যাসেজ পার্লারও আছে।

তাতোপানি থেকে পোখারা যেতে হলে ঘাসা থেকে ছেড়ে আসা বাস ধরে বেনি পর্যন্ত যেতে পারেন অথবা বেনি পর্যন্ত পুরো রাস্তা ট্রেক করে যেতে পারেন তবে এই রাস্তা ট্রেকিং এর জন্য একেবারেই অনপুযুক্ত। কারন পর্বতের ঢাল বেয়ে এই রাস্তায় কোন বাস গেলে বেশ সাবধানে থাকতে হয় কারন রাস্তার এক পাশে পর্বতের ঢাল আরেক পাশে গর্জন করে বয়ে চলে কালীগান্ধাকি নদী এবং কিছু কিছু জায়গা বেশ সঙ্কীর্ণ। আর পুরো রাস্তায় বৃষ্টি না থাকলে ধুলোয় একাকার থাকে যা বেশ বিরক্তিকর।

আবার তাতোপানি থেকেই সোজা বেনির দিকে না গিয়ে বামে ঘারা – শিখা – চিত্রে ট্রেইল ধরে গোরেপানি – পুনহিল পৌছে যেতে পারবেন এবং আরো বেশী চাইলে সেখান থেকে চমরং হয়ে অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প বেইসক্যাম্পে গিয়ে সেখান থেকে নয়াপুল হয়ে পোখারা ফিরে আসতে পারেন।

 

ফিরে আসা

১. মুক্তিনাথ থেকে বাস / জীপ / ট্রেক করে  জমসম গিয়ে সেখান থেকে পোখারার সরাসরি বাস।
২. কাগবেনী থেকে জীপ / ট্রেক করে জমসম এসে সরাসরি পোখারার বাস।
৩. জমসম এসে পোখারার সরাসরি বাস না পেলে প্রথমে ঘাসা’র বাস এবং ঘাসা থেকে বেনি’র বাস এবং বেনি থেকে পোখারার রিজার্ভ / শেয়ার্ড জীপ।
৪. জমসম থেকে বিমানে সরাসরি পোখারা।
৫. মুক্তিনাথ থেকে কাগবেনি – জমসম – তাতোপানি হয়ে সেখান থেকে চলতি বাসে উঠে বেনি হয়ে পোখারা।


*** এখানে উল্লেখিত প্রতিটি স্থানের উচ্চতার পরিমাপ আপেক্ষিক এবং উইকি মিডিয়া থেকে নেয়া, এর সাথে টপো এবং গুগল ম্যাপের উচ্চতায় পার্থক্য থাকতে পারে তবে সেটা খুব বেশী নয়। ট্রেকিং এর সময় নির্ভর করে প্রতিটি ট্রেকারে ব্যক্তিগত সামর্থ্যের উপরে, এখানে ঘন্টা প্রতি ৪ কিলোমিটার গতি ধরা হয়েছে আর উচ্চতা ভেদে এর তারতম্য হতে পারে।

অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকের কিছু ছবি 500PX অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকের কিছু ছবি Flickr

তথ্য সুত্রঃ উইকিট্রাভেল
তথ্য এবং ছবি সংযোজন এবং পরিমার্জনঃ মাহমুদ ফারুক