শুরুতেই বলে রাখি যে এটি হচ্ছে আমার সান্দাকফুতে দ্বিতীয় ট্যুরের বর্ণনা এবং প্রথম ট্যুরের যাবতীয় বর্ণনা ছবি সহ এই লিংকে পাবেন।

প্রথম ট্যুরে এই ট্রেকিং রাউটের বর্ণনা আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব দেয়ার চেষ্টা করেছি তাই এই দ্বিতীয় ট্যুরে এমন কিছু বলার চেষ্টা করব যাতে তা চর্বিত চর্বণ না হয়ে যায়। প্রথম সান্দাকফু ভ্রমণ শেষ করেই অমি আর আমার ট্রেকিং পার্টনার রুবেল ভাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কোরবানির ঈদের পরে আমরা আবার যাব সান্দাকফু, কারন কুয়াশা আর খারাপ আবহাওয়ার জন্য অনেক কিছুই দেখতে পারিনি আর অক্টোবারের শেষে সম্ভবত আবহাওয়া পরিস্কার থাকবে। যথারিতি রুবেল ভাই আমাদের ফেইসবুকের সান্দাকফু পেইজ থেকে একটি ইভেন্ট করলেন। প্রথমে ইভেন্টটি আমাদের চেনা জানা শোনার ভিতরে ছিল অর্থাৎ আমরা শুধু যাদের সাথে ট্রেকিং করতে আগ্রহী ছিলাম তাদেরই শুধু ইনভাইটেশান পাঠিয়েছিলাম।

দ্বিতীয়বার যাবার জন্য আসলে যেই উদ্যম কাজ করছিল তা হচ্ছে পরিষ্কার আবহাওয়ায় কাঞ্চনঝঙ্গা দেখতে পাওয়া। প্রথম ট্যুরে সবার কাছেই শুনেছি যে এই এপ্রিল মে সিজনে যদি খুব ভাগ্যবান কেউ না হয় তাহলে পরিষ্কার আবহাওয়া পায় না অর সত্যি কথা বলতে নেট ফেইসবুক এবং বড় অভিজ্ঞদের কাছে থেকেও এমন সিগনাল পাইনি যে, অর্থাৎ এটা আমাদের কাছে অজানা ছিল যে কোন সিজনটায় পরিষ্কার আবহাওয়া পাওয়া যায়। সব চাইতে বড় আক্ষেপ ছিল ফালুট থেকেও কাঞ্চনঝঙ্গা দেখতে না পাওয়া এবং এই ঠাণ্ডায় ঠায় দাড়িয়ে থেকে গাইড আর লোকাল লোকদের সেই একই বানী শোনা যে অক্টোবরে ভাল আবহাওয়া থাকে এবং সব কিছুই পরিষ্কার দেখা যায়।

ধীরে ধীরে সময় বয়ে যায় এবং দুমাস আগে আমি ইভেন্টে পোস্টিং দিতে থাকলাম যে যারা যারা যাবেন তারা যেন এক্ষুনি ভিসার জন্য এপ্লাই করে ফেলেন। যাই হোক শেষে যাবার জন্য রেডি হোল মোট চার জন – আমি, বাবলা, ইরাজ এবং শুভ, রুবেল ভাই এর ভিসা হয়নি এবার কারন উনি ১০ দিনের ব্যাবধানেই অফিসের কাজে ইন্ডিয়া ঘুরে এসেছিলেন এবং খুব ইমারজেন্সি না হলে নাকি এত দ্রুত পুনঃ ভিসা দেয় না। দুর্ভাগ্য – যিনি ইভেন্ট করেলেন প্ল্যান করলেন তিনিই যেতে পারলেন নাহ – এবং পরবর্তীতে ট্যুরে গিয়ে আমার নিজেরই অনেক আফসোস হোল যে আজ রুবেল ভাই থাকলে দেখতে পেতেন চিত্রে যাবার পথ থেকেই কাঞ্চনঝঙ্গা দেখা যায়!

শিলিগুড়ি হয়ে মিরিক

ঈদের পরের দিন অর্থাৎ ২৮শে অক্টবার রাতে আমাদের গাড়ি। এবার আর সরাসরি শ্যামলির টিকিট কাটিনি কারন সিট পাইনি আর আমি নিজেও ভেঙ্গে ভেঙ্গে যেতে চেয়েছিলাম দেখি ব্যাপারটা আসলে কেমন এবং এই ঝামেলাটা আমি পড়তে খুব বিরক্তিকর হলেও খুব বেশি বর্ণনা দিয়ে লিখছি যাতে আপনাদের এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়।

রাত আটটা তিরিশ মিনিটের হানিফ পরিবহন বুড়িমাড়ী বর্ডার গিয়ে পৌঁছুল ভোর সাড়ে চারটায়, পৌছা মাত্র আমি কাউন্টারে গিয়ে দেখি সবাই পাসপোর্ট জমা দিচ্ছে এবং পাসপোর্ট প্রতি ২০০টাকা আর ৩০০টাকা ট্রাভেল ট্যাক্স ত আছেই । আমি ভাবলাম এত ভোরে যখন পৌঁছে গিয়েছি তখন বোধয় তারাতারিই বর্ডার পার হয়ে যাব। কিচ্ছুক্ষন পরেই বুঝতে পারলাম যে কি ভুল করেছি – আমাদের আগে আরও ৪টা পরিবহনের গাড়ি আছে যার প্রত্যেকটিতে নুন্যতম ৪৫ জন করে যাত্রী। কথাটা শুনে আমি মুষড়ে পড়লাম, শেষে শুভ ভাই এর এক পরিচিত লোকের মারফতে কোন রকম ঝামেলা চেকিং ছাড়াই বর্ডার পার হয়ে গেলাম এবং শ্যামলির আগেই।

কাহিনী হচ্ছে হানিফের লোকজন যখন সকাল ৯টা বাজার পরেও কোন রেসপন্স করছে না তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা আলাদা চেষ্টা করব, শুভ ভাই তার পরিচিত এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে একজন লোকাল C&F এজেন্টের নাম্বার পেল, সে দেখি আমাদের চেকপোস্টের কাছে নিয়ে গিয়ে কিভাবে ১৫ মিনিটের ভিতরেই পার করে দিল।

এর পর আমি যদি বর্ডার ক্রস করি তাহলে কোন পরিবহন কে টাকা দিব না – সোজা লোকাল দালাল ধরব, ৯টা বাজলে সরাসরি দালাল মারফত ডিরেক্ট পগার পাড়।

***আপডেট (২০১৪) – বর্ডার অফিস ৮টায় খোলে এখন কিন্ত তার অর্থ এই না যে আপনি আগে আগে যেতে পারবেন – দু পারেই এখন ওয়েব ক্যাম লাগিয়ে ছবি তোলে আর আরও বেশি চেক ইন হয় – তাই ৮টায় চেক ইন করলেও সেই ৯টা / সাড়ে ৯টা বাজেই। ঢাকা থেকে শিলিগুরি যেতে কত টাকা লাগেে এবং শিলিগুরি যেতে কত টাকা লাগবে ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর এখানেই পাবেন। এটি আসলে নির্ভর করে আপনি কিভাবে যাবেন তার উপরে

১। সরাসরি শ্যামলী পরিবহন এর বাস দিয়ে – সে ক্ষেত্রে বাস ভাড়া ১৭০০/- আর ট্রাভেল ট্যাক্স ৫২০/- এবং প্রসেস সার্ভিস স্পিড মানি ২০০/- ধরে সর্বমোট ২৫০০/-টাকা লাগবে। মনে রাখবেন এটি কিন্ত ওয়ান ওয়ে যাবার খরচ। আসার সময় ট্রাভেল ট্যাক্স বাদ দিয়ে আবার ২০০০/- টাকা এর মতো লাগবে

২। আর ভেঙ্গে ভেঙ্গে গেলে বাস ভাড়া বুড়িমাড়ি পর্যন্ত ৫৫০/- টাকা, সীমান্ত পার ৭০০/- টাকা বা কিছু বেশি ( ৫২০ + সার্ভিস চার্জ + দালাল ফি ) আর চ্যাংড়াবান্ধা থেকে রিজার্ভ এম্বাসিডর দিয়ে গেলে ১২০০/- রুপি আর স্টেইশান ওয়াগন নিয়ে গেলে ( টাটা সুমো ) ১৮০০/- রুপি

এবার যেহেতু শ্যামলিতে যাইনি তাই বর্ডারের ওপারে গাড়ি ভাড়া করতেই হল। আমার মনের একটি সুপ্ত বাসনা ছিল যে সেই প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক এম্বাসিডর গাড়িতে উঠা আর ডলার রুপি তে কনভার্ট করার পর আসে পাশে ঘুরে একটি আমরা ভাড়াও করে ফেললাম ১৩০০/- রুপিতে শিলিগুরি পর্যন্ত।

*** আপডেট (২০১৪) – চেংড়াবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি এম্বাসিডর ভাড়া ১২০০/- রুপি আর যে কোন স্টেইশান ওয়াগন তথা টাটা সুমো টাইপের ভাড়া ১৮০০/- এটা অনেকটা ফিক্সড

এম্বাসিডর স্টার্ট হয়া মাত্র মনে হল বনেটের ভিতরে কোন স্যালো – ইয়ানমার পানির পাম্পের ইঞ্জিন চালু হল, এমন বিকট আওয়াজ যে আমি নিজেকে মনে মনে গালি আর অভিশাপ দিতে থাকলাম কিন্তু চেহারায় অনুভূতিটুকু লুকিয়ে রাখলাম যাতে বাকি তিনজন আবার বিচলিত না হয়। কিছুক্ষন চলার পরে দেখলাম আমাদের ড্রাইভার একটি শর্টকাট দিয়ে তিতাস ব্রিজের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং ততক্ষণে সেই স্যালো ইঞ্জিনের আওয়াজ অনেকটাই সহ্য হয়ে গিয়েছে অথবা ভুলে থাকার জন্য যে প্রক্রিয়া নিয়েছিলাম তা কাজ করছিল ( যেমন সবার সাথে বিতর্কিত বা সমর্থিত বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম যাতে কানের পাশে এই বিকট গগনবিদারী আওয়াজ টা ভুলে থাকতে পারি)।

পথের মাঝখানে আমরা গেন্ডারি/আখ কিনে কামড়ে কামড়ে-ছিড়ে খেতে খেতে চললাম সবুজ ফসলের ভিতরে বিরান এক রাস্তা দিয়ে। বলা বাহুল্য এটা পুজোর সিজন ছিল তাই আমাদের দেশে যেমন মাদ্রাসা মাসজিদের জন্য রাস্তা আটকায় তেমনি গ্রামের ভিতরে রাস্তার পাশে দেখলাম পুজোর জন্য, আমাদের ড্রাইভার অবশ্য সব জায়গাতেই নিজের পকেট থেকে কিছু দিয়ে গেল।
তিতাস ব্রিজ পার হবার পরে বুঝলাম এম্বাসিডর কেন এম্বাসিডর – এর সাস্পেনশান এতই আরামদায়ক যে আমার মনে হচ্ছিল ভাঙ্গা আসে না ক্যান একটু দুলে নেই- দুলুনিটা সত্যি মজার ছিল।

***আপডেট (২০১৪) – এখন রাস্তায় একটাও খানা-খন্দ নেই – একদম প্লেইন-ফ্ল্যাট রাস্তা এবং চাইলে এই রাস্তায় কেউ ইচ্ছে মতো গাড়ি টানতে পারবে। তবে ক্ষণে ক্ষণে স্পিড ব্রেকার আর চেক পোস্ট এর কারণে ৬০/৮০ কিলোর উপরে তোলা যায় না মনে হয়।

আড়াই ঘন্টায় শিলিগুড়ি পৌঁছে সোজা দিলিপ দা কে খুজলাম মানেভাঞ্জান যাবার গাড়ি রিজারভেশানের জন্য। উনি আমাকে দেখেই চিনে ফেললেন – মনে হয় উনার গাড়ী দিয়ে আমরাই একমাত্র মানেভাঞ্জান গিয়েছিলাম। এবার আমাদেরকে উনি একটি টাটা সুমো দিলেন ২৫০০ রুপিতে। গাড়ীতে ব্যাগ ভরেই সোজা চলে গেলাম উল্টা দিকের ঢাকা হোটেলে। গিয়ে দেখলাম এখনো সব তরকারি রাধা হয়নি … তাই কিছুক্ষণ বসে তারপরে খেয়ে দেয়ে শুরু করলাম মানেভাঞ্জানের উদ্দেশ্যে যাত্রা।

আমি জানি না আর কারো ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য কিনা তবে সেই চেনা রাস্তা আর চেনা স্মৃতি দিয়ে যেতে যেতে আমার যে কি পরিমান আনন্দ হচ্ছিল তা বলে বোঝাবার নয়। সেই ক্যান্টমেন্টের ভিতর দিয়ে রাস্তা সেই পরিচিত পাথুরে নদী। যাবার সময় একটি বিড়াল কে রাস্তা পার হতে দেখে দেখি আমাদের ড্রাইভার গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে বসে রইল – আমি ঘটনাটা কি জিজ্ঞেস করার আগেই উনি আবার গাড়ি চালু করলেন – বলা বাহুল্য এইবার আমাদের ড্রাইভার নিখাদ বাঙালি আর আগের ড্রাইভারটা ছিল নেপালি যিনি বাংলা বলা আর বোঝা তে একটু আটকে যেতেন। যাই হোক বিড়ালকে গার্ড অফ অরনার দিয়ে আমারা পর্বতের ঢাল বেয়ে উঠা শুরু করলাম।

চা বাগানের ভিতর দিয়ে যখন গাড়ি চলছে সাথে নস্টালজিক গান – আহ এই অনুভুতি বলে বোঝাবার নয়। সবাই গানের কোরাস গাইতে গাইতে ঘন পাইন বন আর চা বাগানের ভিতর দিয়ে মিরিক পৌঁছে গেলাম। এখানে একটি কথা না বল্লেই নয় যে দুপুরের পরে মিরিকের রাস্তায় উপত্যকা গুলোতে রোদের আলো টেকরা ভাবে এমন ভাবে পড়ে তাতে আকাশ পর্বত আর উপত্যকে মিলে যেই সৌন্দর্য সৃষ্টি করবে তাতে আপনি বাধ্য হবেন গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ ঠায় দাড়িয়ে থেকে সেই দৃশ্য উপভোগ করতে কিন্ত যেই ঢাল এর রাস্তা দিয়ে গাড়ি উঠে যাচ্ছে সেখানে গাড়ি দাড় করিয়ে কিছু করা নিজের এবং অন্যের জন্য বিপজ্জনক। তাই জানালায় হাত বাড়িয়ে ক্যামেরা দিয়ে যতটুকু নেয়া যায় নিয়ে নিবেন। মাঝে মাঝে সবুজ চা বাগানের উপরে সোনালি সূর্যের আলোর খেলায় আপনি পৃথিবীর সব কিছু ভুলে যেতে পারেন। এই সব দৃশ্যের জন্যই হয়ত পথে পথে দেখি এখন ট্যুরিস্ট লজ করা আছে। পর্বতের হাইকিং এর চাইতেও চা বাগানের উপত্যকায় অনন্ত অসীম দিগন্তের দিকে হারিয়ে যাওয়া সবুজ সোনালি আর নিলের মিশ্রণে এমন একটি কটেজের বারান্দায় বসে বাকি জীবনটুকু পার করে দেয়ার মতো সুন্দর। তবে কিছু কিছু কটেজ এবং চা বাগানের লজ এবং অফিস টাইপের ছোট এলাকা আছে যেখানে আপনি গাড়ি থামিয়ে বিকেলে এই নৈসর্গিক দৃশ্যগুলো ক্যামেরা বন্দি করতে পারেন আর খুব বেশি প্রকৃতি প্রেমী হলে ঠায় দাড়িয়ে বিকেলের এই তেছড়া আলোয় উদ্ভাসিত উপত্যকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। পারলে থেকেও যেতে পারেন যদি হাতে সময় থাকে।

গতবার পণ করেছিলাম মিরিকে একটু বেশি সময় দিব, কিন্ত মিরিক এসে পুরাই হতবাক – মিরিক লেকের মাঠটায় বোধয় কোন অনুষ্ঠান হয়েছিল – চেয়ার প্যান্ডেল আর ধুলা বালুতে পুরা এলাকা একাকার আর কোথা থেকে যেন খালি ট্যুরিস্ট আর ট্যুরিস্ট এসে পুরো এলাকা গিজ গিজ করছে। যথারিতি লোকাল চা খেয়ে আর মুড়ি ভর্তা নিয়ে আবার গাড়ীতে উঠলাম।

Mirik Lake

মিরিক লেইক

*** আপডেট (২০১৪) – মিরিকের সেই মাঠ টি এখন একটি বাগানে পরিণত হয়েছে – পুরোটাই ঘাসে ঘেরা আর একটু পর পর ফুল আর বাবলা / ক্যাকটাস / অর্কিড এর সমারোহ। মাঠের ঘোড়া গুলো অবস্থান নিয়েছে লেকের অন্যপাশে -ও সেখানে চিকন ট্রেইল বেয়ে যত টুকু চড়া যায় আর কি। আর লেকের মাঝখানে দেখেছি একটি ড্রেজার বসেছে -ও লেকের গভীরতা হয়ত কমে আসছিল।
এখানে অবশ্যই একটি কথা না বলে পারছি না যে মিরিক হচ্ছে একটি ট্যরিস্ট স্পট, তাই কোলাহল এবং মানুষের আধিক্যে এখানে বাজার হোটেল ইত্যাদির ভিড়ে এই এলাকার প্রকৃতির প্রকৃত সৌন্দর্য অনুভব করা মুশকিল। ক্ষেত্র বিশেষে এটি একটি ব্রান্ড স্পট হিসেবেও বলা যায়। অমি বলতে চাচ্ছি যে একটু আগে উল্লেখ করেছি পাইন বনের ভিতরে অথবা চা বাগানের ঢালে সূর্যের সোনালি আলোতে যে কেউ নস্টালজিক হতে বাধ্য এবং প্রকৃত প্রস্তাবে কেউ যদি এই এলাকার সৌন্দর্য আরোহণ করতে চান তাহলে মিরিকের পরে উপরে কিছু সুন্দর জায়গায় লজ/টি হাউজ আছে ওখানে থেকে যেতে পারেন বা মিরিকের সময়টা ওখানে কাটান। পর্বতের সৌন্দর্য পর্বতেই পাবেন, একাকী বা কোলাহল মুক্ত নাগরিক সুবিধা থেকে কিছু দুরে গিয়ে পাবেন যেখানে আছে পাইন গাছের উঁচু সারি আর ঢাল বেয়ে নীলাভ সবুজের ভা বাগান এবং উপত্যকার ফাঁক দিয়ে বিকেলের সোনালি আলোর রাশি।

ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যার আবছা অবছায়া আর চাদের সোডিয়াম আলোতে আমরা অনন্ত পথ ধরে চলছি আর সাথে কিছু নস্টালজিক গান। কিছুক্ষণ আগে যেমন সূর্যের আলোতে উপত্যকার সৌন্দর্য দেখছিলাম এখন তেমনি দেখছি চাঁদের আলোতে। একটু পরে মাথা ঘুড়িয়ে দেখি সবাই ঘুমে কাতর। গান শুনতে শুনতে আমিও কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই কিন্ত শুকিয়াপোখরি তে এসে ড্রাইভার যখন আশে পাশের মানুষকে জিজ্ঞেস করা শুরু করল মানেভাঞ্জানের রাস্তা কোনদিকে তখন বুঝলাম এই বান্দা কখনও মানেভাঞ্জান আসেনি, ঘুম উবে গেল। কাউকে কিছু বুঝতে দিলাম না, গাড়ি গাড়ির মত চলছে ত চলছেই, মাঝে মাঝে দেখি ড্রাইভার লাইট দিয়ে তেলের লেভেল দেখছে। একসময় সে পুরোপুরি সন্দিহান হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল এটাই মানেভাঞ্জানের রাস্তা কি না, আমি বললাম শুকিয়া থেকে বামে-পিছনে এই একটাই রাস্তা আর সেটা সোজা মানেভাঞ্জানের দিকেই গিয়েছে – কিন্ত রাস্তার অবস্থা এত খারাপ কিছুকিছু জায়গায় আমি নিজেই সন্দিহান হয়ে উঠলাম আসলেই কি আমরা ঠিক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি কিনা। অন্ধকারে যা হয় – হাল্কা অতঙ্ক এসে ভর করে এবং তখন নিজের ডাইনিংরুমও ক্যাসেল ট্রান্সিলভিনিয়া হয়ে যায়।

মানেভাঞ্জান

সন্দেহ – অতঙ্ক আর তেলের লেভেল দেখতে দেখতে কিছুটা চুরান্ত পর্যায়ে এসে আমারা শেষে মানেভাঞ্জান পৌছুলাম। আহ আবার সেই হোটেল এক্সটিকা – দৌড়ে উপরে উঠলাম জীবন দা’র সাথে দেখা করার জন্য।

গুগল ম্যাপে মানেভাঞ্জান এর অবস্থান

জীবন চিত্রে আমাকে দেখেই চিনে ফেললেন এবং সাথে এও জানিয়ে দিলেন যে আমাদের দিদি গিয়েছেন শিলিগুড়ি বেড়াতে। এর একটাই অর্থ যে রাতে ডিনার বাইরে করতে হবে। এখানকার লোকাল রেস্টুরেন্ট গুলো প্রায় সন্ধ্যার সাথে সাথেই বন্ধ হয়ে যায় সেখানে পৌনে আটটা’ত গভীর রাত, কথাটা গোপন করে সবাইকে নিয়ে বাইরে এলাম, এসে নিচের দোকান থেকে ইচ্ছামত চকলেট আর বাদাম কিনে নিলাম ট্রেকিং এ সময় খাবারের উদ্দেশ্যে। রুমে এসে বললাম এগুলো দিয়েই আমাদের ডিনার করতে হবে।

হঠাৎ দেখি হুড়মুড় করে আর একটা গ্রুপ এসে ঢুকল হোটেলে।

ঘটনার শুরু আরও অনেক আগে থেকে… আমাদের ইভেন্ট থেকে নয়ন ভাই এর সাথে পরিচয় এবং উনি বললেন উনারা যাবেন ১৮ তারিখে এবং আমাদের ও যেতে বললেন তাদের সাথে। আমি বাংলাদেশ থেকেই জীবন দা’র সাথে যোগাযোগ করেছিলাম এবং তিনি বলেছিলেন যে আমরা যদি ৩১তারিখে সান্দাকফু উঠি তাহলে সমস্যা হবে না – জিজ্ঞেস করেছিলাম সমস্যাটা কি – উনি বললেন প্রতি বছর এই সময় একটি ট্রাভেল গ্রুপ একটি আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করে দৌড়ে সান্দাকফু উঠা আর নামার এবং এর জন্য ওরা পথের সব লজ অগ্রিম বুকিং করে ফেলে, ফলে সাধারন ট্যুরিস্টদের থাকার চরম সমস্যা হয়। নয়ন ভাই কে ব্যাপারটা জীবনদা বলেছিলেন কিন্ত নয়নভাইয়ের কিছু করার ছিল না, ছুটি নিয়ে নেয়া হয়ে গিয়েছিল তাই ‘যা আছে কপালে’ টাইপের অবস্থা মাথায় নিয়েই গিয়েছিলেন। উনাদের কাছে শুনলাম ট্রেকিং করে উনারা সান্দাকফু উঠে এই প্রচন্ড শীতে কোন কটেজে থাকার যায়গা পাননি – কোনমতে অভিশাপ দিতে দিতে নাকি রাত পার করেছিলেন এবং পরেরদিন গাড়ী দিয়ে সোজা মানেভাঞ্জান এবং এসেই আমাদের সাথে দেখা।

Manebhanjan Football Stadium

মানেভাঞ্জান ফুটবল স্টেইডিয়াম

এদিকে একটি ক্ষীণ আশায় আবার জীবন দার কাছে গিয়ে দেখি উনি আমাদের চার জনের জন্য আলু ভর্তা ভাত আর ডিম ভাজি করছেন – আমাকে দেখেই বললেন বাকি সেই নয়নদের টিমের সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে খেতে আমাদের আপত্তি আছে কিনা। আহ! সাথে সাথে সব্বাইকে ডেকে জীবন দার ডাইনিং এ জম্পেশ পুরো ডাইনিং গম গম আর হাউকাউ করে ভাত-ডাল-আলুভরতা-ঘি দিয়ে ডিনার শেষ করলাম। আমি যদিও কিছুটা ডায়েটিং এ ছিলাম তাও গরম গরম ঘি হাতের সামনে পেলে ছাড়ি কি করে, ঘি আর আলু ভর্তা মেখে মনে নেই কয় প্লেট খেয়েছিলাম, অবশ্য আমাদের সবারই খুব খিদে পেয়েছিল। জীবন’দার প্রতি আমরা সবাই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে ঘুমুতে গেলাম।

চিত্রে

যাত্রা শুরুঃ-
খুব ভোরে উঠে আমরা রেডি হয়ে আমাদের হোটেলের ঠিক উল্টা দিকে একটি রেস্টুরেন্ট থেকে রুটি – আলুর দম আর ডিম ভাজি দিয়ে নাস্তা করে নিলাম। দ্বিতীয়বার ট্রেকিং এর অভিজ্ঞতা থেকে বলছি পাঠককে যে অবশ্যই মানেভাঞ্জান থেকে ভরপেট নাস্তা করে যাবেন কারন এর পরে আর কোথাও রেডিমেইড নাস্তা পাবেন নাহ। নয়ন ভাই দের গ্রুপ কে বিদায় জানাতে গিয়ে আড্ডাবাজি করে সকাল টা ভালই শুরু হল।
খেয়ে দেয়ে চিত্রের দিকে হাটা শুরু করলাম, চিত্রের দিকে যে রাস্তাটা উঠেগিয়েছে সেখানে একটি তিন রাস্তার মোড় রয়েছে – একটি মানেভাঞ্জানের দিকে – একটি চিত্রের দিকে আর একটি রামাম থেকে গুরদুম হয়ে মানেভাঞ্জানের সাথে এসে মিশেছে। এই মোড়েই রয়েছে সিঙ্গারিলা পার্কের চেকপোস্ট এবং এখান থেকেই টিকেট কিনে নিতে হয়।

গতবার আমরা যে গাইড কে নিয়ে গিয়েছিলাম সেই ‘নিমাহ’ এইবার অন্য গ্রুপের সাথে ট্যুর দিচ্ছে তাই গাইড এসোসিয়েশান আমাদের একটি ভাঙ্গাকুলা টাইপের গাইড দিল, বয়স খুব বেশি হলে ১৪ অথবা ১৬, সাথে কোন মোবাইল নেই ঘড়িও নেই। আমি অবশ্য এটায় বিচলিত হইনি কারন রাস্তা যেহেতু চিনিই তাই নিয়ম রক্ষার জন্য এই গাইড নেয়া। বাকি সব গাইড নাকি সেই ম্যারাথন প্রতিযোগিতার রিজারভেশানে আছে তাদের সাথে। গাইড এসসিয়েশানের লোকটা আমাকে প্রথম দেখেই চিনে ফেলল, যার ফলে গাইড প্রতি ৫০০ রুপি প্রতিদিনের টাকাটা জোর করে ৪০০ তে নামিয়ে আনলাম, অবশ্য আর একটু জোরাজোরি করলে ৩৫০ এই নেয়া যেত কিন্ত নিজেকে আর তৈলাক্ত করতে মন চাচ্ছিলনা তদুপরি সকালের রোদ ও উঠেগিয়েছে যেতে হবে তারাতারি।

সিঙ্গারিলা পার্কের টিকিট কাটতে গাইড বুদ্ধা রায় কে পাঠালাম, কিন্ত সে যাবার পরে ভিতর থেকে দেখি আমাদের ডাকছে, একটি লগে নাম দেশ লিখতে গিয়ে দেশটা যখন বাংলাদেশ লিখলাম তখন কাউন্টারের লোকটা আর একটি লগ বের করে দিল, বলল এটা আন্তর্জাতিক ট্যুরিস্টদের জন্য। দেশি ট্যুরিস্টদের জন্য প্রতি জন ১০০ রুপি আর ক্যামেরা ৫০ রুপি আর বিদেশিদের জন্য দিগুন – আমি চাইছিলাম ৪x১০০ + ৩x৫০ টাকা বাঁচাতে কিন্ত লগ বুকে নিজের দেশের নাম কোনভাবেই ইন্ডিয়া লিখতে পারলাম নাহ – দুই সেকেন্ড ইতস্থত করে জোর করে লিখতে চাইলাম কিন্ত আমার তিন-আঙ্গুলের মাথা সেই বাংলাদেশ ই লিখল। টিকেট নিয়ে যখন বের হয়ে আসি তখন নিজের ভিতরে একটি অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছিল, না আমি টাকা দিয়ে দেশ প্রেম দেখাইনি – আমার নিজের ভিতরে যে একটি স্বত্বা রয়েছে যা সব সময়ই সঠিক কাজটি করতে আমাকে বাধ্য করে এমনকি আমার মস্তিষ্কের নির্দেশ অমান্য করে হলেও, এই বিষয়টা আমার ভিতরে একটি চরম আনন্দের একটি অনুভুতি এনে দিল

 

চিত্রেঃ-

গুগল ম্যাপে চিত্রের অবস্থান

সান্দাকফু ট্যুরের সবচেয়ে নয়নাভিরাম রাস্তা হচ্ছে মানেভাঞ্জান থেকে চিত্রে যাবার রাস্তা, আমার মাঝে মাঝে মনেহয় যে আমি যেন হলিউডের কোন মুভির সেটের ভিতর দিয়ে হাঁটছি। জায়গাটা এত বেশি সুন্দর যে ভাষা অথবা ছবি কিছু দিয়েই এর বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবে না। ঘন পাইন বনের ভিতর দিয়ে এঁকে বেঁকে উঠেগিয়েছে পিচে ঢালা পথ। উপরে উঠতে উঠেতে হঠাৎ ইরাজ ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন উত্তরে পিছনে যেই বরফওয়ালা পর্বতটা দেখা যাচ্ছে সেটিই কাঞ্চনঝঙ্গা কিনা! আমি দেখে পুরাই টাশকি! কারন মার্চের ট্যুরে একমাত্র সান্দাকফু থেকেই কাঞ্চন দেখেছিলাম তাই বিস্ময় আর হতবিহব্বল হয়ে শ্রেফ বোবা হয়ে গেলাম। শেষে যুক্তি বুদ্ধি আর দৃষ্টির বাস্তবতা কে মেনে নিয়েই বললাম হ্যা এটাই সেই কাঞ্চনঝঙ্গা, সত্যি আমি রাস্তার সেই কোনায় স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে দেখছি কাঞ্চনঝঙ্গা কে।

আমার ট্যুর পার্টনাররা দেখি আমাকে রেখে অনেক উপরে উঠেগিয়েছে আর চিত্রে পর্যন্ত যাওয়া ত দূরে থাক, চিত্রে উঠার রাস্তা থেকেই কাঞ্চন দেখা যাচ্ছে এটা তাদের মোটেই বিচলিত করছে না কারন এরা ত প্রথম এলো তাই হয়ত মনে করছে এইটাই স্বাভাবিক! আর আমি চিন্তা করছি মার্চে আমি আর রুবেল ভাই কিছু কিছু রাস্তায় কাঞ্চন দেখব ত দুরের কথা ১০ফিট দুরের কিছুই দেখতে পারছিলাম না কুয়াশার জন্য।

Way to Chitrey

চিত্রে যাবার পথে

অবশেষে চিত্রে এসে পৌছুলাম – পিচ্চি গাইডটা দেখি সোজা ওদের কটেজের দিকে নিয়ে যাচ্ছে … আমি ডেকে থামালাম বললাম এই বৌদ্ধ মনেস্ট্রিটাতে দেখার অনেক কিছু আছে, আসলে আমি মনেস্ট্রির বাগানের ফ্রেঞ্চ মেরিগোল্ড আর কসমস ফুলের ছবি তোলার উদ্দেশ্যে যাচ্ছি। পুরা মনেস্ট্রি চক্কর দিয়ে সেই দোলমা দিদির লজে গিয়ে উঠলাম। মজার বিষয় হচ্ছে এই লজেই আমাদের যাদের সাথে দেখা হয় তাদের সাথেই ট্যুর শেষ হয় … গতবার তাই হয়েছিল, যে জানত এবার ও তাই হবে।

Mt. Pandim view from the way to Chitrey from Manebhanjan

মানেভাঞ্জান থেকে চিত্রে উঠার পথেই যেখা যাচ্ছে মাউন্ট পান্দিম

লজের ভিতরে কফি নিয়ে একটা পোজ দিয়ে বারান্দার কাচের জানালার আধা আলো আধা ছায়ার ইফেক্টে ছবি তোলা শুরু করলাম। গতবার রুবেল ভাই আমারটা তুলে দিয়েছিল এবার মনে নেই কাকে বলেছিলাম হয়ত শুভ ভাইই তুলে দিয়েছিলেন অথবা ইরাজ ভাই। কফি শেষ করে দোলমা দিদি কে ডেকে একটা গ্রুপ ছবি তুললাম। লজের বারান্দায় গিয়ে দেখলাম এক ফ্রেঞ্চ ট্রেকার পৌঁছুল, মহিলা বার বার জিজ্ঞেস করছে চা পাওয়া যাবে কিনা, আমি একটু আগ বাড়িয়ে বললাম এখানে ইয়াক এর মিল্কের সাথে পাঙ্খা কফি বানায় – প্রত্যুতরে সে বলল কফি কোনটা কারন নেসকফি হলে উনি খাবেন নাহ। এই একটা জিনিস কমন দেখলাম – ইউরোপিয়ানরা কেন জানি নেসকফি দেখতেই পারে নাহ। যাই হোক চিত্রে ছেড়ে আমরা লামেধুরার দিকে যাত্রা শুরু করলাম।

Mt. Kanchenjunga view from Chitrey

চিত্রে তে দোলমা দিদির লজ হক’স নেস্ট থেকে একটু উপরে উঠলেই দেখা যাবে কাঞ্চনঝঙ্গা

লামেধুরা

প্রথমবার যখন এই রাস্তায় যাই অর্থাৎ চিত্রে থেকে লামেধুরা তখন আমার যে সমস্যা হয়েছিল তা লিখেছি প্রথম অভিজ্ঞতার পোস্টে, কিন্ত এইবারও যে নিস্তার নেই তা যদি জানতাম! এখানে আমি ছাড়া আর বাকি তিনজনের ব্যাপারে একটু না বললেই নয়। এদের তিনজনের ভিতরে একজনের তিনবার কেউক্রাডং উঠার অভিজ্ঞতা আছে আর একজনের বগালেক পর্যন্ত আর বাকি একজনের জিবনের প্রথম ট্রেকিং তাও আবার সান্দাকফু! আমার প্রতিটি ট্যুরেই এমন হয়, যাকে মনেকরি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং একটু নির্ভর করা যায় সে ই সবার আগে পল্টি খায় এবং এবার ও ব্যাতিক্রম হয়নি।

গুগল ম্যাপে চিত্রের অবস্থান

চিত্রে থেকে একটু উপরে উঠে আমি থেমে কাঞ্চনঝঙ্গার ছবি তুলতে তুলতে টাইয়ারড তখন খেয়াল করলাম আমার পিছে কেউ নেই, আর আমার সাধারন অনুমানে এদের এতক্ষনে চলে আসার কথা যত আস্তেই আসুক। পরিস্থিতি বুঝে ব্যাক-ট্রেইল করার জন্য পা বাড়াতেই দেখি মিঃ কেউক্রাডং “ইহাই জীবনের শেষ ট্রেকিং” বডি ল্যাঙ্গুয়েজে ধিরে ধিরে উঠে আসছে। কাছে আসার পরে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কি, বলে পাহাড়ে উঠলে নাকি তার মাথা ঘুরে। ভাল কথা, এধরনের পরিস্থিতির কথা প্ল্যানেই রেখেছিলাম, তাই বুদ্ধা রায় কে বললাম ওর ব্যাগটা নিতে আর ট্রাইপডটা দিয়ে দিতে। ওমা পীঠ থেকে ব্যাগ সরে যেতেই সে দেখি ফটাফট ছবি তোলা শুরু করল। মনে মনে ভাবলাম যাক সিভিয়ার কিছু না।

আমি আমার প্রথম অভিজ্ঞতার পোস্টে লিখেছিলাম যে আমার ট্রেকিং এর হাতে খড়ি আনোয়ার ভাই এর হাতে এবং তিনি যেভাবে হাত ধরে পাশে পাশে হেটে উচু পাহাড়ে উঠা শিখিয়েছেন তা আমার রক্তে মিছে গিয়েছে অর্থাৎ এখন আর মনে করে হাটার স্ট্রেটেজি চেঞ্জ করতে হয় না, আমার দেহে এটি অটম্যাটিক চলে এসেছে যে উপরে উঠার সময় একভাবে, নামার সময় এক আর সমতলে একরকম হাটা এবং আনোয়ার ভাই এর একটা কথা বড় কানে বাজে – উনি বলেছিলেন একজন ট্রেকারের পক্ষে সবচাইতে কষ্টকর আর কঠিন কাজ হচ্ছে টিমের কারো জন্য বাধ্য হয়ে তার স্বাভাবিক হাটার গতি কমিয়ে থেমে থেমে হাটা। হ্যা আমিই আনোয়ার ভাই কে সেই পেইন দিয়েছি আর তার প্রতিদান ‘কারমা’ এসে পরেছে আমার ঘাড়ে।

Way to Meghma from Lameydhura

লামেধুরা

পিঠ থেকে ব্যাগ নামিয়ে দেয়ার পরেও দেখি মিঃ কেউক্রাডং লামেধুরার রাস্তায় খাবি খাচ্ছে উঠতে গিয়ে, আমার পূর্বের পোস্টে পরে থাকবেন যে প্রথমবার এখানে আমার ও একই অবস্থা হয়েছিল এবং আনোয়ার ভাই এর ট্রেইনিং এ সফলভাবেই কোনরকম সাহায্য ছাড়াই রিকভার করতে পেরেছিলাম। তাই তাকে ট্রেইনিং দেয়া শুরু করলাম – পাশা পাশি হেটে উঠার সময় কিভাবে উঠতে হবে কিভাবে কতটুকু দূরত্বে পা ফেলতে হবে কিভাবে দম নিতে হবে এর সাথে তার ফোকাস আর চিন্তা অন্য দিকে ডাইভারট করে মোটিভেশান ইত্যাদি সব করে যাচ্ছি।

মেঘমা থেকে তুমলিং হয়ে গাইরিবাস

কোনপ্রকার ঝামেলা ছাড়াই আমারা লামেধুরা থেকে মেঘমা পৌছুলাম, অবশ্যই মিঃকেউক্রাডং এর সাথে লেফট-রাইট করতে করতে। মনেপড়ে গত মার্চে এখানে কুয়াশার জন্য ১০ ফিট দুরের কিছু দেখা যাচ্ছিল না, কিন্ত এখন তংলু’র মাথা’র উপরে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। যদিও লাঞ্চ করিনি এখনও তবুও ক্ষুধা ছিল খুব কম, মনের ক্ষুধার জন্য এখানে ন্যুডুলস আর স্যুপ খেলাম। সময় নষ্ট না করে তারাতারি রওনা দিয়ে দিলাম কারন দিন ছোট। মনে চাচ্ছিল তংলুর রাস্তা দিয়ে উপরে উঠে যাই, কিন্ত টিমের দুজনের পা’এর অবস্থা চিন্তা করে ইচ্ছেটার গলা টিপে দিলাম। হাতের বাম দিক দিয়ে তুমলিং এর দিকে রওনা দিলেও আমার মন হাতের ডান দিক দিয়ে তংলুর দিকে উঠে যাচ্ছিল, তংলুর রাস্তাটা খুব সুন্দর একে বেকে উপরের দিকে উঠে যাওয়া।

way to Meghma from Lamyedhura

লামেধুরা থেকে মেঘমা যাবার পথে

মেঘমা থেকে নিরবিঘ্নে তুমলিং পর্যন্ত এলাম, এখানে শিখর লজের বাইরে পাতা একটি বেঞ্চে বসে কিছুক্ষন রেস্ট নিয়ে আবার গাইরিবাসের দিকে যাত্রা। এখানে সেই ফ্রেঞ্চ মহিলা কে দেখলাম, শিখর লজে উনি হল্ট করেছেন আর চুটিয়ে বিকালে রোদ উপভোগ করছেন। তুমলিং ছেড়ে কিছুদুর যাবার পর আবার সেই কাঞ্চন দেখে দেখে থেমে থেমে ছবি তুলে হেটে যাওয়া।বিকালের রোদটা খুবই মিষ্টি লাগছিল কিন্ত আশংকা করছিলাম দিনের আলোতে হয়ত গাইরিবাস পৌছুতে পারব না। গাইরিবাসের ঠিক আগে একটি টাওয়ার ওলা সেটেল্মেন্ট আছে – নাম টা ঠিক মনে নেই, এখানে মার্চে যখন এসেছিলাম তখন ছিল ঘন কুয়াশা, কিছুই দেখা যাচ্ছিল না আর আজ দেখলাম আশে পাশের কত কিছু, পুরো উপত্যকাটাই রসিয়ে রসিয়ে দেখলাম। এখানে একটু জিরিয়ে নিতে গিয়েই দেখলাম সূর্য ডুবে গিয়ে লালিমা ছড়াচ্ছে। পাশের একটি লজের ওয়াশরুম ব্যাবহার করতে গিয়ে দেখলাম ডানে বামে সারি সারি রুম আর কম্বল লেপ মোড়ানো রোল করে রাখা বিছানার উপরে যেন আমাকে ডাকছে আয় আয় আয় … আমি তড়িঘড়ি কাজ সেরে সবাইকে তাড়া দিলাম যাবার জন্য। এদিকে মিঃকেউক্রাডং ওয়াশরুমে হানা দিল – আমি ত মনে মনে বলি হায় হায় যদি এই ছেলে সেই বিছানা গুলো দেখে তাহলে নির্ঘাত আর যেতে চাইবে না, এখানেই রাতে থেকে যেতে চাইবে। পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রনে নেবার জন্য বাকি তিন জনকে গাইরিবাসের দিকে নামিয়ে দিলাম, আমি আর বুদ্ধা দাঁড়িয়ে রইলাম ওর জন্য। লজ থেকে বের হবার পরে দেখি তার কোন প্রতিক্রিয়াই নেই … যাক বাঁচলাম বেচারা প্রাকৃতিক চাপে আশে পাশের কিছুই দেখেনি।

at Tumling

তুমলিং এ বসে বসে রোদ পোহানো

সন্ধ্যায় গাইরিবাস নামার দুটো চ্যালেঞ্জ ছিল – এক অন্ধকার যদিও টর্চ ছিল আর দুই এই রাস্তার পাথর গুলো সব ছড়ানো ছিটানো এবং পা দিলেই গড়াগড়ি খায় যেটা পা মচকে যাবার জন্য যথেষ্ট আর এই জায়গায় পা মচকে যাওয়া মানে সমূহ বিপদ।
বিপদ থাকা সত্তেও আমি এই নতুন দের নিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে গাইরিবাস যাচ্ছিলাম দুটো কারনে – এক যদি এখন আজ গাইরিবাস না পৌছাই তাহলে আমরা সান্দাকফুর সূর্যাস্ত মিস করব কারন নতুনদের জন্য বিখেভাঞ্জান খুবই কষ্টদায়ক হবে এবং হয়েছিল আর দ্বিতীয় কারন হচ্ছে আমাকে যেমন আমার ট্রেকিং গুরু স্ট্যামিনার শেষে মানসিক শক্তির শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেত ঠিক সেই আচরন টাও আমার ভিতরে চলে এসেছে অর্থাৎ যতক্ষন পা এর উপরে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারা যায় ততক্ষন ট্রেকিং।

মজার বিষয় হচ্ছে যিনি এতক্ষন হাটতে খাবি খাচ্ছিল সেই মিঃকেউক্রাডং এখন ধুপ ধাপ নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে আলগা পাথর গুলো সাবধানে এড়িয়ে, কিছুক্ষন পরে ত আমাকেই অভারটেইক করে নেমে গেল … আমি ত হতবাক যেই লোক দিনে দুপুরে সমতলে ট্রেকিং করতে খাবি খায় সেই কিনা অন্ধকারে ঝাপসা আলোতে এভাবে নেমে যাচ্ছে ! আসলেই মানুষের এবিলিটি সম্পর্কে মানুষ নিজেই অবগত নয় যদি সে সেইরকম অবস্থায় না পরে।

আমি মনে করে ছিলাম ভরা পূর্ণিমায় চাদের আলোতে ট্রেকিং করব কিন্ত প্ল্যানে একটু ভুল ছিল, চাঁদ উঠে পুব দিক থেকে আর আমরা যাচ্ছি পশ্চিমে এবং একটি পর্বতের ঢাল বেয়ে পর্বতটাকে ডান দিকে রেখে। যার কারনে একটু পরে দেখলাম অনামিশা জোছনায় পুরা উপত্যকা ভেসে যাচ্ছে কিন্ত আমরাই একমাত্র অন্ধকারে কারন আমরা আছি পর্বতের চুড়ার ঢালে চাদের ছায়াতে।
যাইহোক কোনমতে পা হড়কে আছাড় খেয়ে অনেক কষ্টে গাইরিবাস পৌছুলাম, লজে ঢুকে দেখি সবাই কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে, মানে আমিই সবার শেষে পৌঁছেছি।

Gairibas

গাইরিবাস – এরিয়াল ভিউ

হ্যা এটি একটি খুব ভালো সিদ্ধান্ত ছিল না যে চাঁদের আলোর পর্বতের ঢালের ছায়ায় গাইরিবাস নামা এবং যে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত যেমন ইরাজ ভাই অপ্রস্তুত ভাবে পড়ে গিয়ে পা এ ব্যাথা পেয়েছিলেন আর অমি কয়েকবার ই পা হড়কে ঢালু রস্তায় বসে পড়েছিলাম, আল্লাহপাকের রহমতে কিছু হয় নি কিন্ত এতটা এক্সট্রিম ট্রেকিং না করলেও চলত। তবে এগুলোর কিছু ফায়দা ও আছে, যেমন পরবর্তীতে অন্য কোনও ট্যুরে এধরনের পরিস্থিতি আসলে এগুলো কে আর রিস্ক বলে মনে হবে না। প্রতিটি ট্রেকই আলাদা এবং বিশেষ স্বাতন্ত্র্য রয়েছে, তাই নিজের যোগ্যতাকে প্রতিনিয়ত সামনে ঠেলে বিপদের সম্ভাবনা কে একটু একটু করে পিছিয়ে তবেই ট্রেকিং এ অভিজ্ঞ হওয়া যায়।
রাতে গাইরিবাসের লজে প্রায় স্বাদহীন আলুর ঝোল নামে সবজি ডাল আর ডিম ভাজি দিয়ে খেলাম। আমার আবার রাতে দাঁত ব্রাশ করে শুতে হয়, টয়লেটে মুখ ধুতে গিয়ে পানি ছুঁয়ে মনে হল এটি বোধয় বরফের চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা। বলাবাহুল্য এগুলো দিয়েই প্রাকৃতিক কাজ কর্মও সাধন করতে হয়। অবশ্য ট্রেকারদের জন্য এটি যত না কষ্টের তার চেয়ে রোমাঞ্চকর, অর্থাৎ কষ্ট হবে জেনেই ত ট্রেকিং এ আসা।

কালাপোখারি

গাইরিবাস থেকে সকালে যথারিতি নাস্তা না করে সময়ের অপচয় না করে কাইয়াকাঠা’র দিকে রওনা দিলাম। অমি আর শুভ ভাই অবশ্য এক কাপ চা খেয়েছিলাম। উঠা ধুরু করতেই এবার ইরাজ ভাই এর পায়ে ব্যাথা শুরু হল, বুদ্ধা এমনিতেই একজনের এর ব্যাকপ্যাক ক্যারি করছে … পরিস্থিতি বুঝে শুভ ভাই ইরাজ ভাই এর ব্যাকপ্যাক নিয়ে নিলেন – নিজের টা পিছনে ইরাজেরটা সামনে – সত্যি এভাবে সেচ্ছায় ব্যাপারটা ঘটে যাওয়ায় আমার খুব ভাল লাগছিল কারন পরিস্থিতি এদের সঠিক কাজটি করাতেই শিখিয়েছে।

Kalapokhari

কালাপোখারি

যেহেতু অমি ইরাজ ভাই এর খোজ খবর নিয়ে ধীরে ধীরে এসেছি, কাইয়াকাঠা এসে দেখলাম বাবলা অর্ডার দিয়েছে রুটি আর ডিম ভাজির এবং গিয়ে দেখি কটেজের মহিলা মাত্র ময়দা মণ্ড করা শুরু করেছে। সামনে থাকলেও সমস্যা পিছনে থাকলেও সমস্যা আর ট্রেকিং এ কাউকে জিজ্ঞেস না করেই খাবারের অর্ডার দেয়া হচ্ছে আরেক সমস্যা। এগুলো মোকাবিলা করার দ্বারাই অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরা।

কাইয়াকাঠা থেকে কালাপোখারির দিকে যাবার রাস্তাটা প্রায় সমতলই বলা চলে তাই ঝামেলা কম হাটা জোরে। কালাপোখারি এসে শুধু একটু চা খেয়ে আবার বিখের দিকে রওনা দিলাম। এখানে দেখলাম পর্বতের বসবাস করার সমতল অংশের যেখান থেকে ঢাল নিচে নেমে গিয়েছে তার ঠিক আগে বেড়া দিয়ে চার/পাঁচটি টেবিল আর চেয়ার দিয়ে অসম্ভব সুন্দর একটি জায়গা করা হয়েছে। আমরা বসে বসে চা তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেয়ে কিছুক্ষণ পর্বতের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম।

way to sandakphu from Kalapokhri

কালাপোখারি থেকে সান্দাকফু

টিম ট্রেকিং এ সাধারনত যে ধিরে হাটে তাকে আগে পাঠানো হয় যাতে সে পিছে না পড়ে আর পিছনের দাবড়ি খেয়ে আগে আগে চলে। কালাপোখারি থেকে বুদ্ধাকে সাথে দিয়ে বাবলা কে আগে পাঠিয়ে দিলাম। ইরাজ ভাই এর ব্যাগ সাথে নিয়ে শুভ ভাই এর গতি ত শ্লথ ছিলই তার উপরে ইরাজ ভাই স্বয়ং পা এর ব্যাথায় ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন, তাই অমি বিখেভাঞ্জান এসে বাবলা কে বুদ্ধার সাথে উপরের দিকে ট্রেইলে উঠিয়ে দিয়ে বিখেভাঞ্জানে বসে রইলাম বাকিদের জন্য। এখানে কয়েকটি ছোট লজ টাইপের ক্যান্টিন আছে, এক প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে খেতে খেতে অপেক্ষা শুরু আর স্মৃতি রোমন্থন করছি। গতবার এপ্রিলের শুরুতে অমি আর রুবেল ভাই বিখেভাঞ্জান কি যিনি কিছুই দেখিনি কারণ ১০ ফিটের ঊর্ধ্বে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আর আজ চারিদিকে সব কিছু দৃষ্টিসীমার ভিতরে সব দেখা যাচ্ছে।

ইরাজ ভাই এবং শুভ ভাই আসার পরে উপরে চেয়ে দেখি দেখি সাদা শার্ট পরা বাবলা তখন সান্দাকফুর দিকে উঠে যাচ্ছে অনেক উপরে। আমরাও ধীরে ধিরে উঠা শুরু করলাম।

সান্দাকফু

বিখেভাঞ্জান থেকে সান্দাকফু উঠার আর বিশেষ কিছু বলার নেই শুধু এইটুকুই বলব যে মার্চে সান্দাকফু না দেখে শুধু রাস্তা দেখে দেখে উঠেছি আর এবার সান্দাকফুর সেই নিল রঙের লজটা দেখে দেখে উঠছি। কিছুক্ষন পর পর অবশ্য মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছিল আমাদের। উঠার আর বিশেষ কোন বর্ণনা নেই … ঠিক নেই তা না কিন্ত প্রথম বার আমার যেমন কষ্ট হয়েছিল এবার নতুনদের ও হচ্ছে এই যা।

সান্দাকফুর চুড়ায় পৌঁছে দেখলাম ঠিক মার্চে যেই লজে উঠেছিলাম সরকারি সি ক্যাটাগরির ঠিক সেই লজটিতেই বুদ্ধা নিয়ে গেল, আমি অবশ্য চেয়েছিলাম অন্য একটা লজে উঠতে এবার কিন্ত সবার লাগেজ অলরেডি ভিতরে তাই কি আর করা ঢুকে গেলাম সেই চেনা কিচেনে আর কেয়ারটেইকার কে হিন্দি-ইংরেজিতে মনে করিয়ে দিলাম আমাকে চিনে কিনা – অবাক করে দিয়ে লোকটা বলল হ্যা আপনি নিমার সাথে এসেছিলেন আর তার বউটা বলল আপনি না আমাদের ছবি তুলেছিলেন সেই ছবি কৈ? ব্যাপক লজ্জায় পরে গেলাম এই অই বলে কাটিয়ে তাদের সাথে চুটিয়ে ‘মম’ খেতে খেতে আড্ডায় মশগুল হয়ে গেলাম।

Mt. Kanchenjunga

বিকেলের লালিমায় সিক্ত কাঞ্চনঝঙ্গা

একটুপরে আমরা সান্দাকফুর কোনায় উঠে শাটা শাট স্ন্যাপ নেয়া শুরু করলাম কাঞ্চন আর এভারেস্টের লালিমার। এখানে একটি মজার বিষয় না বললেই নয়, যেই ফ্রেঞ্চ মহিলা কে চিত্রে তে দেখেছিলাম পরে লামেধুরা তাকে আমরা পেয়েছি আবার মেঘমাতে সেখানে অবশ্য তার সাথে কিছু বাত চিত করে নাম কেন আসা ইত্যাদি জেনে নিয়েছিলাম, তাকে আমরা তুমলিং এর শিখর লজে ফেলে এসে ছিলাম ।। মানে উনি হল্ট করে ছিলেন তুমলিং এ আর আমরা গাইরিবাস এ। এর পরে তাকে আমরা আমাদের ক্রস করতে দেখিনি কিন্ত বিকেলের শেষ লালিমায় ছবি তোলার সময় দেখি সে এসে হাজির। ট্রেকিং এ পরিচয়ে কুশল বিনিময়ের এক অদ্ভুত আনন্দ আছে সেটা যারা গিয়েছেন তারা জানেন। ইজরায়েলি একটি টিমের সাথে সে এসেছে এবগ্ন একজন কে ত দেখলাম পাথরের উচু এক ঢিবিতে বসে এক মেয়ে অস্তগামি সূর্যের দিএক চেয়ে মেডিটেশানে ব্যাস্ত। বলা বাহুল্য সান্দাকফু তে পা দিয়েই রামাকান্ত দা’র সাথে পরিচয়, মানে বামে মোড় টা ঘুরেই দেখি উনি দাড়িয়ে – সবার আগে উনার সাথেই করমর্দন করেছি এবং পরিচিত হলাম – উনি বললেন এখানে সবাই জানে যে বাংলাদেশ থেকে নাকি ৪জনের এক টিম আসছে (মনে মনে জীবন’দা কে ধন্যবাদ দিলাম)। সেই সুন্দর বিকেলটা কাটালাম রামাকান্ত’দার টিম আর বিদেশি আরো কিছু ট্রেকারস দের সাথে। মজার বিষয় হচ্ছে মার্চে যেখানে দারিয়েই থাকতে পারছিলাম না সেখানে এখন ছবি তুলছি খালি হাতে আর সানন্দে আড্ডাও দিচ্ছি – সময়টা সত্যি সত্যি ভালো কেটেছিল। সূর্য ডুবে যাওয়ায় পুরো আকাশটা লাল হয়ে কি এক অদ্ভুত অনুভুতি এসে দিচ্ছিল যা ভাষায় প্রকাশ করার কাব্যিক মহিমা আমার থাকলে একটি কাব্য লিখে ফেলতাম।

সন্ধায় আবার কিচেনে হানা দিলাম, অবশ্য কিচেনে যাবার আগে রুমেও একটা ঢু মেরেছিলাম; গিয়ে দেখি বাবলা বিছানায় শীতের বুড়ী ক্রিমরোল হয়ে শুয়ে আছে আর গোঙ্গাচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম ওর সাথে একজন কে দিয়ে কাল গাড়ি দিয়ে নামিয়ে দেব বাংলাদেশে চলে যাবে আর আমি আর একজন কে নিয়ে ফালুট ঘুরে আসব। আমার মনের কথা যেন সে পড়ে নিল এবং বলে উঠল ভাই – আমাকে কাল গাড়ি দিয়ে নামিয়ে দিন। কিচেনে এসে গাড়ি রিজারভ করলাম আর আগুন তাপাতে তাপাতে আড্ডা দেয়া শুরু করলাম সাথে আদা চা।

হঠাৎ শুভ ভাই এসে বললেন যে যে কারনে ট্রাইপড তা ক্যারি করেছি সেটার সদব্যাবহার করতে, অর্থাৎ রাতে সান্দাকফু থেকে কাঞ্চনের ছবি তুলতে। ট্রাইপড আর ক্যামেরা নিয়ে বের হয়ে পরলাম, ঠিক যেখান থেকে ছবি তোলার প্ল্যান করছি ঠিক সেখানেই দেখি রামাকান্ত দা রা দাঁড়িয়ে আছে । এখানে বলে রাখা ভাল যে ট্রাইপড সেই মার্চেও নিয়ে ছিলাম কিন্ত তখন বিকেলেই যেখানে কাঞ্চন দেখতে পারিনি সেখানে রাতে দেখা অবান্তর … প্ল্যান করেছিলাম এবারও সুযোগ নিব এবং সৌভাগ্য যে চিত্রে থেকেই কাঞ্চন দেখা যাচ্ছিল আর সান্দাকফুতে ত রাতেও খালি চোখে দেখা যাচ্ছে কারন আকাশ ভরা জোছনা। জায়গা মত ট্রাইপড সেট করে ম্যানুয়াল ফোকাস এডজাস্ট শুরু করলাম কিন্ত ঠাণ্ডায় সব কিছু জমে যাচ্ছিল – গ্লাভস থেকে হাত ই বের করা যাচ্ছিল না, কয়েকটা স্ন্যাপ নেবার পরে ঠাণ্ডায় হাল ছেড়ে দিচ্ছি এমন সময় রামাকন্ত দা আসলেন ।। আমাকে ইন্সপাইয়ারড করলেন আর সাথে কেউ থাকলে সাহস একটু বেড়ে যায় বইকি। আবার ছবি তোলা শুরু করলাম। যেহেতু ম্যানুয়াল ফোকাস তাই পুরা আন্দাজের উপরে ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে ফোকাস একবার একদিকে ঘুরিয়ে একটা ছবি তুলে প্রিভিউ দেখি আবার ফোকাস আর এক দিকে একটু ঘুরিয়ে আর একটা তুলে প্রিভিউ দেখি এভাবে আন্দাজের উপরে প্রিভিউ দেখতে দেখতে ২৩ নাম্বার ছবিটা তে শার্পনেস পেলাম।

ততক্ষনে আমাদের হাত পা সব বরফ হয়ে গিয়েছে, কিন্ত ছবি পাওয়ার আনন্দে সবাই দেখি বিড়ি টানা শুরু করেছে। যদিও ছবিটা আমার ক্যামেরায় তোলা কিন্ত সেই ২৪নাম্বার ছবিটার আনন্দ সেখানে সবাই হাউকাউ করে উপভোগ করলাম। সত্যি সেই ছবিটাতে শাটার একজনই চেপেছে কিন্ত এতে উপস্থিত সবার হাত ছিল এবং এটাই ছিল আমার জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, কারন একটি স্বপ্নের যখন পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয় নিজের চোখের সামনে তখন তার অনুভুতি সত্যিই আসাধারন।

Mt. Kanchenjunga

সান্দাকফু থেকে তোলা রাতের কাঞ্চনঝঙ্গা রেঞ্জ

ছবি তুলে লজের দিকে হেটে যেতে যেতে রামাকান্ত দা তাদের কটেজে ইনভাইট করল, ওখানে গিয়ে রামাকান্ত দা’র মোবাইল ইমেইল নিয়ে আর এক দফা চুটিয়ে আড্ডা দিয়ে নিজের লজে এসে দেখি দরজা বন্ধ। আজ যদি আমি নতুন কেউ হতাম তাহলে চিৎকার শুরু করতাম কারন এই ঠাণ্ডায় যেখানে প্যান্ট গ্লাভস ভেদ করে ঠান্ডা শত সহস্র সুই দিয়ে চিমটি কাটছে সেখানে খোলা যায়গায় কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকা আত্মহত্যার সামিল। গত মার্চে আসার অভিজ্ঞতা কাজে দিল, আমি জানি যে এই কটেজে ঢুকার আর একটা দরজা আছে – দিয়ে দেখি সেই দড়জাটা ভিড়ানো – আস্তে করে ঢুকে রুমে গিয়ে দেখি দেখানেও আড্ডা।

খুব ভোরে উঠে আবার সেই সূর্যোদয়ের লালিমার ছবি যেটা কাঞ্চনের আর এভারেস্টের চুড়ায় লাল কমলা রঙ লেপে যায় তার ছবি তুলে নিলাম। নাস্তা করে দুইজনকে গাড়িতে তুলে দিলাম এবং আমি আর শুভ ভাই রওনা দিলাম ফালুটের উদ্দেশ্যে।

সান্দাকফু থেকে ৩৬০ ডিগ্রীতে প্যানারমিক ভিউ দেখার জন্য নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন
http://www.dermandar.com/user/farooque/

 

ফালুট

এই পুরো বর্ণনায় প্রকৃতির যতটুকু সৌন্দর্যের বর্নণা দিয়েছি তার কাছে এই ফালুটের সৌন্দর্য কিছুই না … সান্দাকফু থেকে সাবারগ্রাম যাবার ট্রেইল টা এত্ত সুন্দর আর প্রাকৃতিক মহ ময় যে এতা কেউ না গেলে তাকে বোঝানো যাবে না। অনন্ত অসিম দিগন্তে কাঞ্চন আর এভারেস্ট মেঘের খেলা ছায়া আর রোদের দৌড়া দৌড়ি … স্বপ্নের মত ।

শুভ ভাই এর পায়ে ব্যাথা ছিল তাই আস্তে আস্তে আমার একটু পরে সাবারগ্রাম এসে পৌঁছালেন … সাবারগ্রামে এসে একটা মজার ঘটনা ঘটল, আমার ন্যুডলস খেতে চেয়েছিলাম; দেখি যে কেয়ারটেইকার যেভাবে রান্না করছে তাতে পোষাবে নাহ … উনি ত বলেই দিলেন স্যুপ হবে নাহ। সিদ্ধান্ত নিলাম নিজেরাই রান্না করব। যথারিতি ন্যুডলস এর পানি গরম দিলাম ফোটানোর জন্য কিন্ত এই গনগনে আগুনের তাপেও পানি আর গরম হয় নাহ ফুটেও নাহ … দুজনে চিন্তায় পরে গেলাম ঘটনাটা কি এত এত জাল দিচ্ছি কিন্ত পানি গরম হয় না কেন । পরে বুঝলাম এই ৩৬০০মিটার উচ্চতায় আগুনের তাপ একটু কম হবেই বইকি। পিয়াজ টমেটূ কাচামরিচ কেটে কড়াই এ ডিম ভেজে তেল দিয়ে আমার রেডি কিন্ত ন্যুডুলস আর সিদ্ধ হয়নাহ। শেষে ২০ মিনিটের রান্না এক ঘন্টায় সেরে আমরা দুজন আর বুদ্ধা মিলে খেয়ে দেয়ে ফালুটের দিকে রওনা দিলাম।

সাবারগ্রাম থেকে বের হয়েই দেখলাম রামাকান্ত রা যাচ্ছে তাদের আগেই দেখেছিলাম কিন্ত সাবারগ্রাম কটেজে তাদের না দেখে অবাকই হয়েছি, পরে অবশ্য জানলাম যে ওরা জানেই না যে এখানে একটি রেস্টিং লজ আছে। সাবারগ্রামে আপনি টয়লেট – কিচেন এমনকি খুব প্রয়োজন হলে রাতে থাকতেও পারেন কিন্ত এর পরিচালনায় বা তত্ত্বাবধায়নে লোক থাকে ১ বা ২ জন তাই তারা কেউ যদি না আসে তাহলে ফক্কা … আর ট্যুরিস্ট সিজন ছাড় তাদের পাওয়াও ভার – তবে যেহেতু এটা এসএসবি’র একটি চৌকি তাই ৮০ ভাগ আশা করা যায় লোক থাকবে।

 

ফালুটঃ-

গতবার পলিটিক্স করে ট্যুরিস্ট খেদিয়েছিলাম ফালুট থেকে আর এবার মনে হয় আমরাই পলিটিক্সের শিকার হয়ে যাচ্ছি – রামাকান্ত রা ৯ জন আর ও অনেক টিম গিয়েছে ফালুটে গারি করে আর থাকার জায়গা মাত্র ২০ জনের। আমি নিজের সর্বচ্চ শক্তি দিয়ে হাটা দিলাম কারন ফালুটের মত জায়গায় যেখানে আক্ষরিক অর্থে বাতাসের শব্দেই সব কিছু বরফ হয়ে যায় সেখানে ফ্লোরিং করার কথা চিন্তা ও করতে পারি না। ফালুটের কটেজের থেকে ১ কিলো আগে এসে মহা ফাপড়ে পরলাম – একদিকে আকাশটা এত্ত সুন্দর লাল হয়ে দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে কিন্ত ছবি তোলার সময় নেই কারন কটেজে যেতে হবে – নিজেকে প্রবোধ দিতে দিতে দু চোখ ভরে সূর্যাস্ত উপভোগ করতে করতে কটেজে এসে দেখলাম পুরা এক চার রুমের ডরমেটোরি খালি – আমি আর শুভ দুটো বেড নিয়ে নিলাম।

Mt. Kanchenjhunga view from Phalut

ফালুট থেকে দেখা কাঞ্চনঝঙ্গা

ফালুটের লজে দেখি সেই ইজরায়েলি গ্রুপ আর সেই ফ্রেঞ্চ মেয়েটাও এসেছে, তারা চুলার চারপাশে ঘিরে আড্ডা দিচ্ছে … আমরা মানুষ মাত্র দুইজন তাই ওখানে না বসে রুমেই বসে কাটিয়ে দিলাম সন্ধ্যাটা। রাতে ডাইনিং এর দেখলাম ফরেইনাররা জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছে খুব উপভোগ করে খাচ্ছে … ইশ আমরা চারজন যদি থাকতাম তাহলে আমরাও এভাবে দখল করে মজা নিতাম।

সকালে ভোরে উঠেই কাঞ্চনের ছবি তুলতে উপরে উঠেগেলাম এবং গতবারের মত এবারো সাথে পানি নিতে ভুলে গিয়েছি। দেখলাম ঘাসের শিশির গুলো জমে বরফ হয়ে আছে । পুরোটা পর্বতের চুড়াই ঘাসের সবুজের সাথে সাদা জমে যাওয়া শিশির বরফে একাকার। কাঞ্চন এভারেস্ট আর দিগন্তের নৈসর্গিক ছবি তুলতে তুলতে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম – মানে কাঞ্চনের কাছে – হঠাৎ পিছনে চেয়ে দেখি রামাকান্তদা রা অনেক পিছনে তিনটি বিন্দুর মত দেখা যায় … এভাবে একা একা একটি বিরান পর্বতের চুড়ায় চারিদিকে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে উপলব্ধি করলাম প্রকৃতির কাছে আমরা কতটাই ক্ষুদ্র। সবাই দেখি যার যার মত ছবি তুলছে আর আমি একটু ভালো কম্পজিশানের জন্য একটা অপ্রচলিত ট্রেইল ধরে এগিয়ে যাচ্ছি কাঞ্চনের দিকে, কিছু দূর যাবার পরে বুঝলাম যে আর কিছুদুর গেলে পৌঁছেই যাব(!) তাই আবার ফিরে আসা শুরু করলাম। এসে দেখি সেই ফ্রেঞ্চ লাফ দিয়ে পোজ দিচ্ছে আর তার বন্ধু তার উরন্ত ছবি তুলছে – চামে আমিও একটি তুলে ফেললাম (অনুমতি নিয়েই)। লজে ফেরার পরে রামাকান্তরা যেই প্রাইভেট কটেজে উঠেছে সেখানে গেলাম এইটূ আড্ডাবাজি করার জন্য, দেখি ওরা তখন নাস্তা করছে আলুর দম আর রুটি দিয়ে।

যাবার পথে দেখি ঝরনা থেকে একটি পানির পাইপ সেই কটেজের দিকে নেয়া এবং কিছু জায়গায় পানি পাইপ ফেটে বের হয়ে আসছে – কিন্ত বের হওয়া পানিগুলো পুরপুরি জমে বরফ হয়ে গিয়েছে একদম রাস্তার উপরে স্বচ্ছ বরফের আস্তর।

গোরখে থেকে রামাম হয়ে রিম্বিক

ফালুট থেকে সকালের নাস্তা করে রওনা দিলাম গোরখের উদ্দেশ্যে … সেই পরিচিত ট্রেইল সেই পরিচিত রাস্তা শর্টকাট হেটে যাবার সময় কি যে ভাল লাগছিল তা যে দ্বিতীয়বার গিয়েছে সেই জানে। গোরখে পৌঁছে আমরা চিওমিং খেয়ে নিলাম। শুভ ভাই এর পায়ে ব্যাথা তাই আমি একা একাই ট্রাইপড নিয়ে ঝরনার স্লো-শাটার প্র্যাক্টিস করতে থাকলাম। একটু জিরিয়ে আমরা রামামের দিকে রওনা দিলাম।

সন্ধ্যার কিছু আগে রামাম পৌছুলাম, রামামে দেখলাম একদল ট্রেকার টেন্টিং করে থাকছে, কিচেনে তাদের গাইডদের সাথে পরিচিত হলাম, কথা বলার লোক পেয়ে একজন জনপদ, ইতিহাস রাজনীতি নেপালিদের কথা বলা শুরু করল আমি দুই একটা হু হা করে শুনতে থাকলাম তার গল্প। রাতে দিদি আমাদের ঘি আর ডাল সবজি ডিম দিলেন খেতে, ঘি টা এতটাই সুস্বাদু ছিল যে শুধু ঘি দিয়েই আমি পুরো দুই প্লেট ভাত সাবার করে দিয়েছিলাম।

রামাম থেকে নাস্তা করে আমরা রিম্বিকের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। যেহেতু পা এ ব্যাথার জন্য শুভ ভাই ধীরে ধীরে ট্রেক করছেন তাই অমি চিনা পথ মনে করে একাই একটু সামে এগিয়ে গেলাম এবং পড়লাম ফাপরে। শ্রীখোলা থেকে রামাম পর্যন্ত বুল্ডোজার দিয়ে গাড়ির রাস্তা করা হচ্ছে আর অমি শর্টকাট কে হারিয়ে শ্রীখোলার দিকে নেমে চললাম। চিন্তা ছিল না কারণ বুদ্ধা আছ এশুভ ভাই এর সাথে। শ্রীখোলা পৌঁছে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম ওদের জন্য, তার পরে পৌছুলাম সিপ্পি তে। এখানেও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম তাদের জন্য। শেষে একটি গাড়ি ধরে রিম্বিক চলে এলাম এবং দার্জিলিং এর শেয়ারড জিপের টিকিট কেটে অপেক্ষা করছি শুভ ভাই আর বুদ্ধার জন্য। গাড়ি ছাড়বে ১২টায় , ঠিক পৌনে বারোটার দিকে দেখি শুভ ভাই আর বুদ্ধা আসছে, তাদের দেখে যে কি খুশি হয়েছিলাম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটি আমার এই ট্যুরের দ্বিতীয় শিক্ষা, গাইড থাকলেও কখনো টিম ছেড়ে দুরে যেতে নেই, যেমন নিজেই পথ হারিয়ে বসেছি এবার।

রিম্বিকে শুভ ভাই আর বুদ্ধার জন্য অপেক্ষা করতে করতে দেখলাম রাস্তায় এক ধরনের জুয়া খেলা হচ্ছে – একটা বড় কৌটার ভিতরে ডাইস রেখে যেই নাম্বার উঠে তা নিচে একটি চার্টে টাকা অথবা অন্যকিছু লিখা ঘরে ইঙ্গিত করে । একজন এস এস বি দেখলাম ডিউটি ড্রেস পরে খেলতে আসল, দশ রুপি দিয়ে শুরু করে ৫ মিনিটে ৬০ রুপি ইনকাম করে আমার দিকে চেয়ে “বহুত আচ্ছা” বলে খেলা থেকে সটকে পড়লেন … বুদ্ধিমান জুয়ারি।

দার্জিলিং

আমরা দার্জিলিং পৌছালাম বিকেলের দিকে, গিয়েছি শেয়ারড জিপে, আমরা দুই নাম্বার রো তে বসেছিলাম আর জিপের পিছনের সিট গুলোতে কলকাতার কিছু ছেলে ছিল যারা ক্রমাগত বাংলা ভাষার উপরে যথেষ্ট আঞ্চলিক অত্যাচার করে কথা বলছিল, এই যেমন গিয়েচিস – খেয়েচি – মাইরি ইত্যাদি … শুনে শুনে আমার আর শুভ ভাই এর কথার ভিতরেও দেখি সেইরকম টান চলে আসছিল। আমি আর শুভ ভাই এর পরে নিজেদের ভিতরে কথাবলতে গিয়ে আবিস্কার করলাম যে আমাদের কথার টান এবং ফ্রেইজ গুলো তাদের মত হয়ে যাচ্ছে!

আমাদের জিপ যখন ঘুম (দার্জিলিং এর একটু আগে) অতিক্রম করল তখন দেখি এক ভদ্রলোক ড্রাইভারের পাশের সিটে উঠে পড়লেন এবং উঠেই হোটেলের দালালী শুরু করলেন। গাড়ি থামার পরে সেই ভদ্রলোক আমাদের এমন একটি হোটেলে নিয়ে গেল যেটি চক বাজারের ভিতরে – ইসলামিয়া রেস্টুরেন্টের কাছে এবং চৌরাস্তা থেকে বেশি দুরে নয়। ভাড়া ডাবল বেড ৮০০/- রুপি, মন্দ নয় … উঠে পড়লাম। উঠেই প্রথমে গোসল – হ্যা প্রায় সাত দিনের জমে থাকা গোসল। হোটেলের রুমে প্রবেশ করেই সেই যে গিজার নামক একটি বস্তু চালু করা হয়েছিল তা আর পানি গরম করতেই পারছিল না, আবার এদিকে সন্ধ্যাও হয়ে যাচ্ছিল। অগ্যতা সেই বরফ শীতল পানিতেই গোসল করে বের হলাম, সত্যি বলতে কি এই বরফের মতো ভয়ানক ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করেই বরং বেশি চনমনে হয়ে উঠলাম।

সন্ধ্যার আলো আধারিতে হোটেল থেকে বের হয়ে শুরু করলাম আমাদের নাইট ফটোগ্রাফি। বিগ বাজার চৌরাস্তা ইত্যাদি এলাকা ঘুরে ঘুরে ছবি তুলে রাস্তার পাশে অস্থায়ী দোকানগুলোতে খেয়ে রাতের দার্জিলিং এর রূপ ভালই উপভোগ করেছি। এই পোস্টের শেষে রাতের দার্জিলিং এর একটু পুরো এলবাম দেয়া আছে।

ট্যুরিস্ট দের জন্য দার্জিলিং শহর কে তিন ভাগে ভাগ করা যায়, এক চৌরাস্তা, দ্বিতীয় চকবাজার এলাকা আর তৃতীয় হচ্ছে ট্যুরিস্ট স্পট গুলো। সত্যি কথা বলতে কি সান্দাকফু – ফালুট ট্রেক করে এসে দার্জিলিং ঢোকা মাত্রই আপনার এটিকে পুরনো ঢাকার একটি ঘিঞ্জি গলি ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না কিছু কিছু জায়গায়।

যারা ট্রেকিং না করে শুধু দার্জিলিং যান তারা বরং শিলিগুড়ি তেই দুটো বড় বড় শপিং মল আছে এবং কনেক ব্রান্ড এর জিনিস পাওয়া যায় আর দার্জিলিং এর চাইতেও সস্তা – ওখান থেকেই শপিং করে নিয়েন যাবার পথে। আর গরম কাপড়ের কথা ভাবছেন? অমি ত বলি ভালো গরম কাপড় পাবেন মিরিক এর মাঠের পাশের মার্কেটে এবং দরদাম করলে চূড়ান্ত সস্তায় পাবেন – যেমন একটি ভালো শাল সেখানে ৯০/- রুপি আর দার্জিলিং এ ১৫০/- রুপি আর বাংলাদেশের ৪৫০/- টাকা। তবে এটি সত্যি যে দার্জিলিং এর চৌরাস্তা এবং এর আশে পাশের দোকান গুলোতে বিভিন্ন যায়গা থেকে নিয়ে আসা অনেক জিনিস পাবেন এবং মনে রাখবেন ফিক্সড প্রাইসের দোকান গুলোতে ঢুকেই শপিং করা শুরু করবেন না। কারণ একটু এগিয়ে গিয়ে দেখবেন হয়ত আর একটি ফিক্সড প্রাইসের দোকানে এই একই জিনিস হয়ত আরও একটু কমে ডিস্কাউন্ট দিয়ে বিক্রি করছে। আর দরদাম ত করবেন ই তবে সম্ভব হলে পারলে পুরো এলাকার মোটামোটি চোখে পড়ে এমন দোখান গুলোতে হানা দিয়ে আগে দেখে তারপরে শপিগ্ন শুরু করতে পারেন। আর চকবাজার এলাকায় সকাল সকাল দিনের শুরুতেই হানা দিন, এরা আবার দিনের প্রথম ক্রেতা হারাতে চায় না।

দার্জিলিং এ দুটো হালাল ইসলামিক রেস্টুরেন্ট আছে এবং দুটোই চকে মানে চক বাজার এলাকায় মাসজিদের আশে পাশে। তাই বাংলাদেশ থেকে যারা যাবেন এবং হালাল খাবার অন্বেষণ করবেন তাদের জন্য থাকার উপযুক্ত যায়গা হচ্ছে চক বাজারের আশে পাশে যাতে মাসজিদে গিয়ে নামাজ ও আদায় করতে পারবেন এবং শপিং বরং এইখানেই ভালো করতে পারবেন তবে কিছু এলিগেন্ট জিনিসের জন্য চৌরাস্তা এবং এর আশে পাশের মার্কেট গুলো ঘুড়ে আসতে পারেন।

ট্রেকারদের জন্য দার্জিলিং এর মুল আকর্ষণ হচ্ছে এইচ এম আই মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট। এখান থেকেই পর্বত আরোহণের বেসিক এবং এডভান্স কোর্স করানো হয়। একসময় আমার খুব স্বপ্ন ছিল এই কোর্স গুলো করার কিন্ত প্রায় এক মাস সময় নিয়ে করার বয়স পার হয়ে এসেছি অনেক আগেই। এই জায়গাটাতেই আছে একটি চিরিয়াখানা যাতে এই অঞ্চলের অনেক পশু পাখি রয়েছে আর মজার বিষয় হচ্ছে প্রত্যেকটি খাঁচার সামনে ঐ প্রাণীর ছবি এবং সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখা আছে যা খুবই তথ্যবহুল।

পুরো এলাকাটাকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায় – এক ভাগে বাঘ – মাছ এক ভাগে পাখি এবং অন্যান্য পশু আর এক ভাগে এইচ এম আই এর যাদু ঘর আর এইচ এম আই এর অফিস ( যেটাতে এখন আর ট্যুরিস্টদের ঢুকতে দেয় না ) । ট্রেকারদের জন্য সব চাইতে আকর্ষণীয় জায়গাটি হচ্ছে এই যাদুঘরটি, যার ভিতরে এভারেস্ট ক্লাইম্বিং এর ক থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত সব তথ্য এবং ইতিহাস সংরক্ষিত আছে । যেহেতু যাদু ঘরের ভিতরে ছবি তুলতে দেয়া হয় না তাই ছবি দেয়া গেল না কিন্ত বর্ণনা ত করাই যায়।

যাদুঘরটি দুই তলা নিয়ে, নিচের তলায় আছে এভারেস্ট ক্লাইম্বিং করতে গিয়ে যে সমস্ত গিয়ার ব্যবহার করা হত সেগুলো আর পুরো এভারেস্ট এলাকার একটি ছোট্ট রেপ্লিকা আছে যা বোতাম চেপে ধরলে পর্বত বা নদীর অংশে বাতি জলে উঠে, যার দ্বারা বোঝা যায় কোন পর্বতের চুড়া কোনটা বোঝা যায়।

পুরো যাদুঘরটি অনেক সময় নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখে পড়ে নিচ থেকে দোতলা হয়ে বের হবার সময় আপনার কল্পনায় এভারেস্টই ঘুরতে থাকবে। এই যাদুঘরের চত্বরেই আছে শেরপা তেঞ্জিন নরগে’র দেহাবশেষ। চিরিয়াখানা অংশের নাম হচ্ছে পদ্মজা নাইড়ু হিমালয়ান জ্যুলজিক্যাল পার্ক আর এইচ এম আই হচ্ছে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট। কিছু তথ্য পাবেন এখানে

এর পরবর্তী আকর্ষণ হচ্ছে রোপ কার, এইচ এম আই থেকে নেমে হাতের ডানের রাস্তা ধরে গেলে হেঁটে হেটেই যাওয়া যায় তবে ইদানীং রাস্তাটা ট্যুরিস্ট দের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে তবে যাওয়া যায়, আর না হলে একদম নিচে নেমে সোজা পশ্চিম দিকে হাটা দিতে হবে মেইন রোড ধরে।
দার্জিলিং এর কোন সার্ভিস নেই এবং গাড়ি ভাড়া করলেও সব গাড়ি সব জায়গায় যেতে পারে না তাই যারা ট্রেকার নন কিন্ত বেড়ানোর জন্য দার্জিলিং যাবেন তারা অবশ্যই উঁচু নিচু হাঁটাহাঁটির মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই যাবেন। তবে যদি সারাদিনের জন্য ৮০০/১০০০ রুপি দিয়ে একটি গাড়ি ভারা করেন তাহলে কিছু কমন ট্যুরিস্ট স্পট একসাথে দেখে আসতে পারেন।

অমি প্রথম রোপ কার এ চরেছিলেম এখানেই মার্চ এপ্রিল সিজনে, তখন অনেক ভয় পেয়েছিলাম কারণ এটিই ছিল আমার প্রথম। এবার টিকিট কেটে লাইনে দাড়িয়ে আছি এমন সময় কিছু ট্যুরিস্ট দম্পতি আমার মনোযোগ কেড়ে নিল, চেহারা সুরত দেখে পুরদস্তর বাংলাদেশী মনে হল। অমি এগিয়ে গিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বললাম – ভাই আপনারা কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন? উত্তরে হ্যা বলে ভদ্রলোক বললেম অমি কলকাতার কিনা ! অমি কইলাম – ধুর মিয়া। এরা দুই বন্ধু দম্পতি ঢাকার একটি ট্যুর অপারেটর এর মাধ্যমে এসেছে। রোপকারের ভিতরে দম্পতি যুগলের বিশেষ করে তাদের বউদের উচ্চতা ভীতি’র প্রতিক্রিয়া ছিল দেখার মতো, এর ভিতরেই ফিরে আসার সময় অমি আবার যোগ করলাম যে একবার এই রোপকার ছিঁড়ে পড়ে গিয়েছিল, এই কথা বলতেই রোপকার স্থির হয়ে গেল (যে কোন টেকনিক্যাল কারণেই তা হতে পারে – খুবই স্বাভাবিক ঘটনা) আর যায় কই, এদের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা দেখে নিজেই ভয় পেয়ে গেলাম- যে হারে রোপকার দোলা শুরু হয়েছে তাতে পড়েই যায় নাকি! নাহ শেষ মেস সব স্বাভাবিক ই ছিল।

রোপ কার এ চড়ার পরে আছে টি-গার্ডেন – একটু পশ্চিমে, এখানেও সেই নেপালি পোশাক পড়িয়ে ছবি তোলার লোক আছে – একদম চা তোলার ঝুড়ি মাথায় দিয়ে ছবি তোলা যায়। চা বাগানের আগে কিছু চা এর দোকান আছে, দোকানের মহিলা গুলো খুব সুন্দর ইংরেজি বলে, এদের হাতে চা খেয়ে তৃপ্ত হয়ে আবার তাদের চা কিনতে যাবেন না কিন্ত। যে চা আপনাকে খাওয়াবে তার ধারে কাছেও নেই যেগুলো বিক্রি করে সেগুলোর মান এবং স্বাদ। এদের বিজনেস স্ট্র্যাটেজি ই হচ্ছে চমৎকার স্বাদের চা খাইয়ে রেগুলার চা পাতা বিক্রি করা। কাজের কাজ যেটি করতে পারেন তা হচ্ছে চা বাগানে নামার আগে আর পরে মিলিয়ে বেশ কয়েক কাপ চা খেয়ে আসতে পারেন, এটাই স্বাদের স্মৃতি হিসেবে থেকে যাবে অনেক দিন।

*** ২০১৪ সালের নভেম্বারে আমার বউ বাচ্চা সহ গিয়েছিলাম এবং আমার বউ তাদের চা খেয়ে স্বীকার করে নিয়েছে যে জীবনের সবচাইতে ভালো চা টা নাকি এখানেই খেয়েছে – মানে ওরা যেটি বানিয়ে দেয়। চা খেতে খেতেই আমার বউ বুঝে গিয়ে ছিল ওদের বিজনেস স্ট্যাটেজি, কারণ চা টা তারা বানায় দৃষ্টি সীমার আড়ালে। তাই টি-গার্ডেন থেকে ফিরে আসার আগে ২/৩ কাপ ইচ্ছে মত খেয়ে নিয়েছিলাম।

বিকেলে ফিরে আসতে পারেন চৌরাস্তায় এবং এর আশেপাশে, পুরোটা বিকেল এবং সন্ধ্যা এখানে কাটিয়ে দিতে পারেন এবং সাথে কিছু কেনা কাটা ত আছেই। মনে রাখবেন, দার্জিলিং শহর সাতটা বাজলেই অন্ধকার, অর্থাৎ কমার্শিয়াল সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়, কাজেই চৌরাস্তার কোলাহল উপভোগ করতে করতে হোটেলে ফিরতে গিয়ে অন্ধকারে রাস্তা হারিয়ে ফেলতে পারেন। এমন কি হোটেলের শাটার ও বন্ধ থাকে, ভিতরে অবশ্য লোক থাকে, বাড়ি দিলেই খুলে দেবে। আপনি যদি নতুন হন তাহলে অবশ্যই মনে রাখার চেষ্টা করবেন হোটেলের রাস্তা এবং কোথায় আছেন ইত্যাদি, নাহলে ৮টা বা তার পরে কাউকে জিজ্ঞেস করার লোক ও খুঁজে পাবেন না রাস্তায়।

ইসলামিয়া রেস্টুরেন্ট ছাড়াও চৌরাস্তার কাছে পাবেন হেস্টি টেস্টি রেস্টুরেন্ট, খাবারের মান ভালো এবং নগদে সব কিছু বানায়। এছাড়া কে এফ সি, পিজা হাট, ডমিনোস এগুলো ত আছেই।

দার্জিলিং এর আর একটি মুল আকরযন হচ্ছে টাইগার হিল। এটি দার্জিলিং একটি উঁচু পাহাড়। আসলে দার্জিলিংটাই ত একটি পাহাড়ের উপরে এবং টাইগার হিল হচ্ছে তার একটি চুড়া। এখান থেকে কাঞ্চনঝঙ্গা পরিষ্কার দেখা যায়, আর আবহাওয়া ভালো থাকলে ও পুরো সারজিলিং জুড়েই কাঞ্চনঝঙ্গা দেখা যায়। এমন ও আছে যে আপনি হয় চৌরাস্তায় শপিং করছেন, হঠাৎ একটু ডানে তাকালেই দেখেবন কাঞ্চনঝঙ্গা। এইচ এম আই / টি-গার্ডেন বার পশ্চিম দিকে দৃষ্টির বাধা নেই এমন উঁচু রাস্তা বা হোটেলের ছাদ বা হয়ত রেগুলার কোন রাস্তা থেকেই কাঞ্চনঝঙ্গা দেখা যায়। কিন্ত টাইগার হিলের কাহিনী হচ্ছে সূর্য উঠার সময় লাল আভা’র রঙে কাঞ্চনঝঙ্গা’র চুড়া দেখা যায় ওখান থেকে, তাই খুব ভোর থেকেই মানে চারটার দিকেই লোক জড়ো হতে থাকে টাইগার হিলের উপরে। আর সকালে ত পুরো রাস্তাই জ্যাম লেগে যায়। আবার অনেক কে দেখি খানেকটা পুঁজ অর্চনার প্রিপারেশান নিয়েও ওখানে যায়।

কিন্ত ট্রেকার দের কাছে এই টাইগার হিলের গুরুত্ব নেই কারণ সান্দাকফু ফালুট ট্র্যাকিং করে এসে তাদের কাছে এর মূল্যমান খুবই কম। বিশেষ করে ফালুট থেকে কাঞ্চনঝঙ্গা এত কাছে থেকে দেখে আসার পরে দার্জিলিং এসে এত হাঙ্গামা করে আবার টাইগার হিলে যাওয়াটা মূল্যহীন।

দু রাত কাটিয়ে পরের দিন দার্জিলিং থেকে শিলিগুড়ির একটি শেয়ারড জিপে চড়ে শিলিগুড়ি পৌঁছে সন্ধ্যার বাংলাদেশ চলে এলাম।

প্রতিটি ট্যুরেরই ভুল ভ্রান্তি থাকে এবং এগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই বড় কথা। তথ্যে এবং বর্ণনায় অনেক কিছুই বাদ পরে গিয়েছে বা অমি নিজেই হয়ত ভুলে গিয়েছি এবং তার জন্য কোনও আফসোস ও নেই কারণ প্রতি বছর ই এখানে আসার নিয়ত করেছি এবং ইন শা আল্লাহ আসবই। তথ্যে কোনও গরমিল থাকলে বা কোনও কিছু অপ্রাসঙ্গিক হলে দয়া করে কমেন্টে জানিয়ে দেবেন, অমি শুধরে নিব।