fbpx

গোয়েচা লা ট্রেক

Mahmud Farooque
March 8, 2020

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

গোয়েচা লা হচ্ছে পশ্চিম সিকিম তথা সিকিমের পুরাতন রাজধানী ইউকসাম এ কাঞ্চনঝঙ্গা জাতীয় উদ্যান এর ভিতর দিয়ে তৈরি একটি গিরিপথ যেটি  পান্দিম পর্বতের পশ্চিম এবং পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনঝঙ্গার দক্ষিণ পাশের উপত্যকা দিয়ে ভারত-চায়না সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। অন্যান্য অনেক ট্রেকে যেমন জন-মানুষের বসবাস থাকে আর মানুষের পদচারণাতেই যেমন পথ / রাস্তা / ট্রেক তৈরি হয়, গোয়েচা লা ট্রেকটি এমন নয়। এই ট্রেক টি তৈরিই করা হয়েছে ট্রেকিং এবং সীমান্ত পর্যন্ত যাওয়া আসার জন্যই। গোয়েচা লা কে অন্য ভাবে বলা যায় যে এটি হিমালয়ান মাউন্টেইনিয়ারিং ইন্সটিটিউট এর ব্রিদিং গ্রাউন্ড। পুরো ট্রেক জুরেই এইচএমআই এর পদচারণা তবে জংরি’র পশ্চিম পাশে তাদের অনেক গুলো ক্যাম্প সাইট আছে সেগুলো থেকে বেসিক প্রশিক্ষণ এবং সেখান থেকে আরো সামনে গিয়ে পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ হয় আর জংরি’র ডান দিক / উত্তর-পুর্ব দিক দিয়ে গোয়েচা লা ভিউপয়েন্ট এর দিয়ে সাধারণ ট্রেকার রা চলে যায়।

ট্রেকের বৈশিস্টঃ

একটি সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যানের ভিতর দিয়ে ট্রেক হওয়ায় এখানে মানুষের কোন স্থায়ী বসবাস নেই। কাজেই পুরো ট্রেকটাই ক্যাম্পসাইট ভিত্তিক অর্থাৎ থাকা-খাওয়ার সব রসদ ইয়োকসাম থেকে নিয়েই ট্রেক শুরু করতে হয়। প্রতিটি ক্যাম্প সাইটেই কাঠ, টিন অথবা পাথরের কিচেন এবং টয়লেট আছে। এই ট্রেকের প্রধাণ আকর্ষণ হচ্ছে জংরি’র চুড়া থেকে পুরো কাঞ্চনঝঙ্গা বেল্ট এবং পান্দিম বেল্ট একই সাথে দেখা যায় আর লামুনে থেকে সামনে এগিয়ে সামিট পয়েন্ট / ভিউ পয়েন্ট ১,২,৩ গুলো একদম কাঞ্চনঝঙ্গার গোড়ায় অবস্থিত যেটা থেকে কাঞ্চনঝঙ্গার এক অনন্য অসাধারন দৃশ্য দেখা যার সাথে তেঁতুলিয়া, দার্জিলিং, সান্দাকফু অথবা ফালুট থেকে দেখার কোন তুলনা ই হয় না। সামিট ভিউ পয়েন্ট থেকে একবার কাঞ্চনঝঙ্গার দিকে চেয়ে সূর্য উঠার আগে থেকে সূর্য উঠা পর্যন্ত সময়টুকু দেখতে পেলে এর আগে যেখান থেকেই কাঞ্চনঝঙ্গা দেখে থাকুন, সেটি স্মৃতি থেকে মুছে যাবে।

কাঞ্চনঝঙ্গা জাতীয় ঊদ্যানে প্রবেশের গেইট
কাঞ্চনঝঙ্গা জাতীয় ঊদ্যানে প্রবেশের গেইট

কোন স্থায়ী মানুষের বসবাস না থাকায় এই ট্রেক পুরোটাই ক্যাম্পিং করে চলতে হয়। তাবু, স্লিপিং ব্যাগ, খাওয়াদাওয়ার উপাদান সরঞ্জাম, গ্যাস সিলিন্ডার সব কিছু নিয়ে প্রস্তুত হয়েই ইয়োকসাম থেকে রৌনা দিতে হয়। সংরক্ষিত উদ্যান হওয়ায় এখানে কোন প্রকার ক্যাম্প ফাইয়ার এবং রান্নার জন্য কাঠের ব্যাবহার নিষিদ্ধ। ট্রেকের অনেক যায়গায় বিস্ফোরক দিয়ে দিয়ে পাথর ভেঙ্গে হাঁটা এবং ইয়াক-মিউল চলাচলের মত চউড়া রাস্তা করা আছে যার মাঝে অনেক বিপজ্জনক ছোট আইলের উপরে গাছের বড় বড় ডাল দিয়ে কিছু ব্রিজের মত তৈরি করা আছে এবং সেই গাছের ডাল গুলো একটার সাথে আরেকটা লাগানো হয়েছে বটগাছের শক্ত লতা দিয়ে অর্থাৎ পুরোপুরি অর্গানিক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ট্রেকে যথেষ্ট ময়লা, চকোলেট / বিস্কুটের প্যাকেটের খোসা এমন কি কাঁচের মদের বোতল ও পরে থাকতে দেখা গিয়েছে। জ্যুস অথবা কোমলপানীয়’র প্লাস্টিকের বোতল ও এদিক ওদিক পরে থাকতে দেখা গিয়েছে। এটি নভেম্বর ২০১৯ সালের রিপোর্ট। এই ট্রেকে অতিসত্বর একটি ক্লিনিং মিশন চালানো উচিত। ফরেস্ট অফিসার’রা লোকাল গাইডদের এই ব্যাপারে আরো সচেতন করতে পারে।

ট্রেকে যেদিক দিয়ে যাওয়া সেদিক দিয়েই ফিরে আসতে হয়। তবে ট্রেকের মাঝে কিছু বিপজ্জনক শর্টকাট ট্রেইল আছে যেগুলো স্থানীয় গাইড এবং ফরেস্ট অফিসার’রা ব্যাবহার করে, এই সব ট্রেইলে বহিরাগত ট্রেকারদের না যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া হয়। অবশ্য না জানলে সেই ট্রেইল ব্যাবহার করতেই চাইবে কে? সমস্যা হচ্ছে লোকাল গাইডরা ই অতি উৎসাহী হয়ে এগুলো ট্রেকার দের বলে আর এগুলো শুনে ট্রেকার’রা ফ্যাসিনেটেড হয়। যাওয়া আসা মিলিয়ে পুরো ট্রেইল প্রায় ৯৬ কিলোমিটার।

ট্রেইলের সব কিছু বহন করা হয় ইয়াক এবং মিউল দিয়ে। সাধারণত কোমড় মোটা থাকায় ইয়াকের উপরে তাবু, স্লিপিং ব্যাগ, চুলা ইত্যাদি দেয়া হয় আর মিউলের কোমড় চিকন হওয়ায় সেটার উপরে গ্যাস সিলিন্ডার দুদিকে চাপিয়ে দেয়া হয়। কোন ট্রেকার ইচ্ছে করলে তার পুরো ব্যাকপ্যাক পশুদের পরিবহনে দিয়ে দিতে পারেন কিন্ত সেটা ইয়োকসাম থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কারন প্রতিটি মালামাল এর সংখ্যা আর ওজনের উপর ভিত্তি করে কয়টা মিউল আর কয়টা ইয়াক নেয়া হবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে হঠাৎ প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই গাইড অথবা পোর্টারের কাছে ব্যাকপ্যাক দিয়ে দিতে পারেন কিন্ত সেটা বিশেষ ক্ষেত্রে কারন মনে রাখবেন ট্রেকে সবারই চলতে কষ্ট হয়, পশুদের ও হয় মানুষের ও হয়। কাজেই কেউ অভ্যস্ত বলে রাস্তার মাঝখানে একটু আরাম করার জন্য অন্যের ঘাড়ে ব্যাকপ্যাক চাপিয়ে দেয়া ঠিক না। ট্রেকের পুর্বেই যথেষ্ট শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির সাথে হোমওয়ার্ক করে নেয়া উচিত।

এই ট্রেক করার আগে অবশ্যই অবশ্যই ৩০০০ হাজার মিটার উচ্চতার ট্রেকিং করার অভিজ্ঞতা আবশ্যক। মানেভাঞ্জান থেকে নিজের ব্যাকপ্যাক নিজের পিঠে নিয়ে সান্দাকফু – ফালুট থেকে রিম্বিক পর্যন্ত পুরো সার্কিট ট্রেইল করা থাকলে সেটি হবে সবচাইতে আদর্শ প্রস্তুতি। এর কম হলে গোয়েচা লা তে অপেক্ষা করছে আপনার জন্য সীমাহীন কষ্ট। এই ট্রেইলে গাড়ী তো পরের কথা মিউলে করেও আপনি চলতে পারবেন না, কারন ট্রেইলে এত বেশী জিক-জ্যাক আর উঁচুনিচু আছে যে বরং যে কোন ভাবে হেঁটে গেলেই আপনি ট্রেইলের উপরে থাকবেন। বিশেষ অবস্থায় কোন সামর্থ্যবান গাইডের ঘারের উপরে অথবা স্ট্রেচারে করে নামানোর ব্যাবস্থা করতে হবে কিন্ত এর জন্য সামর্থবান লোক ট্রেকিং টিম এ থাকতে হবে। লোকাল গাইড আর পোর্টার এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত থাকে না। তাই খুব ভালো, পরিচিত এবং পরিক্ষিত ট্রেকিং এজেন্সির মাধ্যমে এই ট্রেক করা উচিত।

ইয়োকসাম থেকে ইয়োকসাম এই ট্রেক সাধারণত ৮ দিনের করা হয় তবে অনেকে ৬ দিনেও করে থাকেন। এটা একেবারে নির্ভর করে ট্রেকারদের সামর্থ্যের উপরে। কেউ যদি শুধু এচিভমেন্টের জন্য যেতে চান তাহলে ৫/৬ দিনেও এটা করে ফেলা সম্ভব। বেশ কয়েকজনের টিম তো ৩ দিনেও করে এসেছে। আর যদি স্বাভাবিক ভাবে একটু জায়গা দেখে শুনে উপভোগ করে চলতে হয় তাহলে নুন্যতম ৮ দিন লাগবেই।

ক্যাম্পিং গাইডেড ট্যুর হওয়ায় এই ট্রেকে আপনাকে অবশ্যই অবশ্যই একটি এজেন্সির সাহায্য নিয়ে যেতে হবে। ভারতীয়দের জন্যও একই নিয়ম। এ ক্ষেত্রে অনেকেই খরচ বাঁচানোর জন্য সরাসরি ইয়োকসাম গিয়ে লোকাল গাইড [যারা বাংলা তো বোঝেই না হিন্দিও অনেক সময় বুঝে না। এদের নেটিভ ভাষা নেপালী] নিয়ে ট্রেকিং করতে যান। তাদের অবশ্যই একদিন আগেই যেতে হবে কারন সন্ধ্যা ৭টায় গিয়ে পরের দিনের গাইড খোজার চাইতে নিজেদের থাকার ব্যাবস্থা করাটা বেশী জরুরী সেখানে। আর প্রতিটি ট্যুরের সাথে ক্যাম্পিং এর জন্য এতসব জিনিস যায় যেগুলো জোগার করতেও সময় লাগে। কলকাতা থেকে পরিচালিত ট্যুরিং এজেন্সি গুলো সাধারণত ৫/৬ জনের গ্রুপ এর ক্ষেত্রে পার হেড ১০,০০০/- থেকে ১২,৫০০/- পর্যন্ত চার্জ করে। কেউ এর বেশী ও করে। নির্ভর করে কি কি সুবিধা দিচ্ছে তার উপরে। যেমন অনেক ট্যুরে মজার মজার খাবার দেয়া হয় যাতে একপেশে না হয়ে যায়, আবার অনেক সস্তা ট্যুরে স্রেফ আলু আর ফুলকপির নিরামিষ দিয়ে মাইনাস টেম্পারেচারে ভাত খেতে হয়। কাজেই এজেন্সি ঠিক করার সময় তাদের খাবারের মিল কি দিবে সেটি চেক করে নিতে পারেন। এই ট্রেকে খাবার একটা খুব ভাইটাল ইস্যু কারন প্রতিটি ক্যাম্পসাইট এর দূরত্ব প্রায় গড়ে ৭/৮ কিলো আর এগুলোর উচ্চতা তো আছেই। কাজেই পেটে ঠিক মত দানাপানি না পড়লে দেখা যাবে সামিটে যাবার মত শক্তি পাচ্ছেন না লামুনে থেকে।

কলকাতার এজেন্সি গুলো ফেইসবুক ঘেটেই বের করতে পারবেন অথবা বাংলাদেশের জনপ্রিয় ফেইসবুক ভিত্তিক গ্রূপ গুলোতে পোস্ট দিয়েও কলকাতার ভালো এজেন্সি গুলোর রিভিউ নিতে পারবেন। বার বার কলকাতার এজেন্সির কথা বলছি কারন লোকাল গাইড নিলে অবশ্যই আপনাদের ভিতরে কমিউনিকেশন গ্যাপ হবে আর এরকম একটা ট্রেকে মিসকমিউনিকেশন খুব ফেটাল ইস্যু হয়ে যেতে পারে। তারা হয়ত আপনাকে একটা কিছু বলল আপনি বুঝলেন আরেকটা এমন হতে পারে। ধরুন আপনাকে বলল আমুক যায়গায় গিয়ে অপেক্ষা করতে, সে পিছনে আসছে অথবা একটু সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই যায়গায় গিয়ে দেখলেন কেউ নেই।

বাংলাদেশ থেকে কিভাবে যাবেন?

পোর্ট এবং ইমিগ্রেশনঃ

ট্রেকের ৮ দিন ধরে নুন্যতম সময়ে অর্থাৎ ঢাকা টূ ঢাকা ১০ / ১১ দিনে ট্রেকটি সম্পন্ন করতে চাইলে অবশ্যই বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি পোর্ট ব্যাবহার করতে হবে। আর যাদের হাতে সময় আছে বা সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই অথবা দার্জিলিং / সান্দাকফু / গ্যাংটক ট্যুর শেষে গোয়েচা লা করবেন তাদের ক্ষেত্রে এর বাধ্যবাধকতা নেই। ঢাকা থেকে বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন অফিস বিল্ডিং পর্যন্ত পৌছে দেয় বেশ কয়েকটি বাস তার ভিতরে হানিফ অন্যতম। ইমিগ্রেশন অফিস খোলার বেশ আগেই পৌছে দেয়। এই রুটে শ্যামলীর শিলিগুড়ি এবং সিকিম এর ডাইরেক্ট বাস ও যায়। কাজেই আপনাকে অবশ্যই অবশ্যই ইমিগ্রেশন রুমে সবার আগেই দাঁড়াতে হবে। বন্ধ থাকলেও দরজার আশে পাশেই থাকবেন যাতে সবার আগেই লাইনে থাকতে পারেন। এই সংক্রান্ত অন্যান্য লজিস্টিক কাজ ব্রোকারের হাতে ছেড়ে দিন। তারা হয়ত বোর্ডিং পাস আর কাস্টমস এর জন্য আপনার কাছ থেকে ১০০/১৫০/২০০ টাকা নিবে। আপনার দরকার সময় বাঁচানো তাই আপনাকে অন্যপথেই যেতে হবে। ইমিগ্রেশন শেষ করে দৌড়ে কোন অটো নিয়ে যত তারাতারি সম্ভব ভারতের ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশন অফিসে চলে যাবেন। মনে রাখবেন এই ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশন অফিসে ভারতীয়রা শ্যামলী কে সবার আগে প্রাধান্য দেয়। একবার আপনার আগে শ্যামলীর ৪০ টা পাসপোর্ট পরে গেলেই শেষ। কাজেই যে কোন মুল্যে আগে থাকতে হবে।
ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশন অফিসেও ১০০ রুপির মত লাগবে প্রতি পাসপোর্ট প্রসেস হতে।

শিলিগুড়ি থেকে ইয়োকসামঃ

আপনি যদি বাংলাবান্ধা এবং ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশনে শ্যামলী কে হারিয়ে সবার আগে শিলিগুড়ি এসএনটি জিপ স্ট্যান্ডে চলে এসে মনে করেন যে কঠিন কাজটি শেষ তাহলেই হয়েছে। মুল জটিলতা এখান থেকেই শুরু বাংলাদেশী দের জন্য। এসএনটি তে আপনার ছবি + পাস্পোর্ট এর ইনফো পেইজ দুটোর ফটোকপি + ভিসা পেইজের ফটোকপি দিয়ে সিকিমের ঢোকার জন্য ইনার লাইন পার্মিট নিতে হবে। এসএনটি তে শুধু আপনার ছবি আর কপি গুলো রেখে তাদের একটা ফর্ম পূরণ করে দিবে যেটা মেল্লি চেকপোস্টে আবার এন্ডোর্স করে নিতে হবে। শুধু গোয়েচা লা ট্রেকের জন্য বাংলাদেশ থেকে গেলে আপনার সাথে অবশ্যই ৪/৬ কপি ছবি আর ৪/৬ কপি পাসপোর্টের দুটো ইনফো পেইজের কপি আর ৪/৬ কপি ভিসা পেইজের কপি অবশ্যই অবশ্যই নুন্যতম থাকতেই হবে।

এসএনটি তে ফর্মের কাজ শেষ করে ইনার লাইন পার্মিট এর কাগজ নিয়ে এবার আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কিভাবে ইয়োকসাম যাবেন। শিলিগুড়ি থেকে খুব ভোরে একটা সংবাদপত্রের গাড়ি যায় ইয়োকসাম। আপনি সেটার সাথী হতে পারবেন না কারন ইমিগ্রেশন শেষ করে শিলিগুড়ি পৌছেই আপনার ১১টা বেজে যেতে পারে। বাকি রইলো দুটো রাস্তা।

ক) ২৫০০ থেকে ৩৫০০ রূপি দিয়ে ট্যাক্সি রিজার্ভ করে সরাসরি ইয়োকসাম যাওয়া। এটা কনভিনিয়েন্ট কিন্ত এতে আপনার খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
খ) জোরেথাং জিপ স্ট্যান্ড এ গিয়ে [যে কোন অটো কে বললেই নিয়ে যাবে] জোরেথাং যাওয়া আগে। জোরেথাং হচ্ছে শিলিগুড়ি থেকে মেল্লি চেকপোস্ট পার হয়েই ইয়োকসামের মাঝামাঝি একটি যায়গা। এটাকে একটা পরিবহনের হাব বলা যায়। এখান থেকে দার্জিলিং, কালিম্পং, গ্যাংটক, শিলিগুড়ি এবং কাছে পিঠের আরো কয়েকটা জায়গায় যাওয়া যায়। এখানে একটা বড় জিপস্ট্যান্ড আছে একটা বিশাল বহুতল পার্কিং লট নিয়ে। শিলিগুড়ি থেকে জোরেথাং পৌছে আপনাকে ইয়োকসামের জিপে চড়তে হবে। সমস্যা টা হচ্ছে ঠিক দুপুর ২/৩টার দিকে জোরেথাং থেকে ইয়োকসামের দিকে মানুষ খুব কম যায়। অর্থাৎ এমন ও হতে পারে যে আপনি ছাড়া জোরেথাং এর যাবার আর কেউ নেই! এর জন্য শিলিগুড়ি থেকে রৌনা দেবার সময় ড্রাইভার কে অনুরোধ করে বলতে হবে যে সে যেন জোরেথাংএ ফোন দিকে একটু খোঁজ নেয় যে জোরেথাং এর জিপ কখন যাবে আর তাতে আপনি একজন যাত্রী আছেন। বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি জার্নি।

এমন যদি হয় যে শিলিগুড়ি থেকে জোরেথাং এর দিকে জিপ যাচ্ছে না [হতেই পারে] অথবা জোরেথাং থেকে ইয়োকসামের দিকে জিপ যাচ্ছে না, তখন অবশ্যই আপনাকে রিজার্ভ অপশনে যেতে হবে কারন পরের দিন থেকেই যে আপনার ট্রেকিং শুরু! এর জন্য বারতি কিছু টাকা সাথে অবশ্যই রাখতে হবে যেটা খরচ না হলে ভালো কিন্ত প্রয়োজনে কাজে দিবে। শিলিগুড়ি থেকে জোরেথাং হয়ে ইয়োকসাম যেতে যেতে সন্ধায় হয়েই যাবে। ভেঙ্গে না গেলে ৫ ঘন্টা বা তার কিছু বেশী আর ভেঙ্গে গেলে ৬ ঘন্টা নুন্যতম লাগবেই।

পার্মিশনঃ

বাংলাদেশীদের গোয়েচা লা ট্রেক করতে গেলে দু ধরনের পার্মিশনের প্রয়োজন হয়। একটি হচ্ছে সিকিম ঢোকার পার্মিট যার নাম ইনার লাইন পার্মিট আরেকটি হচ্ছে রিস্ট্রিক্টড জোন পার্মিট যার নাম প্যাপ [PAP] পার্মিট। এসএনটি অথবা মেল্লি থেকে ইনার লাইন পারমিট করতে হবে আর প্যাপ করার জন্য এজেন্সির সাহায্য নিতেই হবে আর এটা নেয়ার এখতিয়ারও কেবল এজেন্সির। আপনি যখন মেল্লি তে ইনার লাইন পার্মিট করাবেন অথবা এনএনটি থেকে করে নেয়া পার্মিটের ফর্ম মেল্লি তে এন্ডোর্স করাবেন তখন এই ফর্মের মোবাইলে তোলা ছবি এজেন্সির রেস্পন্সিবল পার্সন কে পাঠাতে হবে হোয়াটস এপে তাহলে তাৎক্ষনিক ভাবে সেই দিন ই এজেন্সি আপনার বা গ্রুপের সবার প্যাপ পার্মিশন করে দিতে পারবে। প্যাপ পার্মিশন দেয়া হয় গ্যাংটক থেকে। মনেরাখবেন সব সময় হোয়াটস এপে অথবা এজেন্সি যেই কমিউনিকেশন সিস্টেমে কম্ফোর্টেবল তাতে তাদের সাথে সব সময় যোগাযোগ রাখতে হবে। এজেন্সি সিলেক্ট করার পর পর ই তাদের পাস্পোর্ট এর পেইজের স্ক্যান্ড কপি – ভিসার স্ক্যান্ড কপি আর ছবির স্ক্যান্ড কপি পাঠিয়ে দিতে হবে যাতে মেল্লি তে শুধু পার্মিশনের লম্বা কাগজের কপিটা দিলেই প্যাপ করে ফেলতে পারে। ইনার লাইন পার্মিট আর প্যাপ ই শুধু নয়, ইয়োকসামে এই কাগজ গুলো একটা দিতে হবে লোকাল পুলিশ স্টেইশনে আরেকটা লোকাল ফরেস্ট অফিসে। অনেক সময় ডকুমেন্ট মিসিং হয়ে যেতে পারে, তাই অন্তত ৬ কপি করে ছবি + পাসপোর্ট এর ইনফো পেইজের কপি + ভিসা কপি আর অন্তত ৪ কপি ইনার লাইন পারমিটের কপি সাথে রাখা সেইফ।

ট্রেকের বর্ননাঃ

ইয়োকসাম থেকে সাচেন অথবা বাখিম অথবা শোকাঃ

বাংলাদেশীদের প্যাপের হ্যাপার কারনে হয়ত দেরি হয়ে যেতে পারে এবং এজেন্সির গাইড যদি আগের দিন অফিস সময়কালীন সময়ের ভিতরে পার্মিশনের কাজ গুলো শেষ করে ফেলতে না পারে তাহলে সেগুলো সকালে করতে হবে। সাধারণত এজেন্সির তাদের কিছু নিজস্ব রিসোর্স এই ক্যাম্পিং ট্রিপে ব্যাবহার করে যেমন তাবু, স্লিপিং ব্যাগ, স্লিপিং ম্যাট, ফার্স্টএইড কিট, অক্সিজেন ক্যান ইত্যাদি। বাদবাকি রিসোর্স গুলো লোকাল গাইড এবং পোর্টার দের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হয় যেটা এজেন্সি ই করে থাকে। আর এইসব করার জন্য এজেন্সির গাইড আগের দিন ই ইয়োকসাম অবস্থান করে যাতে মেল্লি থেকে ইনার লাইন পার্মিটের ফর্মের ছবি দিয়ে প্যাপ পার্মিশন হয়ে যাওামাত্রই সেই কাগজ গুলো প্রিন্ট করে অফিসের বেলা শেষ হবার আগেই থানা এবং ফরেস্ট অফিসের কাজ গুলো করে রাখতে পারে। তাহলে পরের দিন স্রেফ নাস্তা করেই ট্রেক শুরু করা সম্ভব। আর নাস্তা করেই ট্রেক করতে শুরু করলে প্রথম সম্ভাব্য ক্যাম্পিং সাইট হয় সাচেন যেটা ইয়োকসাম থেকে ৭.৫ কিলো দুরে। ইয়োকসামের উচ্চতা ১৭৮০মি. আর সাচেনের উচ্চতা ২১৮৯মি। অর্থাৎ ইয়োকসাম থেকে সাচেন ৭.৫ কিলো ট্রেকিং এ প্রায় কম এবশী ৪১০ মিটার অল্টিচিউড গেইন হবে যেটা ট্রেকিং এর জন্য আদর্শ। হাই অল্টিচিউড ট্রেকিং এ এক স্থানে ঘুমানো থেকে আরেক স্থানে ঘুমানোর উচ্চতা ৫০০ মিটারের আশে পাশে থাকা আদর্শ যাতে কেউ উচ্চতাজনিত অসুস্থ্যতায় আক্রান্ত না হয়। তবে কেউ ইচ্ছে করলেই বাখিম চলে যেতে পারেন আর চাইলে শোকা তে ও উঠে যায়া যায়। বাখিম থেকে শোকা মাত্র ১ ঘন্টার রাস্তা। বাখিম এ টেন্ট পিচ করার যায়গা কম, তবে যে যায়গা টা টেন্ট পিচ করার জন্য রাখা হয়েছে সেটা কম্পনাতীত সুন্দর। একদম খাঁড়া একটা ভ্যালির উপরে চাঁদের মত একটা যায়গায়, সামনে দিকে তাকালে ভাজ করা ভাজ করা পাহাড় গুলো দেখা যায়। আর শোকা হচ্ছে একটা বেশ বড়সড় একটা এলাকা যেখানে অনেক গুলো ক্যাম্পসাইট রয়েছে এবং অনেক টিমকেই যায়গা দেয়া সম্ভব।

সাচেন ক্যাম্পসাইট
সাচেন ক্যাম্পসাইট

শোকা তে এইচএমআই এর নিজস্ব লজ – কিচেন -টয়লেট আছে যার কিচেন এবং টয়লেট অন্যরা শেয়ার করতে পারে কিন্ত লজটা প্রশিক্ষনার্থিদের জন্যই। তবে কখনো কোন দিন / রাতে যদি প্রশিক্ষনার্থিরা না থাকে তখন এই লজে থাকা যেতে পারে।

সাচেনে মুল ট্রেক এর রাস্তার এক পাশে ক্যাম্প সাইট আরেক পাশে কিচেন আর টয়লেট। একটা টিনের ছাদ ওলা খোলা ডাইনিং ও আছে কিচেনের পাশে। কিচেন আর টয়লেট হচ্ছে রাস্তার নিচু অংশে আর রাস্তার অন্যপাশে উপরের অংশে ক্যাম্পসাইট। সাচেনের ক্যাম্পসাইটের একটা অন্যরকম সৌন্দর্য আছে। বড় বড় গাছের গোড়ার পাশে ক্যাম্প করা, নিঃশব্দ রাতে খশ খশ করে ঝরে ঝরাপাতা। অনেক সময় এই শব্দ ভয়ের কারন ও হয়। চাঁদনী রাতে এই ক্যাম্পসাইটে বসে একদিকে চাঁদ আর পিছনে বিশাল বিশাল সব গাছের অন্ধকারে আড্ডা দিয়েই অনেক রাত অব্দি সময় কাটানো যায়। হ্যাঁ দুঃখ একটাই, কোন ধরনের ক্যাম্প ফাইয়ার এলাউড না। কাজেই শীতে আগুন তাপীয়ে মজা করার স্বপ্ন টা অন্য কোন জায়গায় করতে হবে। অবশ্য নিচে কিচেনে গিয়ে চুলার পাশে বসে আগুন তাপাতে পারেন কিন্ত সারাদিন কষ্ট করে আসা গাইড / পোর্টার দের খেদিয়ে আপনাকে সেখানে যায়গা নিতে হতে পারে যেটা খানেকটা অমানবিক।

সাচেন যাবার পথে একটি ব্রিজ
সাচেন যাবার পথে একটি ব্রিজ

এখানে কিচেনের সাথে দোকান ও আছে অর্থাৎ পানির বোতল চকোলেট লজেন্স এখানে পাবেন। আরো অন্য কিছু ও পাবেন যেগুলো উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি না। এজেন্সি কিন্ত ট্রেকের শুরুতেই অর্থাৎ ইয়োকসাম থেকেই প্রত্যাককে কিছু চকোলেট/কাজুবাদাম/খেজুর দিতে পারে। সেইফটি হিসেবে সাচেন থেকে কিছু চকোলেট কিনে নিলেন যদি সাথে না নিয়ে আসেন। ব্যাবসা ইয়োকসাম না, সাচেনেও কিছু হোক। এখানে ডাইনিং এর পাশে একটি ঝর্ণার পানি কে পাইপ দিয়ে ডাইভার্ট করে বসানো আছে। অবশ্যই নিজেদের বোতল গুলো ভরে নিবেন। বোতল ভড়ার সময় একটা পাতলা কাপড় বোতলের মুখের উপরে দিয়ে পানি ভরলে ভালো তাতে ঝর্ণার সাথে চলেআসা ছোট ছোট পাথরের কণা গুলো ফিল্টার হবে।

সাচেন যাবার পথে
সাচেন যাবার পথে

ইয়োকসাম থেকে সাচেনের রাস্তায় স্বাভাবিক ট্রেকিং এর মত উঠা নামা আছে তবে বড় কোন খাঁড়া স্টিপি এলিভেশন নেই। ট্রেকিং করে যারা অভ্যস্ত এবং আগের দু দিন বাস এবং জিপে করে জার্নি করে এই যায়গায় পা চালু করার জন্য আদর্শ। ইয়োকসাম থেকে ট্রেকিং শুরু করার পর থেকেই দেখা যাবে ট্রেইলে অপর দিক থেকে আসা ইয়াক এবং মিউলের জন্য সাইড দিয়ে দাঁড়াতে হবে। অবশ্যই অবশ্যই সেদিকে মাটি / পাথর / পাহাডের মুল ঢাল সেদিকে সাইড দিয়ে দাড়াবেন। কখনোই ঢালের অপর পাশে, যেখান থেকে ঢাল নিচের দিকে নেমে গিয়েছে সেদিকে দাঁড়িয়ে সাইড দিবেন না।

সাচেন থেকে শোকাঃ

সাচেন থেকে শোকার দূরত্ব কম বেশী ৭ কিলো আর শোকার উচ্চতা ২৯৮৫মি. সাচেন থেকে শোকা অল্টিচিউড গেইন প্রায় ৮০০ মি.
ইয়োকসামে থেকে সাচেনের রাস্তার ট্রেকের সব চাইতে বড় চার নাম্বার ব্রিজের পরে একটা স্টিপি খাঁড়া ট্রেইল আছে বাখিম পর্যন্ত। বাখিম থেকে শোকা পর্যন্ত অত খাঁড়া না অবশ্য। ইয়োকসাম থেকে সাচেন গিয়ে পা এর অভ্যস্ততার উপরে যথেষ্ট প্রেশার পড়বে এই ট্রেইলে। নামা উঠা দুটোই বেশ ভালো ভাবেই করতে হবে। এর সাথে মহীরুহ হিসেবে উল্টো দিক থেকে অথবা নিজেদেরই ইয়াক এবং মিউলের ট্রেইন সামাল দেবার ব্যাপার তো আছেই।

সাচেন থেকে শোকা যাবার পথে চার নাম্বার শেষ ব্রিজ
সাচেন থেকে শোকা যাবার পথে চার নাম্বার শেষ ব্রিজ

গোয়েচা লা ট্রেক নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট আর ছবি দেখে থাকলে এতটুকু জানবেন যে এখানে চারটা ব্রিজ আছে। ইয়োকসাম থেকে সাচেন পর্যন্ত তিনটি ব্রিজ আর সাচেন থেকে শোকা যাবার পথে শেষ লম্বা একটি ব্রিজ আছে। এই লম্বা ব্রিজ শেষেই উঠা শুরু এবং শেষ বাখিম হয়ে শোকা গিয়ে। যারা সাচেনে রাত কাটাবেন তাদের ক্যাম্পিং শোকা তে হবে আর যারা আগের দিন বাখিম বা শোকা চলে আসবেন তারা পরের দিন জংরি চলে যাবেন। ইয়োকসাম জিপ স্ট্যান্ড থেকে যখন আমরা আমাদের হোটেলে যাচ্ছিলাম যেটা প্রায় ১ কিলো দুরে এবং ট্রেক শুরু করার ঠিক কাছেই, সেই পথে অনেক ট্রেকার দের দেখলাম ফিরে আসছে ট্রেক করে। তাদের ভিতরে কেউ জংরি থেকে ফেরত আসছে কেউ পুরো ট্রেক করেই আসছে। সাচেন থেকে চার নাম্বার ব্রিজ ক্রস করে উপরে উঠার সময় একদল ট্রেকার আমার গায়ে নিয়াজ ভাই এর বাংলাদেশের টিশার্ট দেখে সরাসরি বাংলায় বলল, যান তবে খুব খাঁড়া, জংরি তে উঠতে গিয়ে তো চার হাত পা আচরে উঠতে হয়েছে! আমি শুনে খানেকটা ভয় পেলাম তবে দমে যাইনি, কারন? কারন অভিজ্ঞতা।

যাবার সময় শোকা ক্যাম্পসাইট
যাবার সময় শোকা ক্যাম্পসাইট

শোকাতে বেশ কয়েকটা ক্যাম্পিং সাইট আছে এর ভিতরে এইচএমআই এর ডর্মেটোরি লজ টাই সব চাইতে বড়। এখানে জংরি ক্যাম্পসাইট থেকে ফিরে আসা প্রশিক্ষনার্থিরা ইয়োকসাম ফিরে যাবার আগে শোকা তে অবস্থান করেন। ডোর্মেটোরিতে ১৬টা ব্যাংক বিছা আছে আর বড় একটা ডাইনিং আছে যেটাতে ফ্লোরিং করা হয় রাতে। পাশে একটা বড় কিচেন, চারটা কল সহ পানির ব্যাবস্থা আর চারটি টয়লেট। এই ক্যাম্পসাইট ছাড়া ও উপরে আরো ক্যাম্প সাইট আছে সেখানে কাঠ আর টীনের কটেজের পাশে ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড, কিচেন টয়লেট আর কেউ ভিতরে থাকতে চাইলে রুম ও আছে বাংক বিছানা সহ। রাতে সেখানে থাকলে গেলে ১০০ রূপি করে দিতে হয় আর স্লিপিং ব্যাগ নিলে আরো ৫০ রূপি।

উপর থেকে দেখা শোকা
উপর থেকে দেখা শোকা

শোকা তে সামনে পুকুর সহ একটি মন্দির আছে যেটা উপর থেকে দেখলে বেশ নান্দনিক লাগে। এখানে কিছু কিচেনের পাশে সাপ্লাই স্টোর আছে সেখান চকোলেট-পানীয় সহ মোটামটি ট্রেকে লাগে এমন সব কিছুই পাওয়া যায়। ইয়োকসাম থেকে বেশ কিছু দূর এগোলেই আর মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না – সাচেনে তো নয় ই তবে বাখিমে ইয়োকসামের দিকে মুখ করে দাড়ালে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় আর শোকাতে এইচএমআই ডর্মেটোরির সামনের ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে শোকা মুখি দাড়ালে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় তবে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক বলে ভয়েস কমিউনিকেশন হয়, ডাটা কানেকশন / ইন্টারনেট পাওয়া যায় না। আকাশ পরিষ্কার থাকলে শোকা থেকে পান্দিম এর চুড়া দেখা যায়। গোয়েচা লা ট্রেকের বৈশিস্ট হচ্ছে একটি সাইট থেকে আরেকটি সাইট আর একটু কঠিন আরেকটূ ঠান্ডা। ইয়োকসাম থেকে সাচেন আসলে এক ধরনের ঠান্ডা আর শোকা আসলে মনে হবে আরো ঠান্ডা এবং ট্রেক ও অনেক খাঁড়া। কারন এর পরে আসছে আরো কষ্টের দিন।

শোকা থেকে জংরিঃ

শোকা[২৯৮৫মি.] থেকে জংরি[৪০৬০মি.] এর দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। কিন্ত শোকা থেকে ফেদাং অব্দি গিয়ে সেখান থেকে দেউরালি নামে একটা উঁচু ভিউ পয়েন্ট আছে, সেখানে যেতে গেলে প্রথম অবস্থায় একেবারে জান কবচ হয়ে যায়। বহুতলা গার্মেটস ফ্যাক্টরির বিল্ডিং এর বাইরের ফাইয়ার এসকেইপ সিড়ির মত খাড়া সেই রাস্তা।

শোকা থেকে হেলতে দুলতে রৌনা দিলে কিছুদুর পর থেকে শুরু হবে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে রাস্তা। মাটির ভিতরে ট্রেইল হওয়ায় কাঠ এবং বাঁশ দিয়ে সিড়ির মত পাটাতন দেয়া ফেদাং অব্দি। এখানে খুব বেশি খাঁড়া নেই তবে ঠিক ফেদাং উঠার আগে একটা খাঁড়া ট্রেইল আছে বড় বড় পাথরের চাই এর পাশ দিয়ে। দৃশ্যটা খুব সুন্দর কিন্ত চিকন এই ট্রেইলে ইয়াক-মিউল কে সাইড দিতে গিয়ে খুব সাবধানে থাকতে হয় কারন বিশেষ করে ইয়াকের শিং গুলো বেশ লম্বা ছড়ানো এবং ছুঁচালো। ট্রেইলের বাঁকে ব্যাকপ্যাকের কোণায় লাগলেও ধাক্কায় পড়েযেতে পারেন। তাই অবশ্যই তাদের সাইড দিবেন ট্রেইলের ধারের বিপরীত অংশে।

শোকা থেকে ফেদাং যাবার পথের ট্রেইল
শোকা থেকে ফেদাং যাবার পথের ট্রেইল

আমরা এইটুকু জানি যে পাহাড়ে সেটেলমেন্ট অর্থাৎ মানুষের বসতি গড়ে উঠে সেখানেই সেখানে পানির উৎস / ঝর্না হয়েছে কাছাকাছি। এই ট্রেকেও এর ব্যাতিক্রম নেই শুধু এই ফেদাং ছাড়া। এইখানে পানির কোন সোর্স নেই তাই এখানে খুব প্রয়োজন না হলে কেউ ক্যাম্পিং করে না। সাধারণত শোকা থেকে বের হবার সময়ই প্যাকলাঞ্চ দেয়া হয় যেটা ফেদাং এসে খেয়ে নিতে হয়। কারন এর পরেই আছে দেউরালীটপ যেটা উঠার রাস্তা হচ্ছে উঁচু কোন ভবনের ফাইয়ার এস্কেইপের মত। ট্রেইল একদম খাঁড়া আরি জিক-জ্যাক করে উঠে গিয়েছে। এই ধরণের মহীরুহ ট্যাকেল দিতে হলে পেটে ভালো দানাপানি থাকতেই হয়।

দেউরালী টপের উচ্চতা প্রায় ৪০০০ মিটারের মত আর এখান থেকে পুরো কাঞ্চনঝঙ্গা বেল্ট আর পান্দিম পুরোটাই দেখা যায় আবহাওয়া ভালো থাকলে। এখানে উঠে এসে একটু বিশ্রাম নিতেই হবে। এর পরে জংরির রাস্তা একটু উপরে উঠেই সমতল এবং নিচের দিকে নেমে গিয়েছে।

প্রথম প্রথম জংরি তে গেলে ঠিক কোথায় গ্রূপের তাবু ফেলা হয়েছে সেটা ঠাহর কথা খুব কঠিন হবে, কারন ক্যাম্প সাইটের বাম পাশের অংশ কেবল রাস্তা থেকে দেখা যায় আর প্রথম এলে সেটাই পুরোটা জংরি ভেবে সেদিকেই রৌনা দেয়া স্বাভাবিক। কিন্ত ডান পাশে টিনের কিছু ঘর যেগুলো ডাইনিং এর বেশ কিছু কিচেনের সমষ্টি সেগুলো ভিতর দিয়ে বের হয়ে আরেকটা ক্যাম্প সাইটে যাওয়া যায়। তাই জংরি মুখে যাওয়ার সময় গাইড কে জিজ্ঞেস করে নেয়া যেতে পারে কোথায় ক্যাম্প করা হবে। পুরো ট্রেকের এই এক জায়গাতেই কেবল একটা ফাইয়ারপ্লেস পাবেন, সেই কতগুলো কিচেনের চিপায়। একটা দোকান ও আছে যেখানে লজেন্স গ্লাভস পেট্রলিউয়াম জেলি ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিতে পারবেন।

জংরি থেকে জংরি টপ উঠতে চাইলে গাইড কে বলে রাখতে হবে যেন রাত ২টার দিকে উঠে দেয়। জংরি পৌছালে অবশ্যই অবশ্যই জংরি টপ এ উঠা উচিত। এটা জংরির একটা চুড়া যার উচ্চতা ৪১৭১মিটার। রাতে তারাতারি খেয়ে শুয়ে পড়লে রাত ২টা বা আড়াইটার দিকে উঠে তিনটার দিকে রৌনা দিলে সূর্যোদয়ের আগেই জংরি টপে পৌছে যেতে পারবেন। যেখানে রাতে উঠে ট্রেক করতে হয় সেখানে টেন্ট থেকে উঠলেই আপনাকে গরম চা দেয়া হবে যা আসলেই তাৎক্ষনিক ভাবে চাঙ্গা করে তোলে। জংরি টপে অনেক বাতাস থাকে আর ঠান্ডা তো বলাই বাহুল্য, তাই পুর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হবে। অবশ্য ফিরে নেমে আসার সময় রোদ উঠে গেলে একে একে সব গুলে নামতে হতে পারে। জংরি টপের উপর থেকে ভোরের সূর্যের লালীমায় কাঞ্চনঝঙ্গা এবং পান্দিম এর পুরো বেল্ট টা একসাথে ৩৬০ ডিগ্রী এঙ্গেলে দেখার কোন তুলনাই হয় না।

জংরি থেকে থানসিং অথবা লামুনেঃ

জংরি টপ থেকে নেমে এসে নাস্তা করে ধীরেসুস্থ্যে থানসিং অথবা লামুনের দিকে রৌনা দেয়া। এটা এমন না যে যারা ৬ দিনে ট্রেক শেষ করেন তারা জংরি থেকে লামুনে চলে যান। ৬ দিনে ট্রেক শেষ করেছেন এমন ট্রেকার দের ও দেখেছি যারা থানসিং থেকে রাত ১২টায় রৌনা দিয়ে লামুনে ক্রস করে ভিউপয়েন্ট ঘুরে এসে শোকা চলে গিয়েছে। কাজেই কোথায় ক্যাম্প হবে সেটা কয়দিনে ট্রেক হচ্ছে তার উপরে নির্ভর করে। আমাদের ট্রেক ৮ দিনের হওয়ায় আমরা জংরি তে একদিন বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলাম কিন্ত সেটা পরিবর্তন করে থানসিং চলে গিয়েছিলাম। থানসিং এর উচ্চতা ৩৯০০মিটারের মত। জংরি থেকে থানসিং যাবার পথে ঠিক ফেদাং থেকে যেমন দেউরালী টপ উঠা তেমনি একটা নামা আছে কুকুচুরুং পর্যন্ত। ভিউপয়েন্ট সামিট শেষ করে লামুনে থেকে এসে সাধারণত কুকুচুরুং এই ক্যাম্পিং হয়। আমরা যাবার সময় কিচেনের ঘরটায় তালা দেয়া দেখেছিলাম অর্থাৎ এইসব কিচেন-ঘর গুলো কারো না কারো তত্ত্বাবধায়নে চলে যেমন ফরেস্ট অফিস। কুকচুরুং পর্যন্ত নেমে এর পরে প্রায় সমতল থেকে ধীরে ধীরে উঠা। কুকুচুরুং থেকে কাঞ্চনঝঙ্গার গ্লেশিয়ার থেকে নেমে আসা একটি খরস্রোতা পাহাড়ি নদী ধরে এগিয়ে যেতে হয় যা থানসিং হয়ে লামুনে পর্যন্ত দেখা যায়। এর পরে নদীর উৎস বামে আর আমরা ডানে চলে যাই ভিউপয়েন্টের দিকে। প্রচন্ড স্রোতের শব্দ আর বড় বড় পাথরের চাই এর উপরে থেকে এই ট্রেইলটি ধরে ট্রেক করতে গেলে শারীরিক কষ্টের কথা না চাইলেও ভুলে থাকা যায়। আসলে গোয়েচা লা’র প্রতিটি ক্যাম্পিং সাইট থেকে আরেকটি ক্যাম্পিং সাইটের ট্রেইল এক এক রকম বৈশিস্টের, এক একরকম চরিত্রের, একএক রকম বৈচিত্রের। পুরো ট্রেক শেষ করেও একটার উপরে আরেকটার প্রাধান্য দেয়া যায় না। জংরি থেকে লামুনে পৌছাতে পূছাতে দুপুর হয়ে যায় কিন্ত লামুনে ক্যাম্প সাইটের বামের নদীর ওপাড়ে একটা বড় পাহাড় থাকায় সূর্য বেশ আগেই ডূবে যায় এখানে, মানে পাহাড়ের ছায়া পরে যায় ক্যাম্পসাইটে এবং পাহাড়ের ছায়াতে পুরো থানসিং ডূবে গেলেও দুরে কাঞ্চনঝঙ্গা তে এক দেড় ঘন্টা সূর্যের লালীমা থেকে যাবে। বাম দিকের এই পাহাড় টা জংরি থেকেই চলে এসেছে এই পর্যন্ত।

জংরি টপ থেকে দেখা কাঞ্চনঝঙ্গা
জংরি টপ থেকে দেখা কাঞ্চনঝঙ্গা

থানসিং একটা সমতল যায়গা, তাই নির্ধারিত ক্যাম্প সাইটের বাইরেও অনেক যে যেদিকে পারে কিচেনের কাছাকাছি অথবা ক্যামের কোলাহল থেকে দুরে ইচ্ছে মত তাবু টানিয়ে ক্যাম্প করতে পারে।থানসিং এ শুধু বামে পাহাড় না, ডানে পুরো পান্দিম এবং তার বেল্ট উঠে গিয়েছে। যেই পান্দিম কে সান্দাকফু থেকে ফ্রেম বন্দি করার কতো চেষ্টা সেই পান্দিম ঠিক মাথার উপরে আর আমরা দাঁড়িয়ে আছি গোড়ায়। থানসিং আর লামুনে হচ্ছে অনেকটা কড়াই এর মত, দুদিকেই পাহাড় আর সকাল হলেও যেমন সুর্যের আলো আসতে দেরি হয় তেমনি সন্ধ্যার আগেই ছায়ায় ঢেকে যায়।উচ্চতার যেমন অভ্যস্ততা / এক্লিমাটাইজেশন আছে তেমনি আবহাওয়ার ও অভ্যস্ততা আছে। সাচেন থেকে শোকার ঠান্ডা বেশি, শোকা থেকে জংরি আর থানসিং থেকে লামুনে। রাতে ডিনার করে তাবুতে একবার ঢুকে গেলে প্রস্রাবের বেগ আর ঠান্ডা তে যুদ্ধ চলতেই থাকে। শেষে প্রসাবের বেগ এর ই জয় হয় কিন্ত গভীর রাতে স্লিপিং ব্যাগ খুলে নিজেকে আর প্রিপেয়ার করে টেন্টের চেইন খুলে বুট পরে কাজ শেষে আবার সব কিছু রিভার্স করার পর মনে হবে দেহে আর কোন শক্তি অবশিষ্ট নেই। বরফের ভিতরে যারা ক্যাম্পিং করে কোন ট্রেকিং ট্রিপে যেতে চান তাদের জন্য গোয়েচা লা হবে আদর্শ ওয়ার্কআউট / হোমওয়ার্ক। তবে হ্যাঁ, থানসিং এবং লামুনে এসে ভিউ পয়েন্ট যেতেই হবে, কারন অনেকেই জংরি থেকেই বিদায় নেয় আবার কেউ কেউ থানসিং অথবা লামুনে থেকে।

কুকুচুরুং নামার ঠিক আগে উপর থেকে দেখা থানসিং
কুকুচুরুং নামার ঠিক আগে উপর থেকে দেখা থানসিং

যাইহোক, আমাদের রেস্ট ডে ছিলো সেটাকে আমরা জংরি থেকে থানসিং এসে কাজে লাগিয়েছি।

থানসিং থেকে লামুনেঃ

থানসিং থেকে লামুনের রাস্তা এক প্রকার সমতল ই বলা যেতে পারে তবে বামের খরস্রোতার শব্দ আর বিচিত্র সব রঙের ঝোপঝাড় এই রাস্তাটাকে অন্যরক্ম এটা সৌন্দর্য এনে দিয়েছে। ট্রেইলের মাঝামাঝি আমাদের গ্রূপের এক সদস্য নিরু দা আমাদের দেখালেন দুরে পাহাড়ি ছাগল / ব্লু শিপ চরে বেড়াচ্ছে নদীর ঐপাড়ে। কাজেই যারা এই পথে যাবেন একটু খেয়াল করলেই তাদের দেখতে পাবেন। সেই ইয়োকসাম থেকে আমাদের গাইড প্রদিপ দা বলে এসেছেন যে লামুনে তে অনেক বাতাস! কিন্ত কিরকম বাতাস সেটা গিয়ে টের পেলাম। বাতাস তো বাতাস, এমন ঠান্ডা বাতাস যে ব্যাগ খালি করে সবকিছু গায়ে পরেও মৃগী রোগীর মত কাপাকাপি অবস্থা! সবার মনেই অবশ্য একটাই জিনিস কাজ করছিলো, রাত ২টোয় রৌনা দিতে হবে আর ১টায় ডেকে দিবে চা খাওয়াবে আর রেডি হবার সময় দিবে। তবে বাতাসের তোড়ে আর চোখের সামনে আগুন রঙের কাঞ্চনঝঙ্গা সে সব চিন্তা দূর করে দিয়েছিলো।

থানসিং থেকে লামুনে যাবার পথে ব্লু শিপ দেখে ফেলা
থানসিং থেকে লামুনে যাবার পথে ব্লু শিপ দেখে ফেলা

সামিট, ভিউপয়েন্ট ১

আগেভাগেই ডিনার শেষ করে শুয়ে পড়েছিলাম। এই রাতে আর ঘুম ভাঙ্গেনি, একদম গাইডের ডাকে ১টায় ঘুম ভাঙ্গে। আমি আর সাজিদ ভাই দুজনে তাবুর ভিতরে ঘুরে ফিরে দেখেশুনে রেডি হয়ে বের হতে হতে আরো ২০ মিনিট। উঠেই দেখি চা নিয়ে রেডি। আজ দু গ্লাস চা খেলাম, কপালে কি আছে কে জানে। তাবু থেকে বের হবার সময় হেড ল্যাম্প টা দেখলাম কাজ করছিলো না। তবে ঢাকা থেকে আসার সময় ই সাইকেলের টর্চ টা নিয়ে এসেছিলাম। ব্যাকআপ সত্যি ই কাজে লাগলো, তবে ট্রেকে একটা হাত আরকি সবসময় ব্যাস্ত থাকছে লাইট ধরে।

ভিউপয়েন্ট ১ থেকে দেখা কাঞ্চনঝঙ্গা
ভিউপয়েন্ট ১ থেকে দেখা কাঞ্চনঝঙ্গা

ভরা পুর্নিমায় চাঁদের লোয় রৌনা দিলাম ভিউপয়েন্টের উদ্দেশ্যে। কিছুদুর যাবার পরে দেখি আমার সামনে সাজিদ ভাই এর প্যান্টের পিছনে পুরোটা ভেজা! উনি যে পানির বোটল নিয়েছিলেন পিঠের ডে প্যাকে সেই পানির বোতলে গরম পানি ভরায় সেটা লিক করে সেখান থেকে পানি পরে তার প্যান্ট একাকার। বাধ্য হয়ে উনি প্যান্ট খুলে ব্যাগে রাখলেন, না না পায়ে উনার তিন তিনটা লেয়ার ছিলো। সমিতি লেইক পর্যন্ত যাবার পরে নিজেকে বেশ ক্লান্ত লাগছিলো। নিজেকে প্রায় টেনে টেনে শেষ পর্যন্ত ভিউ পয়েন্টে যখন পৌছালাম তখন দেহের আর এক বিন্দু শক্তি অবশিষ্ট নেই। আমাদের টিম থেকে আমাকে খেজুর অফার করা হলো, টপাটপ দুটো খেজুর খেয়ে দেহ মন বেশ চনমনে হয়ে গেলে, ছবিও তোলা শুরু করলাম।

সমিতি লেইক
সমিতি লেইক

এতদিন এই কাঞ্চনঝঙ্গা দূর থেকে দেখে কত শত ছবি তুলেছি, বার বার সান্দাকফু গিয়েছি। অতচ আজ একদম তার গোড়ায়, কাছে থেকে আর অবায়ব মেলাতে পারছিনা কিন্ত সামনে থেকে যা দেখছি তাই সত্য। একদম সুবহে সাদিক থেকে সূর্য উঠে তার লালীমা শেষ হওয়া পর্যন্ত অবস্থান করে শেষে নিচের দিকে রৌনা দিলাম। নিচে নামছি আর চিন্তা করছি এই রাস্তা দিয়ে রাতে উঠে গিয়েছি। অন্ধকারের রাস্তা আলোতে রিটার্ন করলে কি একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি হয় তা বলে প্রকাশ করা যায় না।

ফিরে আসাঃ

লামুনে ফিরে এসে নাস্তা খেয়ে ধীরে ধীরে হেলতে দুলতে থানসিং গিয়ে সেখানে লাঞ্চ করে আবার গদাইলস্করি ভাবে কুকচুরুং এ চলে এলাম। কুকুচুরুং থেকে আরেকটা ট্রেইল সোজা ফেদাং পর্যন্ত চলে গিয়েছে কিন্ত এই ট্রেইল মোটামোটি সমতল কারন সেটা জংরি কে বাইপাস করা। তবে ইয়াক আর মিউলরা রেগুলার ট্রেইল অর্থাৎ জংরি ধরেই ব্যাক করবে কারন কুকুচুরুং থেকে ফেদাং এর ডাইরেক্ট ট্রেইল এত চিকন যে সেখানে এই পশুগুলো যেতে পারবে না অথবা একে অপর কে ক্রস করতে পারবে না। আগেই বলেছি এক এক টা ট্রেইলে এক এক রকম বৈশিস্ট। সামিট পয়েন্টে যাবার পরে আর কোন সারপ্রাইজ অপেক্ষা করনি তবে এই ট্রেইল টা আসলেই একটা সারপ্রাইজ ছিলো। একদম বান্দরবানের চিকন রিস্কি ট্রেইলের মতই ছিলো, হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে ভুলেই গিয়েছিলাম আমি কোথায় আছি। ট্রেইলের শেষে হঠাৎ করেই সামনে ফেদাং চলে আসে, যেন সামনে লুকিয়ে ছিলো। ফেদাং থেকে শোকা। শোকা তে অনেক রাত অব্দি জেগে ছিলাম কারন তেমন ঠান্ডা লাগছিলো না আর ট্রেক শেষ করার একটা পার্টি ও ছিলো। আবহাওয়ার অভ্যস্ততার ব্যাপারে বলছিলো আমাদের গাইড, এখানে এসে বাস্তব উদাহারন পেলাম। এই শোকা তে উঠার সময় কত কাপাকাপি অথচ এখন সেই রকম কোন ঠান্ডা লাগছেই না। মানে শরীর অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।

পরেরদিন শোকা থেকে সোজা ইয়োকসাম। ইয়োকসামে আগেই রিজার্ভ করে রাখা একটা গাড়ি ছিলো যেটা যাবে জোরেথাং পর্যন্ত। সেখান থেকে আমরা আরেকটা জিপ নিয়ে সোজা শিলিগুড়ি।

ট্রেকের সব গুলো ভিডিও পাবেন এই প্লেলিস্টে

অবশিস্টঃ এই ট্রিপে অনেক ঘটনাই ঘটেছে যা ছিল বেশ রোমাঞ্চকর আর কিছু ছিলো বেদনাদায়ক। কিন্ত সব কথা লিখার জন্য এখন আর হাত চলে না। এই পরন্ত বয়সে মনে হয় কিছু কথা যেন জমা থাকুক সেই সব মানুষ দের মাঝে যাদের সাথে বেশ কয়েকদিন একটা সুন্দর সময় কেটেছে। কিছু বাতাস ঘরের ভিতরেই থাক, কিছু কথা নিজেদের ভিতরেই চলুক।

এই নিরস-বিদারি লিখার পুরো কৃতিত্ব আসাদুজ্জামান সাজ্জাদ ভাই এর। এই লোক আমাকে নক দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো ভাই লিখা কদ্দুর, আমিও চাপা মেরে বলে দিয়েছিলাম এইত এই মাসেই শেষ। ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখ নক দিয়েছিলেন উনি আর আমি আসলে শুরুই করেছিলাম ২৪ তারিখ থেকে আর আজ শেষ করছি লিপ ইয়ার ২৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ এ। গোয়েচা লা ট্রেকে যাবার ব্যাপারে সবচাইতে বেশী জালিয়েছি এই সাজ্জাদ ভাই কে কিন্ত উনি আমার প্রতি একটু ও বিরক্ত হন নি। আশা করি কোন এক ট্রেকে দেখা হবে সাজ্জাদ ভাই এর সাথে।
ফি আমানিল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

© 2020 My Travell Info | All Rights Reserved