পশ্চিম বঙ্গের সর্বোচ্চ পর্বত চুড়া সান্দাকফু’র ভৌগলিক অবস্থান পশ্চিম বঙ্গে ভারত আর নেপালের মাঝামাঝি। নেপালিরা অবশ্য বলে সান্দাকফুর – একটি অতিরিক্ত বয়সিন্ন ‘র’ আছে তাদের নামে। বিভিন্ন ব্লগ আর ম্যাপে সামান্য হেরফেরে এই নাম গুলো আছে Sandakphu / Sandakphur/ Sandakfu ।  এই পর্বতের চুড়ার উচ্চতা ৩৬৩৬মিটার বা ১১৯২৯ ফিট। সান্দাকফুর চুড়া যেখানে টি-হাউজ / লজ / কটেজ গুলো আছে তার থেকে একটু দুরে মুল চুড়ার মাথাটি অবস্থিত যেটিতে উঠা একটু বিপদজনক কিন্ত উঠার পরে সান্দাকফুর ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ দেখার পরে সেই কষ্ট উসুল হয়ে যায়।

 

সান্দাকফু নামটি সর্বপ্রথম শুনছিলাম আমার ট্রেকিং গুরু ‘আনোয়ার ভাই’ এর মুখে, উনি বিভিন্ন সময় উনার পোর্টেবল হার্ডডিস্ক থেকে আমাকে ছবি বের করে দেখাতেন এবং প্রায়শঃই গুগল এ ছবি সার্চ করে দেখিয়ে বলতেন উনি এইসব জায়গা দিয়ে গিয়েছেন এবং এখানে এটা ওখানে ওটা। এসব শুনে শুনে আর অবসর সময়ে গুগলে ম্যাপ দেখে কিছু কিছু জায়গার নাম ও প্রায় মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। আমার একটি গোপন ইচ্ছা ছিল আধিক উচ্চতা আরোহণের এবং তখন মাত্র বাংলাদেশের সবোর্চ্চ পাহাড়টি আরোহণ করে ফেলেছি (মদক/ সাকা হাপং), আর তাই আনোয়ার ভাই যখন বলল সান্দাকফু’র কথা, তখন মনে মনে টার্গেট করে রেখেছিলাম ২০১২তেই সান্দাকফু ভ্রমণ করবো ইনশাআল্লাহ। যদিও মালেশিয়ার মাউন্ট কিনাবালুতে যাবার কথা ছিল কিন্ত এত টাকা ($1000) জোগার করার চাইতে ২০০০ ফিট কম উচ্চতায় সান্দাকফুকে’ই নেক্সট টার্গেটে রাখলাম।

*** এই টুরের সময়কাল ২০১২, বর্তমানে অনেক কিছুর ই পরিবর্তন হয়েছে এবং অনেক সহজ হয়েছে তাই অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকাবার আগেই মনে করে নিন আপনি আমাদের সাথেই ২০১২ সালে টাইম ট্রাভেলে সান্দাকফু যাচ্ছেন।

আবহাওয়া এবং উপযুক্ত সময়ঃ
আসলে হিমালয়ের আশে পাশের এলাকাতে ট্রেকিং এবং ট্যুরের জন্য মূলত দুটি সিজন থাকে, একটি মৌসুমি বায়ু প্রবাহের আগে এবং পরে, যাকে Before Spring and After Spring বলে। সান্দাকফু’র এলাকার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য।  মৌসুমি বায়ু প্রবাহের আগে অর্থাৎ মার্চ-এপ্রিল-মে একটি সিজন এবং সেপ্টেম্বার-অক্টোবার-নভেম্বার হচ্ছে পরবর্তী সিজন।  সান্দাকফু ট্রেকিং এর মুল একটি আকর্ষণ থাকে সেটি হচ্ছে ট্রেকিং এর শুরু থেকেই অর্থাৎ চিত্রে থেকেই কাঞ্চনঝঙ্গা আর তংলু থেকে এভারেস্ট খালি চোখে পরিষ্কার দেখা যায় এবং ট্রেইলে চলতে চলতে ডানে – সোজা তাকালেই দেখা যায়। আর তার সাথে উচ্চতা এবং প্রাকৃতিক নৈসর্গিক পরিবেশ ত আছেই।

অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে মৌসুমি বায়ু প্রবাহের আগে আবহাওয়া কদাচিৎ পরিষ্কার  মানে পুরোপুরি মেঘ এবং কুয়াশা মুক্ত পাওয়া যায় যাতে কাঞ্চঝঙ্গা আর এভারেস্ট দেখা যায় … একেবারে দেখা যায় না তা বলা ঠিক না কিন্ত শুধু সকাল বেলায় একটি বলির রেখার মতো কিছু দেখা আসলে ট্রেকিং অথবা ভ্রমণের ঝক্কিটার প্রতিদান হতে পারে না আর খালি চোখের দেখাটা বাসায় এসে ছবিকে ডিহেইজ করে পরে দেখতে হয় আর কি। তবে এই সময়ে পুরো রাস্তা ভর্তি রডোডেন্ড্রন ফুল পাওয়া যায়, লাল লাল ফুলে পুরো ট্রেক ঢেকে যায়, ডানে বামে তাকালেই ফুলে ফুলে ছাওয়া গাছ গুলো অবশ্যই আপনাকে অনন্দ দেবে।

সব চাইতে ভালো সিজন হচ্ছে মৌসুমি বায়ু প্রবাহের পরের সময় অর্থাৎ সেপ্টেম্বার-অক্টোবার-নভেম্বার সিজন। এই সময় সেই ফুলগুলো আর পাওয়া যায় না কিন্ত এই ট্রেকের মুল আকর্ষণ কাঞ্চন ঝঙ্গা আর এভারেস্ট আপনি চিত্রে থেকেই দেখে দেখে ফালুট পর্যন্ত ট্রেক করতে পারবেন।  তবে এই সময় অতিরিক্ত ঠাণ্ডা থাকে আবহাওয়া এবং ভালো করে ঠাণ্ডার প্রস্তুতি না নিয়ে এলে এই সময় বিপদেই পড়তে হবে। মৌসুমি বায়ু প্রবাহের সময় অর্থাৎ বর্ষাতে প্রকৃতিকে বেড়ে উঠতে দেবার জন্য সিঙ্গালিলা রেঞ্জ প্রতি বছর জুন মাসের ২৫ তারিখ থেকে সেপ্টেম্বারের ১৫ তারিখ পর্যন্ত ট্যুরিস্ট দের জন্য বন্ধ থাকে। বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকাগুলোতেও এমন কিছু করা উচিত।

ট্যুরের ব্যাপারে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য
সান্দাকফু’র ব্যাপারে আমার সবচেয়ে বড় যেই আবেগ’টি কাজ করছিল সেটা হচ্ছে ১১৯২৯ফিট আরোহন এবং নিজ চোখে কাঞ্চনঝঙ্গা এবং এভারেস্টের চূঁড়া দেখা। যেহেতু আনোয়ার ভাইর এর সাথে আর ব্যাটে-বলে হয়ে উঠেনি তাই আমার আর এক ট্র্যকিং পার্টনার ‘মাহবুব রুবেল’ কে রাজী করালাম যদিও সে মাউন্ট কিনাবালু’র প্ল্যানে ছিল। যথাস্তু আমরা দুজন ইন্ডিয়ান ভিসা – পাসপোর্ট এন্ডোর্সমেনট – শ্যামলী’র ঢাকা – শিলিগুড়ি’র বাসের টিকেট কেটে ফেল্লাম। বাসের টিকিটের ক্ষেত্রে আমরা রাউন্ড ট্রিপ না করে ওয়ানওয়ে’র কেটেছিলাম যাতে বাসের টিকিটের জন্য আমাদের কোন তৎক্ষণিক প্ল্যান আটকে না যায়।

ভিসা আর শ্যামলীর ব্যাপারে কিছু বলে নেই যদি ব্যাপারটা জেনে কারও উপকার হয়। ইন্ডিয়ান ভিসা ফি ৪০০/- টাকা ছিল এবং আপনার কগজ-পত্র ঠিক থাকলে এমনিতেই ভিসা দিয়ে দেয়। আমি এক মাসের জন্য ভিসা চেয়েছিলাম কিন্ত সবাইকে নাকি ৩ মাসেরই দেয়  এবং আমাকেও তাই দিল। আর বাসের ব্যাপারটা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যায় শুধু শ্যামলী’ই, অন্যান্য গুলো আপানকে বুরিমারি বর্ডারে নামিয়ে দিবে। বর্ডার পর্যন্ত ভাড়া তখন ছিল ৫৫০/- টাকা এবং বর্ডারের ঝামেলা শেষ করে ওপাড়ে চ্যাংড়াবান্ধা থেকে আবার শিলিগুড়ী পর্যন্ত লোকাল বাস ছাড়ে এক ঘন্টা পর পর। কিন্ত সমস্যাটা হচ্ছে চ্যাংড়াবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত রাস্তাটার কিছু কিছু জায়গার চান্দের গিরিখাত রয়েছে এবং সাদা ধুলা খেয়ে কিঞ্চিৎ ফর্সা হয়ে যাবার সুযোগ রয়েছে।  চ্যাংড়াবান্ধার পরে শ্যামলীর একটা ভলভো গাড়িতে করে নিয়ে যায় যেটা খুবই আরামদায়ক, আর বুড়িমাড়ি বর্ডার পর্যন্ত একটা হিনো গাড়িকে জোড় করে এসি বানিয়ে সার্ভিস দেয়া হয়। আর মতিঝিল সোনালী ব্যাংক প্রত্যকের জন্য ৩০০/-টাকা দিয়ে ট্রাভেল ট্যাক্সে’র একটা রশিদ কেটে নিবেন – সেটা অবশ্য বাসেও দেয়া যায় বা বুড়িমাড়ি পৌঁছেও দেয়া যায়, শুধু টাকাটা পে করলেই হয়।

এ ক্ষেত্রে যদি আপনি খুব দ্রুত এবং সময় নষ্ট না করে মানেভাঞ্জান বা চিত্রে পৌঁছাতে চান তাহলে আপনি শ্যামলীতে না গিয়ে লোকাল বাসে ঢাকা থেকে বুড়িমাড়ি বর্ডার পর্যন্ত এসে কোন লোকাল দালাল কে দিয়ে পাসপোর্ট এর কাজ করিয়ে খুব দ্রুত বর্ডার ক্রস করে চ্যাংড়াবান্ধা থেকে কোন গাড়ী রিজার্ভ করে সরাসরি শিলিগুড়ি হয়ে মিরিক হয়ে মানেভাঞ্জান চলে যেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আগেই ফোন করে শিলিগুড়ি ‘র কোন ট্যুর অপারেটর বা রেন্ট এ কার এর সার্ভিস থেকে গাড়ি রিজারভেশান করে নিতে পারেন। এভাবে করলে আপনি খুব কম সময়ে মিরিকে ১ঘণ্টার মত সময় ব্যয় করে মানেভাঞ্জান পৌঁছাতে পরেন এবং মজার বিষয় হচ্ছে লোকাল চেকপোস্টে এন্ট্রি – গাইড এসোসিয়েশান থেকে গাইড নিয়ে – সিঙ্গারিলা পার্কের টিকিট কেটে আপনি আরও এক/দেড় ঘণ্টা সময় পাবেন এবং আমার অনুরোধ মানেভাঞ্জান না থেকে সোজা চিত্রে উঠে যাবেন। অবশ্য এই প্ল্যান মিনিমাম ৪/৫ জনের গ্রুপ ট্রেকিং এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

মনে রাখবেন শ্যামলীতে গেলে আপনি ১টার আগে কখনোই শিলিগুড়ি পৌঁছাতে পারবেন না। চিত্রের রাস্তার বর্ণনা সামনে আসছে তবে গাড়ি থেকে নেমেই অনেকে ট্রেকিং করাকে একটু অপছন্দ বা অস্বস্তিকর মনে করতে পারেন, কিন্ত আসলে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উল্টো। বরং গাড়িতে দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে আর আল্টিচিউড গেইনের চাপ থেকে খুব সহজেই মুক্ত হতে পারবেন যদি একটু রেস্ট নিয়ে হাত পা ছড়িয়ে আস্তে আস্তে ট্রেকিং শুরু করে দেন। অমি নিশ্চিত যে পাইন বনের ভিতর দিয়ে বিকেল বেলায় শীত শীত ঠাণ্ডায় চিত্রে উঠে দোলমা দিদির কটেজে এক কাপ কফি খেলে জীবনের এক অন্যরকম সার্থকতা খুঁজে পাবেন। আর চিত্রে উঠেও যদি কিছু সময় পান এবং সিজনটা যদি অক্টোবার – নভেম্বার হয় তাহলে পিচ ঢালা রাস্তার কৌণিক শর্টকাট এ মাটির রাস্তার ট্রেইলে খানেকটা উপরে উঠে গিয়ে কাঞ্চনঝঙ্গার চুড়াটা দেখে আসতে পারেন তাহলে এ ব্যাপারে অমি নিশ্চিত যদি সন্ধ্যার আগের হাল্কা নরম গোলাপি আভায় কাঞ্চনের চুড়া দেখেন হয়ত সেখানেই সেই ক্ষণেই আপনার জীবনের অনেক অনেক আবেগ একত্রিত হয়ে যেতে পারে, হয়ত ফোন দিতে চাইবেন প্রিয় কাউকেও কিন্ত মোবাইল নেটওয়ার্কের নিশ্চয়তা নেই, বরং প্রিয় কাউকে সাথে নিয়েই কেন আসেননি?

দোলমা দিদির লজে এবং সামনের যত গুলো টি হাউজ পাবেন সব গুলোতেই মোটামোটি খাবার মেনু হচ্ছে নুডলস স্যুপ, প্যান কেইক, চিয়মিন। গাইরিবাস, কালাপোখরি, সান্দাকফু, রামাম এ সবজি মানে আলু আর পেঁপে বা বাঁধাকপি দিয়ে ঝোল নিরামিষ আর ভাত পাবেন তবে বিশেষ করে সান্দাকফুতে এখন নরম খিচুরি পাওয়া যাচ্ছে আর রামাম এর স্কুলের উপরে যেই কটেজটা আছে সেই টি-হাউজের মহিলার আত্মীয় ছিল বাঙ্গালী, তাই তার কাছে মসুরের ডাল, ঘি, আলুভর্তা ইত্যাদি বাঙ্গালী খাবার পাবেন এবং হয়ত মনে করতে পারেন ( যদি রামাম পর্যন্ত ট্রেকিং করে যান ফালুট হয়ে ) এতদিন ট্রেকিং করে তাই হয় ত ভালো লাগছে খাবার কিন্ত অমি নিশ্চিত এই মহিলার হাতের রান্না যে কোন বাংলাদেশী পরিবারের পাকা রাঁধুনির সাথে কম্পিট করতে পারবে।

ঢাকা থেকে রাত ৮:৩০ এ ছেড়ে গাড়ি লালমনিরহাট-বুড়িমাড়ি বর্ডারে পৌছুবে সকাল ৬:৩০ এর দিকে। কিন্ত কাহিনী হচ্ছে সকাল ৮টার আগে বর্ডার অফিস খোলে না আর বর্ডার অফিস খুল্লেও চেকিং করে আপনি ১১টার আগে বাসে উঠতে পারবেন নাহ যদি আপনি শ্যামলীতে যান আর ভেঙ্গে ভেঙ্গে গেলে লোকাল দালাল ধরে ১০টার আগেই বের হয়ে যেতে পারেন। মনেরাখবেন চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডারেই যেখানে আপনাকে ইন্ডিয়ান কাস্টমস পাসপোর্ট প্রোসেস করবে সেখানে থেকেই ডলার ভাঙ্গিয়ে নিবেন কারন ওখানেই রেট সর্বোচ্চ পাবেন। অবশ্য শ্যামলীর লোকরাই আপনাকে তাদের রেস্টিং কাউন্টার – মানিচেঞ্চারে নিয়ে যাবে যেখানে আপনি নিশ্চিন্তে আপনার ডলার গুলো ভাঙ্গিয়ে নিতে পারেন। মনে রাখবেন – সবগুলো ডলারই রুপি তে ভাঙ্গাবেন কারন শিলিগুড়িতে ১টাকা কম আর দার্জিলিং এ প্রায় ২টাকা কমে আপনাকে ভাঙ্গাতে হবে যদি পরে ভাঙ্গাবেন মনেকরেন। সান্দাকফু ট্র্যাকিং এ শিলিগুড়ি আর দার্জিলিং ছাড়া আর কোথাও মানিচেঞ্চার নেই এবং এই দুটি যায়গাই ট্র্যাকিং রাউট থেকে বহুদূর, সুতরাং আমার পুরাতন উপদেশ – সাথে যা আছে সব ভাঙ্গিয়ে নিন বর্ডার থেকেই – আর ফিরবার সময় বাড়তিগুলো আবার টাকায় কনভার্ট করে নিবেন।

কিছু টিপস – বর্ডারে আপনার ব্যাগ ওরা কেউ খুলেও দেখে না – কিন্ত এর অর্থ এই নয় যে আপনি অবৈধ কিছু নিয়ে যাবেন – যেমন ৬ ইঞ্চির উপরে ফলার ছুরি অথবা লং রেঞ্জের ওয়াকি-টকি ইত্যাদি। ধরা না পড়ার চেষ্টার চাইতে ধরা পড়ার উপাদান না রাখাই ভাল। ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশানের কেউ জিজ্ঞাস করলে বলবেন – দার্জিলিং এ যাচ্ছেন – যখন যেই আপনাকে জিজ্ঞাস করুক বলবেন দার্জিলিং যাচ্ছেন – কোন হোটেল জিজ্ঞেস করলে বলবেন সোনার বাংলা হোটেল। টাকা আর পাসপোর্ট সবসময় – সবসময় – সবসময় সতর্ক ভাবে কোমোড়ের ব্যাগে (থাইল্যান্ডের কতগুলো সুন্দর ওইস্ট ব্যাগ পাওয়া যায় – আমি কিনেছিলাম মোতালিব প্লাজার নিচতলা থেকে – দাম ৪০০/-টাকা ) রাখবেন ।

ট্রেকিং এর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র
ট্রেকিং বুট – এটা ভাড়ি সোলের আরামদায়ক যেকোন বুট হলেই চলবে – এলিফ্যান্ট রোডের ওভার ব্রীজের উত্তর কোনায় নিচে দুটো হকার বসে পুরোনো জুতো নিয়ে – ওখান থেকেও কিনতে পারেন অথবা সার্ক ফোয়ারা ( কাওরান বাজার ) মোড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনার ইদানিং কিছু হকার বসছে – মতিঝিলেও পাবেন- দাম কিন্ত মোটেও ৬০০+ এর বেশী নয় ( আমারটা কিনেছিলাম ৪৫০ দিয়ে ২০১১ তে )। বুট’টা অবশ্যই এক/দুই সাইজ বড় কিনবেন, যাতে ট্রেকিং এ পায়ের পাতা নড়াচড়া করতে পারেন এবং আরামে ট্রেকিং করতে পারেন।

ট্রেকিং ব্যাগ :- ভালো ট্রেকিং ব্যাগ পাবেন পিক ৬৯ – আজিজ সুপার মারকেটে অথবা ভ্রমণ-সঙ্গী’তে (কাঁটাবন), খুব ভালোটা নিবে ১৪০০০টাকা , আমি সাজেস্ট করি ক্যামেল মাউন্টেইন এর ৪০ থেকে ৬০ লিটারের ব্যাগ – আর আমি কিনেছিলাম গুলশান হকার্স মার্কেট থেকে ২৮০০/- টাকা দিয়ে একটি চাইনিজ ব্যাগ – ওজন একটু বেশী হলেও পিছনে দুটো লোহার পাত ছিল যা দীর্ঘ – লম্বা হাইকিংএ ও পিঠে কোন পেইন দ্যায়নি। আর পরবর্তীতে পিক ৬৯ (Peak 69) থেকে ডুইটার ( জানিনা উচ্চারণ ঠিক কিনা ) এর ব্যাগ কিনেছিলাম ১৪৫০০/টকা দিয়ে যা দিয়ে অক্টোবারের ট্যুর দিয়েছিলাম এবং পুরো ট্যুরে মনেই হয় নি পিঠে কিছু ছিল। নাহ প্রশংসা নয় সত্যিই বলছি, ভালো আন্তর্জাতিক মানের ট্রেকিং ব্যাগ পিঠে নিলেই বুঝবেন কি জিনিস।

গরম কাপড় – খুবই চিন্তার বিষয় আপনার জন্য কারন সান্দাকফু’র অপর নাম ঠান্ডাকফু, বরফ পড়ার শীতের কথা চিন্তা করেই আপনার প্রস্তুতি নিতে হবে।  ফুল থার্মাল  ডাউন জ্যাকেট ( বঙ্গবাজার / নিউমার্কেট -> ৮০০ – ১৫০০) ,  দুটো ফুল স্লিভ মোটা T-shirt – দুটো ট্রাউসার – স্পেয়ার আন্ডার ওয়ার – স্পেয়ার মোজা – একটা গামছা – থার্মাল গ্লাভস (হাত মোজা) – একটা নরম-অল-উলের মাফলার ব্যাস। খুব ভালো ফ্লিস / পোলার ফ্লিস পেলে নিয়ে নেবেন – এটি ট্রেকিং এর সময় কাজে না লাগলেও মাঝে মাঝে বিশেষ করে সান্দাকফু এবং ফালুটে উড়াধুড়া ঠাণ্ডায় জ্যাকেটের নিচে পড়লে খুবই কাজে লাগে। এগুলো নিয়ে কিছু দিন বাসায় বা বাসার আসে পাশে ব্যাগে করে নিয়ে ডেমো ট্র্যাকিং করবেন যাতে ঘাড়ের উপরে প্রেশারটা সহ্য হয়ে যায়।

খরচঃ বাংলাদেশের যেখান থেকেই উঠেন আসতে হবে বুড়িমাড়ি যদি ভিসাতে চ্যাংড়াবান্ধা পোর্ট উল্লেখ করে থাকেন আর যদি কেউ কলকাতা হয়ে শিলিগুড়ি আসেন তাহলে ত কথাই নেই, ত এই বুড়িমাড়ি আসার বাস ভাড়া তখন ছিল ৫৫০/- টাকা আর শ্যামলী ডাইরেক্ট শিলিগুড়ি ছিল ১৭০০/-টাকা । চ্যাংড়াবান্ধা থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে মানেভাঞ্জান গেলে খরচ পড়বে ৩৫০০/- রুপির মত (২০১৪ এ ৪২০০/- রুপি নিয়েছে রিজারভেশান )। মানেভাঞ্জানে থাকা খাওয়া খুব বেশি নয় – একটি ডাবল রুম তখন রেখেছিল  ২৫০/- রুপি করে। আর এর পরে থেকে রিম্বিকের আগ পর্যন্ত যেখানই থাকেন খরচ মোটামোটি ১২০/-রুপি থাকা আর খাওয়া ৭০/১০০ রুপির ভিতরেই, খাওয়াটা আসলে নির্ভর করে আপনার নিজের উপরে ।  অমি মনেকরি  ৪জনের গ্রুপে পার হেড ২০০ ডলার ধরে নিলে আপনারা দার্জিলিং সহ ঘুরে আসতে পারবেন সাথে বাংলাদেশে আসার সময় কিছু নিয়েও আসতে পারবেন। বলা বাহুল্য এই খরচের হিসেব ২০১২ সালের।

ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি হয়ে মিরিক
প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিয়ে আমরা ২৫শে মার্চ রাত সাড়ে আঁটটায় কল্যাণপুর থেকে শ্যামলীর বাসে চেপে বসলাম। রাতে বগুড়া স্টপেজে কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সকাল সাতটায় বুড়িমাড়ি বর্ডারে পৌছালাম। বর্ডার চেকপোস্ট আর কাস্টমস অফিস খোলে সকাল আটটায় এবং এর আগে অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তাই ভাবলাম এলাকাটা একটু ঘুরে দেখি। শ্যামলীর রেস্টহাউসের পিছনেই একটি পাথর ভাঙ্গার মেশিন আর তারপরে অবারিত ধানক্ষেত দিগন্ত অবধি। বাস থেকে নামার সময় একজন জাপানিকে দেখলাম লুঙ্গিপড়ে ঘাড়ে রশি দিয়ে বাধা বুট আর পায়ে স্যান্ডেল, জিজ্ঞেস করলাম কোথায় বাড়ি কোথায় যাবেন, বলল দেশ-বিদেশ ভ্রমন করাই তার কাজ এবং ভারত হয়ে সে যাবে নেপাল এবং সেখান থেকে পাকিস্তান, সাথে আছে তার লাল জাপানি পাসপোর্ট আর ক্রেডিট কার্ড, আহ জীবনটা যদি এমন হত তাহলে কত জায়গা ঘুড়ে বেড়াতাম । শ্যামলীর রেস্ট হাউসে কিছু উন্মুক্ত প্লাগ পয়েন্ট আছে যাতে আমাদের মোবাইল গুলো চার্জ করে নিলাম।

 

বুড়িমারী সীমান্তের বাস্ট্যান্ড

বুড়িমারী সীমান্তের বাস্ট্যান্ড

শিলিগুড়ির আশে পাশের পাথুরে নদীগুলো থেকে এখানে পাথর আমদানি করা হয় এই পোর্ট দিয়ে।  এর জন্য বাস কাউন্টারের আশে পাশেই প্রচুর পাথরের ক্রাশার আছে যেগুলোতে আমদানি করা বড় বড় পাথর গুলো ভেঙ্গে ব্যবহারের উপযোগী করে তারপরে দেশের ভিতরে পাঠানো হয়। এই পোর্ট দিয়ে ভুটান থেকে অনেক ফল ও আমদানি করা হয়।

এটা ওটা করে সাড়ে নয়টায় ডাক পড়ল সীমান্ত পার হবার, বিজিবি’র চেকপোস্ট পার হয়ে ভারতীয় ইমিগ্রেশানের হাতে পড়লাম। বিজিবির চেকপোস্টের ব্যাপারে কিছু বলতে বচ্ছে যে যখন আপনি তাদের সেই অন্ধকার বেড়ার ঘরের ভিতর দিয়ে যাবেন তখন তাদের মুখ-চেহারার অভিব্যক্তি ফারমগেইটের যে কোন চার হাত পা ওলা স্বাভাবিক চলতে ফিরতে পারে এমন কিছু লোক বলছে ভাই রাজশাহী থেকে আসছি ভাড়ার জন্য যেতে পারছি না বা কাজ পাচ্ছি না কিছু টাকা দিলে রাতে খেতে পারব – একদম ঠিক এমন – সবার ক্ষেত্রে নয় কিন্ত বেঞ্চে টেবিলের পিছনে বসে থাকা বিজিবির লোক দের চেহারার অভিব্যক্তি তাদের মত মিলে যায়। এরা যেন আপনার পথের পানেই চেয়ে থাকে যে কোন বাংলাদেশী কিছু বাংলা টাকা নিয়ে পার হচ্ছে কি না, তাহলে তারা কিছু কমিশন শব্দে ব্যক্তিগত জরিমানা আদায় করতে পারে। আমাকে ধরে বলল এক হাজার টাকার উপরে পাওয়া গেলেই জরিমানা, অমি বললাম যে বাস ভাড়াই ত ১৭০০/-টাকা (শ্যামলী) ! তখন বলে এসব বুঝি না , অমি কিঞ্চিত তর্ক করার মুডে ছিলাম তাই বললাম ভাই পুরো টাকাটাই বরং রেখে দেন, যাবার সময় আপনার কাছে থেকে নিয়ে যাবো। বলে রাখা ভালো এই চেকপয়েন্ট দিয়েই ফিরে আসার সময় দেখি মোমবাতি জালিয়ে তারা বসে আছে, অমি তখন আবার একটু মজা নিলাম – ভাই একটা চার্জার বাতি ও নাই ? বলে ভাই কিছু টাকা দেন কিনে নেই, অমি বললাম এই নেন বলে ১৫০/- টাকা দিয়ে আসলাম। মানে শ্রেফ আপনাকে দুর্বল – কনফিউজড বা পরিবারের সাথে পেলে এরা চরম মূর্তি ধারণ করে, যা পারে আপনার কাছ থেকে খসিয়ে নিতে উদগ্রীব। তাই আমার উপদেশ – ক্যামেরার চিপায় বা মোবাইলের কাভারের ভিতরে বা ব্যাগের গোপন কোন কিঠুরিতে আপনার ডলার এবং বাড়তি টাকা (BDT) রেখে দিবেন, ভুলেও মোজার বা প্যান্টের পকেটে বার আন্ডার ওয়ারের মাঝে রাখবেন না কারণ একটু কম বয়সীদের ঐ জায়গা গুলোই আগে চেক করে এরা আর পাসপোর্টের এনডোরস্মেন্টের অধিক যেমন আপনি ২০০ ডলার এনডোরস করেছেন আর নিচ্ছেন ৩০০; ত বাকি ১০০ ডলার উপরে উল্ল্যেখিত কোথাও লুকিয়ে রাখবেন কারণ আর কিছুই নয় শ্রেফ ১ / ২০০ টাকা বাঁচানো । সব চেয়ে ভালো হয় মানি ব্যাগ আগেই বের করে সামনে দিয়ে হেঁটে যাবার সময় বলবেন ভাই এই যে ফেরার ভাড়া ১০০০ টাকা ই আছে, যদি বলে আর কিছু ভাঙ্গতি নাই ? বলবেন না ( কারণ ওগুলো সেই জায়গায় ) । তবে ভালো হয় কিছু ভাঙ্গতি ৫০/১০০ টাকা রাখতে কারণ এর উপর দিয়েই পার পেয়ে যাওয়া ভালো না হয় ফুল চেকিং এ পড়তে পারেন।

বিজিবি বর্ডার চেকপয়েন্ট পার হয়েই পড়বেন ভারতীয় দালাল দের খপ্পরে যদি শ্যামলীর যাত্রী না হন, কারণ শ্যামলীর যাত্রীদের সবাইকে ডেকে আগেই পাসপোর্ট পাঠিয়ে দেয়া হয় তাই আপনি শুধু শ্যামলী’র লোক এদিকে আসেন এমন ডাকে সারা দিয়ে অথবা কাউকে বলবেন শ্যামলীর লোক কে তাহলেই দেখিয়ে দেবে কোথায় যেতে হবে। আর শ্যামলী না হলে সুরত ভালো দেখে একজন দালাল কে পছন্দ করে পাসপোর্ট দিয়ে দেবেন – সে আপনাকে তুমি করে ডাকলে ভিরমি খাবেন না – এটাই তাদের চল।

দালালের পিছনে পিছনেই থাকবেন আর যেখানে ব্যাগ রাখতে ববে সেখানেই রাখবেন, চিন্তিত হবার কিছু নেই, এই পর্যন্ত ব্যাগ হারানোর কোন নজির নেই তবে একজনের ব্যাগ অন্যজনের হওয়ার সম্ভাবনা রুখতে ব্যাগের উপরে হাতলে কোন ট্যাগ বা রঙ্গিন টেপ দিয়ে প্যাচ দিতে রাখতে পারেন সনাক্তকরণের জন্য, কারণ ব্যাগ রাখার যায়গায় অনেক ব্যাগ জমা হয় এবং নিয়েও যায় যার যার পাসপোর্টের কাজ হয়ে যায় এবং এটি খুবই সাধারণ ব্যাপার যে আপনার ব্যাগের সাথে অন্যকারো ব্যাগ মিলে যেতেই পারে। আর ট্রেকিং ব্যাকপ্যাক হলে ব্যাকপ্যাক কাভার দিয়ে রাখবেন।

চ্যাংড়াবান্ধা চেকিং পয়েন্টে জানি না এখন ডিজিটাল পাসপোর্ট মেশিন চেকিং এনেছে কি না, যদি না থাকে তাহলে ৩/৪ যায়গায় সিল ছাপ্পড় আর এন্ট্রি করার লাইন থাকবেই আর এই ক্ষেত্রে  দালাল কে এই ব্যাপারে ট্রাস্ট করবেন কারণ এটাই তার ব্যবসা, সে ই আপনাকে বলে দিবে কি করতে হবে কোথায় দাঁড়াবেন কোথায় অপেক্ষা করবেন এবং চেকিং পয়েন্টের ঘরে এক্ট্রি শেষ হলে এক জায়গায় আপনাকে সাক্ষর করতে হবে একটি লগ এ, সে সময় আপনাকে জিজ্ঞেস করা হতে পারে কোথায় যাবেন। ভুলেও সান্দাকফু বা এমন কিছু বলবেন না, মিরিক বা দার্জিলিং বলবেন। বলে রাখা ভালো যে বাংলাদেশী দের সিকিম প্রবেশ করতে দেয়া হয় না তাই এধরনের চিন্তা ও করবেন না, বলা ত দুরের কথা। থাকবেন কোথায় জিজ্ঞেস করলে বলবেন সোনারবাংলা হোটেল। এটি কোন ইন্টারভিউ না, আটকে যাবার কোন কিছু নয় তবে উত্তর হওয়া চাই সাবলীল। সোনারবাংলা হোটেলে বুকিং আছে কিনা তা জানতে চাইলে বলবেন না। আর সবচাইতে কমন প্রশ্ন করে আপনাকে ভড়কে দিতে পারে শুরুতেই, আপনাকে চেনা চেনা লাগছে ! আগে কি কখনো এসেছিলেন ? ইত্যাদি। একদম সত্য কথা বলবেন তাহলে চেহারায় সাবলীলতা থাকবে।

*** আপডেট ২০১৪ – এখন মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট চেকিং বাংলাদেশ ভারত উভয় প্রান্তেই আছে, সাথে ওয়েবক্যামে ছবি তুলে রাখার নিয়ম চালু হয়েছে।

আপনি যদি শ্যামলী তে যান তাহলে পুরো চল্লিশ জন যাত্রীর কাজ শেষ হবার পরে চ্যাংড়াবান্ধা থেকে গাড়ী রওনা দিবে। চেকিং পয়েন্টের কাজ শেষ হবার পরে দেখবেন গাড়ির লোক ই আপনার লাগেজ গাড়ীতে উঠিয়ে নিবে আর ট্রেকিং ব্যাকপ্যাক হলে তা অবশ্যই সাথে রাখবেন, নিজের ট্রেকিং ব্যাগ ঐসব ইটের মত শক্ত মন কে মন ভারী লাগেজের সাথে গাড়ির ট্রাঙ্কে দিয়ে ভর্তা বানাবেন না। যেহেতু এখন পর্যন্ত শ্যামলীই এই রুটে বর্ডার ট্রানজিট করে তাই তাদের একটা দাপট আছে এখানকার প্রশাসনে, শায়মলি’র যাত্রীদের ই সবার আগে পাসপোর্ট গুলো প্রসেস করা হয় কিন্ত সেই চল্লিশজনের টা হতে হতে ১০/১১টা বেজে যেতে পারে, আর শিলিগুড়ি থেকে উল্টো ছাড়ার সময় হচ্ছে ২টা, তাই এদের আসলে তেমন কিছু তাড়া থাকে না।

যাই হোক ট্রেকিং এর ধারা বর্ণনায় ফিরে আসি, প্রায় দুটোর দিকে শিলিগুড়ি পৌছুলাম, পৌছেই আমরা মানেভাঞ্জান যাবার উপায় খুজতে থাকলাম। বাংলাদেশ থেকে দেখলাম মোটামোটি সবাই নয়া দম্পতি, অথবা পুরো পরিবার এমন গ্রুপ ই বেশি আসে এখানে এবং এসেই দেখি সিস্টেম করে দার্জিলিং এর যাবার জন্য গাড়ী ভাড়া করে চলে যায়।

সেন্ট্রাল প্লাজা, শিলিগুড়ি

সেন্ট্রাল প্লাজা, শিলিগুড়ি

আমরা এদিক ওদিক খুঁজতে থাকলাম দেখি কিছু পাই কিনা, এমন সময় একটা ছেলে এসে আমাদের দিলিপ দা’র সাথে পরিচয় করিয়েদিল, দিলিপ দা আমাদের বললেন মানেভাঞ্জানের উদ্দেশ্যে শেষ গাড়ি ছাড়ে ১২টায় এবং ভাড়া প্রায় ২০০রুপি প্রতি জন এবং এতেকরে যেতে হলে শিলিগুড়ি তে থেকে পরের দিন যেতে হবে। আমাদের কোন ইচ্ছা ছিলনা শিলিগুড়িতে থাকার, তাই দিলিপ’দা একটি টাটা সুমো গাড়ি রিজার্ভ করে নিলাম যার ভাড়া তিনি রাখলেন ২৫০০/- রুপি। কোথায় দুপুরের খাবার খাব জানতে চাওয়ায় তিনি আমাদের পরামর্শ দিলেন যেখানে দাড়িয়ে আছি অর্থাৎ সেন্ট্রাল প্লাজার বিপরীতে ঢাকা হোটেল নামে একটি রেস্টুরেন্ট আছে যাতে খুব সস্তায় সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়। কিন্ত আমাদের সাথে বিশেষ একজন থাকার কারনে সেন্ট্রাল প্লাজাতেই খেয়ে নিলাম, সুস্বাদু বলছি এজন্য যে ফিরে আসার সময় খেয়েছিলাম। আমরা খেয়েদেয়ে এসে দেখলাম আমাদের জন্য একটি টয়োটা ফোর হুইলার সিডান দাড়িয়ে আছে এবং কায়দা করে দিলিপ’দা এটার জন্য আরো অতিরিক্ত ২০০ রুপি বাগিয়ে নিল।

অবশেষে আমরা দুপুর আড়াইটার দিকে রওনা দিলাম মানেভাঞ্জানের উদ্দেশ্যে, সেদিন ছিল ২৬শে মার্চ। শিলিগুড়ি’র রাস্তা ধরে কিছুদুর যাবার পরে আমরা একটি মিলিটারী এলাকার ভিতর দিয়ে চললাম। এটি সম্ভবত শিলিগুড়ির ক্যান্টনমেন্ট কারণ অমি নিজে প্রায় ২০ বছর ক্যান্টনমেন্টের ভিতরেই থেকেছি, রেজিমেন্ট বেঙ্গল, ইউনিট, কোর, সিগন্যাল, ব্রিগেড শব্দ আর মারকিং এর সাথে অমি খুবই পরিচিত। এই রাস্তার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কিছুদূর পর্যন্ত রাস্তাটা পুরো গহিন এক শাল বনের ভিতর দিয়ে চলে গিয়েছে, মাটিতে শাল গাছের পাতা পড়ে আছে আর চারিদিন আবছা আলো আধারিতে ঢাকা, ভর দুপুরেও এবং কেমন জানি উদাস উদাস করে দেবার মত। ক্যান্টনমেন্ট পার হলেই আছে একটি স্টিলের ব্রিজ যাকে আমরা সাধারণত বাংলাদেশে বেইলি ব্রিজ বলি, ব্রিজটার প্রশস্থতা শুদু মাত্র একটি গাড়ী যাবার জন্য যথেষ্ট তাই দেখা যায় একজন আর্মি ট্রাফিক কন্ট্রোলার দাড়িয়ে আছেন সিগন্যাল নিয়ে, কিছু গাড়ী ওপাড় থেকে যেতে দিয়ে তারপরে কিছু গাড়ী এপার থেকে। শুনতে গেলে জ্যামের কথা মনে হলেও আসলে তেমন বেশি গাড়ী’র প্রেশার নেই এদিকে তাই জ্যাম লাগার মত কিছু হয় না বা অমি দেখিনি।

প্রথমে আমরা যাব মিরিক তারপরে শুকিয়াপোখারী এর পর মানেভাঞ্জান। এখানে দেখলাম পাথুরে নদী থেকে ট্রাকের পর ট্রাক পাথর সংগ্রহ করছে, বাংলাদেশে যেমন বালু সংগ্রহ করে। আমরা একটু একটু করে উচ্চতায় আরোহণ করছি এবং আমি নিজের ভিতরে এক ধরনের অস্বস্তিবোধের উপলব্ধি করছি – কিছুটা বমি বমি, এখানে বলে রাখা ভাল যে উচ্চতা আরোহণের ক্ষেত্রে কারো যদি একবার বমি হয় তাহলে সেটা তার জন্য ‘রেড কার্ড’ অর্থাৎ এর পর থেকে তাকে নেমে যেতেই হবে। আমাদের নেপালী ড্রাইভার বেশ জোড়েই গাড়ি চালাচ্ছে এবং পাহাড়ী বাঁক গুলো ঘোরার সময় একটা রোমাঞ্চকর অনিভুতি হচ্ছিল।

মিরিক লেইক

মিরিক লেইক

আমরা মিরিকে ১৫/২০ মিনিট থেমেছিলাম এবং আমার মনে হল মিরিকে আমার আর একবার আসতেই হবে কারন জায়গাটা খুব খুবই সুন্দর। মিরিকে আসার কিছু আগে থেকেই ঠাণ্ডাটা খুব জাঁকিয়ে বসা শুরু করেছিল, তাই মিরিকে নেমেই থারমাল গিয়ার পড়ে নিলাম। মিরিকে দেখার অনেক কিছু আছে কিন্তু সময় সল্পতা ছিল আর আমাদের নেপালি ড্রাইভার বার আব্র তাড়া দিচ্ছিল যে মানেভাঞ্জান থেকে তার একা একা আসতে হবে তাই তিনি বেশী রাত করতে চাচ্ছিলেন নাহ। মিরিকের মাঠ ঘুরে ঘুরে কিছু ছবি তুল্লাম, এক কোনায় দেখলাম কিছু বৌদ্ধ পুরহিত জড়ো হয়ে বসে বসে কি যেন করছে, আমি ছবি তুলতে গিয়েও বুঝতে পারলাম তোলা ঠিক না। মিরিকে একটি খুব সুন্দর লেক আছে তার ওপারে একটা বনভুমি, অনেকেই দেখলাম গাড়ি রিজার্ভ করে বেরাতে এসেছে এখানে – দেখে অধিকাংশই কলকাতার অধিবাসী মনে হল। আসলে আমরা সচরাচর পাইনের বন দেখি না, আর দেখি বিভিন্ন সিনেমায় এবং ছবিতে তাই এখানে আসলে আপনার প্রথম অনুভূতিটা খুবই রোমাঞ্চকর হবে। লেকের পাশে পাইনের বনের পাহাড় – পর্বত উঠে গিয়েছে উপরে আর বিকেলের রোদ আসলে ত কথাই নেই – আপনি কবি হয়ে যেতে বাধ্য এমন কি আপনার মাঝে বিন্দুমাত্র সাহিত্যের আদিখ্যেতা না থাকলেও। আবার নয়ত মনে হতে পারে লেকের কোনায় দাড়িয়ে ঠায় পর্বতের ভ্যালির দিকে তাকিয়ে থাকি। আসলে একটি কৃত্রিম লেক – পর্বতের পাইনের বনভূমি আর একটি মাঠ মাঝখানে একটি ব্রিজ কিছুই নয় কিন্ত আপনার ভিতরে যদি বিন্দু মাত্র প্রকৃতির প্রেম থাকে তাহলে আপনি জানবেন এই রকম দৃশ্যই যেন ভুপেন হাজারিকা-নচিকেতা-অঞ্জন-সুমনের গানে পেয়েছিলেন।

গুগল ম্যাপে মিরিক লেইকের অবস্থান

গাড়ির কাছে ফিরে এসে দেখি নেপালিরা চা এর পশরা বানিয়ে রেখেছে এবং লোভ দেখিয়ে চা বানাচ্ছে বিভিন্ন মশল্লা দিয়ে। ত খেলাম এক কাপ চা – খুব আহামরি কিছু মনে হল না তবে ফ্রেশ চা পাতির একটি গন্ধ ছিল বৈকি আর আদা লবঙ্গ এইগুলো দিয়ে আমরা খেয়ে অভ্যস্ত। চা খেয়ে দেখি এক ঝালমুড়ি ওয়ালা দাড়িয়ে আছেন তার বিশাল সব আইটেম নিয়ে, মনে মনে চিন্তা করছি এত আইটেম দিয়ে ঝাল মুড়ি বানালে ত খবর আছে, আসলে তিনি অনেক কিছুই বিক্রি করেন সাথে ঝাল মুড়ি মেইন কোর্স। তার কানে দেখলাম সাদা হেড ফোন, অমি তখনো ভাবতাম সাদা হেড ফোন শুধু আইফোনেরই থাকে, হাল্কা ভিরমি ও খেয়েছিলাম। নাহ ব্যাটা নকিয়াই ব্যবহার করে। এখানকার ঝালমুড়ি ১০রুপি আর এর ভিতরে কি কি যে দিবে রঙ হয়ে যাবে গোলাপি ধরনের কিন্ত খেতে খুবই সুস্বাদু। গাড়িতে এই মুড়ি খাচ্ছি আর খাচ্ছি কিন্ত শেষ হয় না ।

এখান থেকে আমরা ধীরে ধীরে আরো উপরে উঠে চা বাগানের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি এবং শীত’টাও তীব্র হচ্ছে। বলে রাখা ভালো যে মিরিক এর আগে এবং পরে অনেক গুলো শত বছরের পুরনো চা এর বাগান দেখলাম এবং চা বাগানের সবুজের সাথে পাহাড়ি ভ্যালিতে সূর্যের আলো ঠিকরে পড়া আর আলো আধারি ছায়া আর উজ্জ্বল আলোর খেলা দেখে মনে হয়েছিল এই দৃশ্য HDR করেও কোন ক্যামেরা তে আনা সম্ভব নয়, এ শুধু মধুর এক স্মৃতি যা সময়ে আর সঙ্গীতে চোখের সামনে ভেসে উঠবে আর শুধু কেবল মাত্র পুনরায় এখান দিয়ে না গেলে এর স্বাদ কখনই পাওয়া যাবে না … শুধু এতটুকুই বলে যায় যে স্বর্গীয় । ঠিক এই চা বাগানের ভ্যালির উঁচু নিচু পাহাড়ি ঢাল বেয়ে উঠে যাবার সময়টুকু গাড়িতে যেই গান গুলো বাজছিল সেগুলো ও আপনাকে নিয়ে যাবে সেই দৃশ্যে বার বার । অবশেষে সন্ধ্যা নামার সাথেই আমরা মানেভাঞ্জান পৌছুলাম, বলাবাহুল্য মানেভাঞ্জানের উচ্চতা ২১৫০ মিটার বা ৭০৫৪ ফিট আর শিলিগুড়ি’র উচ্চতা ছিল ১২২মিটার / ৪০০ ফিট – অর্থাৎ প্রথম দফাতেই আমরা প্রায় ২০২৮মিটার বা ৬৬৫৪ ফিট উঠে এসেছি ‘সিডানে করে এবং পথে আমার বমি্বমি আসাটাই স্বাভাবিক ছিল কারন এর আগে আমি কখনও এত উচ্চতায় উঠিনি। আসলে ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে খুব দ্রুত গাড়ি উপরের দিকে টান দিলে একটু একটু বমি বমি লাগে কিন্ত যখন চা বাগানের পাহাড়ি ভ্যালি দেখি আর গানের তাল গুলো মিলে যায় তখন সেই বমি বমি ভাব উধাও হয়ে যায় … হতে পারে অনেকদিন পরে সিডানে উঠার কারণে অথবা নেপালী ব্যাটার আউলা টানের কারণে এমন হয়েছিল।

মানেভাঞ্জান
আমরা মানেভাঞ্জানের ‘জীবন চিত্রে’র হোটেল এক্সোটিকা খুঁজে ওখানে গিয়ে উঠলাম। যেহেতু একদম সন্ধ্যায় পৌঁছেছি তাই গাড়ি থেকে কয়েকজন কে জিজ্ঞেস করে করে একদম হোটেল এক্সোটিকার নিচেই গাড়ী থামালাম, গাড়ী থেকে বের হতেই দেখি একটি দোকানের উপরে হোটেলের সাইনবোর্ড আর দোকানের পাশ দিয়েই সিড়ি উঠে গিয়েছে।

গুগল ম্যাপে মানেভাঞ্জান এর হোটেল এক্সটিকা’র অবস্থান

এখানে ‘জীবন চিত্রে’র ব্যাপারে কিছু না বল্লেই নয়, সান্দাকফু ট্রেকিং এর আগে ইন্টারনেট সার্চ করে যত ব্লগ আর ফোরাম দেখলাম সবাই এই লোকটার কাছে যাবার পরামর্শ দিয়েছে, কারণটা একটু পরেই বুঝতে পারলাম। একে উচ্চতা’র বমিবমি আর প্রচন্ড ঠান্ডা কিন্ত জীবন দাদা’র আন্তরিকতায় সবকিছু ভুলে গেলাম, শুধু জীবন দাদা না তার সহধর্মিনী আমাদের এমন আতিথেয়তা দিল যেন মনেহল আমার কোন খালা’র বাসায় এসেছি বেড়াতে। সত্যি কথা বলতে এই লোকটার সাথে কথা বলে মনে হয়েছিল অমি যেন বান্দারবানের কোন টি হাউজে এসেছি থাকতে। লোকটা আমাদের নাম ধাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করে বললেন তিনি নাকি গতবছর ঢাকা ছিয়েছিলেন এবং মিরপুরের জ্যাম নাকি তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছিল আর নিউমার্কেটের কথাও বললেন। কথা বলতে বলতে জীবন দার হোটেল এক্সটিকার লগ বুকটা উলটাতে থাকলাম … দেখি কোন বাংলাদেশী পাই নাকি । প্রথম পেলাম হাসিব সুলতান যার আমাদের সাথেই যাবার কথা ছিল কিন্ত কি এক প্যাচে পরে তার আগেই চলে যেতে হয়েছিল । হোটেলের দেখি এক বিশাল লগ বুক আছে , অনেকটা আমাদের আগেকার ম্যানুয়াল ইলেকট্রিক বিলের লগবুকের মত।

জীবন চিত্রে

জীবন চিত্রে

কথা হচ্ছিল জীবন দার সাথে ট্রেকিং প্ল্যান নিয়ে, উনি বল্লেন উনিই আমাদের সব কিছু আয়োজন করে দিবেন, গাইড ম্যাপ ট্র্যাকিং রাউট ইত্যাদি। জিজ্ঞেস করলাম এত ঠান্ডা কেন, উনি বল্লেন এটা তো আমাদের সামার সিজন, শুনে হতহম্ব হয়ে আর কিছু বল্লাম না, মানেভাঞ্জানের রাস্তায় একটু ঘুড়াঘুড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলাম। একটা ফার্মেসিতে গিয়ে বমির ঔষধ চাইলাম, বমি শব্দটা উচ্চারণ করা মাত্রই ফার্মেসীওয়ালার চেহারার পরিবর্তনটা লক্ষ করলাম, সাথে সাথে বল্লাম যে আমার ডিজেলের ধুয়ার এলার্জি আছে, শিলিগুড়ি থেকে আসার সময় খারাপ লেগেছিল তাই একটা খেয়ে দেখি ভালো লাগে কিনা, মনে মনে ভয়ই পেয়ে গেলাম; কিনা-কি সন্দেহ করে আমাকে যদি আর উপরে উঠতে না দেয় :)। ঔষধ কিনে আশে পাশে চোখ বুলিয়ে দেখলাম একটি উঁচু মন্দির আছে যেখান থেকে একটানা ভক্তির গান বেজে আসছে, হিন্দি বুঝি না কিন্ত গানের সুর গুলো খারাপ লাগছিল না … কেমন যেনও পাহাড়ি মায়া মায়া লাগিয়ে দেবার মত। একটি ভ্যারাইটিস দোকানে গিয়ে থার্মাল ডাউন জ্যাকেট দেখলাম দাম মাত্র ৬০০ রূপি ! আগে জানলে ! খুব ঠাণ্ডা লাগছিল তাই উলের গ্লাভস কিনলাম, কি ভেবে দুই জোড়া কিনলাম – রুবেল ভাইও তাই করল। পরে বুঝেছিলাম কি ভালো যে করেছি দুই জোড়া কিনে, সান্দাকফুর ট্রেইলে দুটি গ্লাভস আপনাকে একসাথে পড়তেই হবে যদি সেটি সাধারণ উলের গ্লাভস ও হয় … কারণ ?! কারণ তীব্র ঠাণ্ডা । এমন কি পারলে যদি সম্ভব তিনটা একসাথে পড়তাম। আসলে এখানে দরকার ফ্লিসের গ্লাভস, কিন্ত কোথায় পাব, তাই আগুলো ডাবল করেই ব্যবহার করা। এই সেই ঘুরাঘুরি করে হোটেলের ঠিক নিজেই দেখলাম ড্রাই ফুডের দোকান। কিছু নতুন চকোলেট দেখলাম, অমি আর রুবেল ভাই কয়েকটা ট্রায়াল টেস্ট করে নিলাম আর ট্যুরের জন্য ইচ্ছেমত চকোলেট ও বিভিন্ন রকমের বাদাম নিলাম সাথে বিস্কুট । একদম ঠেসে রসদ কিনে হোটেলের সিঁড়ি ধরলাম।

দিদি আমাদের খেতে ডাকলেন, গিয়ে একটা মজার জিনিস দেখলাম, খাবার শুরুতেই দুটো করে ডাল-কালোজিরা দিয়ে ভাজা পাপড় (আমার খুবই খুবই পছন্দের) এবং এটাই নাকি এই এলাকার খাবার রীতি, এর পরে সান্দাকফু হয়ে দার্জিলিং পর্যন্ত যত জায়গা্য খেয়েছি সব জায়গায় খাবার আগে দুটো পাপড় ছিল। এর সাথে তিনি দিলেন নিরামিষ ডিম ভুনা আর ডাল সাথে ভাত। প্রচণ্ড শীতে দুজনই টায়ার্ড আর ক্ষুধার্ত ছিলাম, তবে অমি আবার খুব বেশি ঠাণ্ডায় খাওয়ার রুচি পাইনা তার পরেও গরম গরম ভাতের সাথে খেতে বেস ভালই লাগছিল সাথে দাদা আর দিদির ট্রেকিং এর গল্প খাওয়াটাকে অনেকটা মোহময় করে তুলেছিল, মনেই হচ্ছিল না যে আমরা তাদের বোর্ডার, মনে হচ্ছিল আমরা তাদের লঙ লস্ট রিলেটিভ। খাওয়া শেষে এক কাপ চা ও পেলাম … আহ আর কি লাগে। বিদায় নিয়ে আমাদের রুমে চলে এলাম, এসে কিছু ভিডিও করার চেষ্টা করলাম আর তখন ই ব্যাপারটা খেয়াল করলাম, আমার কোডাক ডিজিক্যাম টা চালু আছে কিন্ত সেন্সরের লাইট আইউটপুট একদম কম, শুধু চেহারাটুকু দেখা যায় আর মজার ব্যাপার হচ্ছে রুবেল ভাই এর DSLR ত অন্ ই হয় না ! জীবনে প্রথম ঠাণ্ডার এমন ইমপ্যাক্টে দু জন ই রোমাঞ্চিত হয়ে সেই DIGI ক্যাম দিয়েই কিছু ভিডিও করতে লাগলাম।

হোটেল এক্সটিকার বারান্দা থেকে দেখা এপ্রিল ২০১২ এর মানেভাঞ্জানের সকাল

হোটেল এক্সটিকার বারান্দা থেকে দেখা এপ্রিল ২০১২ এর মানেভাঞ্জানের সকাল

খুব ভোরেই ঘুম ভাংলো, সেই মন্দির থেকে ভক্তির গান গুলো বেশ জোরে জোরে বাজছে , গান গুলো শুনতে অনেকটা গজলের মত, শুনতে ভালই লাগে। বিছানা থেকে উঠে খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি করে ঠাণ্ডা টা এডজাস্ট করার চেষ্টায় পায়চারি শুরু করলাম। করিডোরের জানালা খোলা মাত্রই টের পেলাম কোথায় আছি … ঠাণ্ডার এমন এক হিমেল বাতাস ধাক্কা দিল যে সর্বাঙ্গ ত বটেই সর্বচ্চ ঠাণ্ডার সহ্যের রেকর্ড ভেঙ্গে চুরমার হয়ে মোবাইলের ভাইব্রেশনের মত কাপতে থাকলাম … এক মিনিটেই দাঁত কপাটি বাড়ি লাগা শুরু হল অথচ দেখি সূর্য উঠেছে । অমি পুরাই হতাশ ! এ কি মস্করা !? সূর্য থাকতে এত ঠাণ্ডা ? তবে ৫ মিনিট পরেই দেখি আমার দেহ ঠাণ্ডাটাকে এডজাস্ট করে নিচ্ছে, এখন আর সেই কাঁপুনিটা নেই ।

একটু পরে জীবন দাদা এসে বল্লেন গরম পানি আছে গোসল করব কিনা, কথাটা শুনে প্রথমে মুখ ফসকে বলতে চেয়েছিলাম মেরে ফেলবেন নাকি? পরে নিজেকে বোঝালাম যে ট্রেকিং এর শুরুতে গোসলের কোন বিকল্প নেই কারণ একটু পরেই উনার ভাষ্যমতে গরমে জামা কাপর খুলতে শুরু করব কারণ হাঁটলে ঠাণ্ডাটা চলে যায়। গোসল খানায় গিয়ে বুঝলাম গরম পানিটা আসলে নরমাল কারন যেখানে স্বাভাবিক টেম্পারেচার ১০/১২ ডিগ্রি সেখানে ২৬ডিগ্রি’ই গরম পানি, অবশ্য শীত বেশী হবার কারনে পানি তারাতারিই ঠান্ডা হয়ে যায়। গোসলের বর্ণনা আর দিতে চাই না শুধু এইটুকু বলি যে মাথায় পানি ঢালার আগে আমরা সাধারণত জোড়ে কোন শব্দ করে শুরু করি, আর এখানে গা এর জামা খোলার সাথে সাথে ঠাণ্ডায় তব্দা হয়ে যাবার জোগাড়, মাথায় পানি ঢালার আগে বেশ কয়েকবার উচ্চস্বরে আল্লাহর জিকির করেছিলাম এটুকু মনে আছে।

আমাদের জন্য যে গাইড (সান্দাকফু ট্রেকিং গাইড) নির্ধারণ করেছেন জিবন’দা তার নাম ‘নিমাহ’ বয়স ৪২ এবং সান্দাকফু ফালুট ট্রেকিং এর ৬বার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সকালে জীবন দাদা’র ম্যাজিক দেখলাম, উনি হাতে হাতে একটি ম্যাপ একে দিলেন আমাদের সেখানে প্রতিটি শর্টকাটের চিহ্নিত করা এবং সঠিক দূরত্ব পরিমাপ করে দেয়া, একটা নিখুত মাষ্টার ম্যাপ, কোন সম্ভাব্য নয়, একদম অস্তিত্ব আছে সবগুলো ট্রেক উনি একে দিলেন দুরত্ব সহকারে। আমাদের ট্রেকিং প্ল্যান ছিল মানেভাঞ্জান -> চিত্রে -> মেঘমা -> তংলু -> তুমলিং ->গাইরিবাস -> কালাপোখারী -> সান্দাকফু -> ফালুট ->রামাম -> রিম্বিক -> দার্জিলিং // উনি আমাদের মেঘমা থেকে গুরাসাই হয়ে তুমলিং যাবার পরামর্শ দিলেন কারন আকাশে পর্বতে অনেক কুয়াশা তাই তংলু থেকে কোনকিছু দেখার আশা নেই এবং রিম্বিক থেকে দারজিলিং যাবার রাস্তায় একটি ব্রিজ ভেঙ্গে গিয়েছে তাই ফিরে যাবার সময় এই মানেভাঞ্জান হয়েই যেতে হবে। উনাকে একটি লিভিং ব্রিদিং ট্রেকিং এনসাইক্লোপিডিয়া মেনে নিয়ে আমরা এস.এস.বি চেকপোস্টে আমাদের পাসপোর্ট নাম ইত্যাদি লিখে অনুমতি নিয়ে রওনা দিলাম আমাদের প্রথম ডেসটিনেশান ‘চিত্রে’র উদ্দেশ্যে। ভালো কথা যাবার আগে উনি আমাদের নাস্তা খাওয়াতে ভুলেন নি।

চিত্রে
চিত্রে হচ্ছে ২৫০০মিটার / ৮২০২ ফিট উঁচু যা মানেভাঞ্জান থেকে প্রায় ৪০০মিটার / ১৩১২ ফিট উপরে এবং পুরোটাই পিচঢালা গাড়ির রাস্তা এঁকে-বেঁকে উপরে উঠে গিয়েছে। হাটিহাটি পা পা করে উঠা শুরু করলাম, এক জায়গায় একটা মাইলস্টোনে লিখা আছে সান্দাকফু ৩১ কিলোমিটার, রাস্তাটা সমতল হলে কিছু বলার ছিল না কিন্ত এখান থেকে ঠিক যেমন ৩১ কিলো ঠিক তেমনি প্রায় আরো ১৬০০ মিটার উঁচুতেও। যাহক সেই চিন্তা বাদ দিয়ে আসে পাশের পাহাড়ি প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে হাটা দিলাম। চিত্রে যাবার রাস্তাটা অসম্ভব সুন্দর, পিচে ঢালা রাস্তা উঠে গিয়েছে পাইন বনের মাঝখান দিয়ে, একদম হলিউডের কোন ছবির মতো।

গুগল ম্যাপে চিত্রের অবস্থান

হাঁটছি ছবি তুলছি আর ডানে বামে তাকিয়ে সুবাহানল্লাহ পড়ে পড়ে উঠে যাচ্ছি। ধিরে ধিরে কিছুদুর উঠার পরে নিচের দিকে একটু তাকিয়ে দেখলাম মানেভাঞ্জান কে কত নিচে ফেলে উপরে উঠে এসেছি ( এটা এক প্রকার প্রশান্তি )। রওনা দেবার আগে অবশ্য আমাদের সিঙ্গারিলা পার্কের টিকিট কেতে নিতে হয়েছিল, বিদেশিদের জন্য টিকিট ২০০ রূপি আর ক্যামেরা প্রতি ১০০ রূপি। এই টিকিট কাউন্টার টা সেই মাইলস্টোনের ঠিক উলটা দিকে।

মানেভাঞ্জান থেকে চিত্রে উঠার রাস্তা, ছবিতে আমাদের গাইড নিমা আর আমার পার্টনার রুবেল ভাই হেঁটে যাচ্ছে

মানেভাঞ্জান থেকে চিত্রে উঠার রাস্তা, ছবিতে আমাদের গাইড নিমা আর আমার পার্টনার রুবেল ভাই হেঁটে যাচ্ছে

চিত্রে যাবার রাস্তাটা পিচে ঢালা, বলে রাখা ভালো সেই শিলিগুড়ি থেকে মিরিক হয়ে মানেভাঞ্জান এবং এই রাস্তা গুলো সেই ব্রিটিশ আমলে করা চা ব্যবসার জন্য, পিচ ঢালা পথে ট্রেকিং করতে করতে টের পেলাম আমরা যেন কোন এক মুভি সেটের ভিতরে ট্রেকিং করছি । রাস্তার দু দিক থেকে ঘন লম্বা উঁচু পাইন গাছ গুলো যেন স্বপ্নের এক সিঁড়ি বেয়ে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। এই অনুভূতি লিখে প্রকাশের যোগ্যতা আমার নেই এবং হবেও না। এ শুধু হেঁটে হেঁটে উপরে উঠে যাওয়া আর কল্পনা করা যে অমি যেন কল্পনার বাস্তবে চলছি, এই সৌন্দর্য বাস্তবতাকে কল্পনাতে নিয়ে যায়।

চিত্রে পৌছে দেখলাম এখানে একটি বিড়াট বৌদ্ধ মনেস্ট্রি রয়েছে – মনেস্ট্রির ভিতর দিয়ে আমরা একটা ট্রেকার্স লজে গিয়ে উঠলাম, এখানকার ট্রেকার্স লজ বা টি-হাউজ গুলো একাধারে রেস্ট হাউজ, ট্রেকার্স লজ এবং রেস্টুরেন্ট – এখানকার মজার বিষয়টা হচ্ছে আমরা যখন খাবার অর্ডার দিব ঠিক তখনই রান্না শুরু হবে এবং একদম ফ্রেশ খাবার পাওয়া যায়। এখানে দোলমা দিদি’র লজে আমরা কফি খেলাম, এখানেই পরিচয় হল দুই জার্মান ভদ্রলোকের সাথে, দুজনের বয়স আনুমানিক আমি ধরেছিলাম ৭০ এর কাছাকাছি – পরবর্তিতে ‘মেঘমা’তে গিয়ে পাসপোর্ট দেখানোর সময় একজন বলল তার জন্ম ১৯৩৩সালে – শুনে এস.এস.বি.’র দায়ীত্বরত কর্মকর্তারও চোখ কপালে।

চিত্রের একমাত্র টি -হাউজ হক'স নেস্ট

চিত্রের একমাত্র টি -হাউজ হক’স নেস্ট

চারটি টেবিল আর চেয়ার দিয়ে গড়া দোলমা দিদির রেস্টুরেন্টে প্রথম ব্রেক নিলাম। অর্ডার দিলাম কফির আর নিজেদের ব্যাগ থেকে মাউন্টেইন ডিউ এ চুমুক দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হারিয়ে যাচ্ছি। কফি আসার পরে ফটোসেশান শুরু করলাম কফি দিয়ে আর পরট্রেইট ত আছেই। যাবার সময় মনে হচ্ছিল থেকে যাই না আজ সারাটা দিন এখানে, এই রেস্টুরেন্টে এই পাহাড়ি হিন্দি গানের সুরে আর পাহাড়ি তীব্র বাতাসের ঝামটা আর সূর্যের কিরণে জানালার শার্সির কাছে বসে এক কাপ কফি নিয়ে … ইচ্ছে আছে এমন একটি ট্যুর দিতে যাতে পুরোটা দিন এক একটি টি-হাউজে কাটিয়ে দিতে পারি। হয়ত পারব কোন এক সময়

 দোলমা দিদি'র কিচেনের ইয়াক এর দুধের কফি


দোলমা দিদি’র কিচেনের ইয়াক এর দুধের কফি

লামেধুরা
চিত্রে থেকে আমি আমার পার্টনার রুবেল ভাই আর সেই দুই জার্মান মিলে আমাদের পরবর্তি গন্তব্য লামেধুরা’র দিকে চল্লাম, যাবার পথে আমরা একটি শর্টকাট ফলো করলাম। শর্টকাট টা আসলে সরু একটি রাস্তা গাড়ির রাস্তার কৌণিক দূরত্ব কে আড়াআড়ি ভাবে ক্রস করে চলা। এখানেই আমার একটু কষ্ট শুরু হল, ২৬০০মিটারের বেশি উপরে বাতাসের অক্সিজেন পরিমান হয়ত একটু কম, বুক ভরে শ্বাষ নিচ্ছি কিন্ত ফুসফুস ভরছেনা, একটু বমিবমি আর দুর্বলও লাগছিল – একদম পার্ফেক্ট অলটিচিউড সিকনেস এর লক্ষণ – মনদিয়ে শরীরের উপরে জোড় খাটালাম, প্রিয় গান গুলো মোবাইলে লাউড স্পিকারে দিয়ে ছেড়ে দিলাম আর আস্তে আস্তে একটু একটু করে উঠতে থাকলাম, লামেধুরার একটু আগে গিয়ে রুবেলভাই আর জার্মান দের পেলাম, ওরা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।

গুগল ম্যাপে লামেধুরা’র অবস্থান

এর পর অবশ্য সিকনেসটা চলেগিয়েছিল এবং সাবলীল ভাবেই ট্রেকিং করেছি। এখানে কিছু কথা শেয়ার করতে চাই যারা যারা নতুন তাদের জ্ঞাতার্থে … এমন অবস্থায় কোনভাবেই বসে পড়া যাবে না – বসে পড়লেন ত আপনি উপরে উঠার শক্তি হারিয়ে ফেললেন। দাড়িয়ে থেকেই শ্বাস প্রশ্বাস এর ব্যাপারটা মোকাবিলা / এডজাস্ট করুন নাহলে বসে পড়লে আপনি হয়ত দুর্বল হয়ে শুয়েও পড়তে পারেন এবং এর পরে হয় ত আর উঠতেই পারবেন নাহ। জোর করে খুব ঘন ঘন শ্বাস নেবার চেষ্টা করবেন না – আপনার দেহও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্বাস গ্রহণ দ্রুত করে নিবে এবং আপনি ধীরে ধীরে খুব দ্রুত শ্বাস নিতে থাকবেন আর কখনই দেহের উপরে পা এর উপরে জোর খাটাবেন না – দশ কদম গিয়ে একটু রিল্যাক্স করে আবার দশ কদম করে উঠুন ।

লামেধুরা যাবার রাস্তাতে অনেক গুলো শর্টকাট দেখলাম, গুগল ম্যাপে এই রাস্তাগুলোকে বিপদজনক আখ্যায়িত করা হয়েছে লাল দাগ দিয়ে, কিন্ত হাঁটতে গিয়ে দেখলাম রাস্তার ব্যাস প্রায় ৩ফিট আর রাস্তার উপরিভাগ পাথর দিয়ে বাঁধানো।

লামেধুরা পৌছে দেখলাম আরো এক বিশাল জার্মান ট্রেকিং টিম এবং একটা সুইডিশ টিমও রয়েছে। আসলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আবার ট্রেকিং এর গরমে খাওয়ার এপাটাইট এত বেশি থাকে না, এমন কি খিদা লাগার বিষয়েও অমি সন্দিহান ছিলাম যে আদৌ কিছু কাহ কি খাবও না কারণ খুদা লাগে নি, কিন্ত গাইডের নির্দেশে আর না করলাম না। এখানে সেই প্যান কেইক আর চিয়মিন পাওয়া যায় লাঞ্চ হিসেবে তবে মোম বললে বানিয়ে দেবে, কিত্ন এত সময় নষ্ট করার কোন মানেই হয় না।

লামেধুরা

লামেধুরা

এখানেই প্রথম টের পেলাম যে হাঁটতে থাকলে একটা পাতলা ফুল স্লিভ করে থাকলেই হয়, ঘামে – শরীরের গরমে চলার পথে ঠাণ্ডাটা এততুকু অনুভব হয় না, কিন্ত যেই মাত্র লামেধুরার ক্যান্টিন লজের সামনে ব্যাকপ্যাক খুলে দাড়ালাম অমনি কনকনে ডিপ ফ্রিজের ঠাণ্ডা জেঁকে ধরল। লজের ভিতরে বসে আমরা অর্ডার দেয়া মাত্র চিয়মিন রাধা শুরু হল এবং ভেজে ভেজে ফ্রাই প্যানে উল্টে পাল্টে খুধা লাগানিয়া গন্ধ লাগিয়ে বসে অপেক্ষা করছি খাবারের। খাবার টেবিলে হরেক রকমের সস দেয়া আছে । প্রায় ১৫ মিনিট পরে আসল দুই প্লেট টাটকা চিয়মিন কিন্ত এরা আসলে এক প্লেট বলতে যা দেয় তা দুজন ত অবশ্যই চাইলে তিন জনও খাওয়া যায়। অতিকষ্টে চিয়মিন শেষ করলাম, অতি কষ্টে বলতে দুই তিন বার রেস্ট নিয়ে তার পরে খেতে হয়েছিল। কি ভেবে জানি কফির অর্ডার দিয়েছিলাম, তাই আরও বসে থাকতে হল কফির জন্য। এই ট্রেকে কফি ২০ রুপি আর আদা এবং অন্যান্য মসল্লা দিয়ে দুধ ছাড়া চা ৩ রুপি ( এখন হয়ত বেড়ে গিয়ে থাকতে পারে ) এবং কফি আর চা কম্পেয়ার করলে অমি চা এর পক্ষেই মত দিব কারণ কফিতে কফির পরিমাণ অল্প দুধের পরিমাণ বেশি।

মেঘমা থেকে তুমলিং
মেঘমাঃ ২৬০০ মিটার / ৮৫৩০ ফিট

গুগল ম্যাপে মঘমা’র অবস্থান

লামেধুরা থেকে মেঘমা যাবার রাস্তায় কিছু পায়ে চলা অর্থাৎ ট্রেকিং শর্টকাট আছে, এই শর্টকাট গুলো প্রধান গাড়ি চলার রাস্তাকে ঘিরেই, কিন্ত জিক-স এর কৌণিক দূরত্বটাকে অর্ধেকের বেশি কমিয়ে দেয় আর উচ্চতায়ও একটু খাড়া তাই দুরত্বটা কমলেও কষ্টটা দিয়ে পুষিয়ে যায়! মেঘমা নাম দেয়ার কারনটা মেঘমা এসে বুঝলাম, একেবারে মেঘের ভিতরে আমরা ট্রেকিং করছি এবং ১০ফিট দুরত্বের বেশি কিছু দেখা যাচ্ছে না।

মেঘমা

মেঘমা

মেঘমাতে রাস্তার একপাশে ভারত আর অন্য পাশে নেপাল কিন্ত ব্যবসা করছে নেপালিরাই। মেঘমার বড় একটি লজে ( হয়ত এটিই এক মাত্র ) আমরা কফির অর্ডার দিলাম, বলাবাহুল্য আমরা মানেভাঞ্জান থেকে অনেক চকলেট নিয়ে এসেছিলাম, হল্টেজ পেয়ে আমি এগুলোর শ্রাদ্ধ করা শুরু করলাম, একটি কিটক্যাটের মোড়ক খোলার সাথে সাথেই এক আমেরিকান তরুন বলে উঠল, আমার মেয়ে যদি দেখে তোমার হাতের চকলেট তাহলে কেড়ে নিয়ে যেত’, আমি হেসে বল্লাম আমার কাছে অনেক আছে, আসলেই অনেক চকোলেট বেঁচে গিয়েছিল এবং ট্যুর শেষে সেগুলো গাইড নিমাহ র ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। অল্প কিছুক্ষণ পরেই তার মেয়ে আসল এবং রুবেল ভাই তাদের চোকোলেট দেয়া মাত্রই পিচ্চি মেয়েটা (বয়স আনুমানিক ১৩) আনন্দে লাফিয়ে উঠল। এর মাঝে ঐ দুই জার্মান আবার ম্যাপ নিয়ে বসেছে, আমি একটু জ্ঞান দেবার লোভ সামলাতে না পেরে ওদের এক আধটু গাইড দেয়া শুরু করলাম, এর মাঝে রুবেল ভাই জীবন দাদা’র হাতে আঁকা ম্যাপটা বের করল, আর যায় কোথায়, আশেপাশের সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল, কারন সবার কাছে গুগলের সার্চ করা ম্যাপ যেটায় কোন ডিটেইল নেই, কিন্ত এটায় সব শর্টকাট দেয়া দূরত্ব সহ। এখানে কফি খেয়ে ভাবলাম আশেপাশের কিছু ছবি তুলি, ওমা ক্যামেরায় ফোকাস ই পায় না এমন কুয়াশা , নাকি মেঘ ? টি-হাউজ কটেজের ভিতরে ত গরম লাগেই একটু আবার বাইরে বের হবার জন্য সেই গ্যাকেট গ্লাভস ইত্যাদি পড়ে আমার রওনা দেয়া, কাজটি প্রথমে বিরক্তিকর লাগলেও ট্রেকিং এর সাথে সাথে এর সাথে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।

 

তুমলিং:– ২৬০০ মিটার / ৮৫৩০ ফিট

গুগল ম্যাপে তুমলিং এর অবস্থান

মেঘমা থেকে তুমলিং যাবার দুটো রাস্তা আছে, একটা তংলু হয়ে তুমলিং আর একটা গুরাসাই হয়ে তুমলিং – তংলু’র উচ্চতা ৩০৭০ মিটার এবং কেউ কেউ বলে এখান থেকে কাঞ্চনঝঙ্গা আর এভারেস্ট সান্দাকফু’র চাইতেও নাকি ভালো আর স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্ত যেখানে কুয়াশা আর মেঘে ঢাকা আবহাওয়াতে দশফিট দূরত্বে’র জিনিস দেখতে কষ্ট হয় সেখানে তংলু দিয়ে যাবার কোন মানে হয়না, সর্বোপরি গুরাসাই দিয়ে গেলে ৫/৭ কিলো রাস্তা সেইভ হয়। তবু প্ল্যান রেখেছি আবার যদি কখনো আসি তাহলে ভাল আবহাওয়াতে তংলু হয়েই যাব কারন ইউটিউবে দেখলাম কলকাতার কিছু ট্রেকারস এ রাস্তা দিয়ে গিয়ে খোদ সান্দাকফুর চাইতেও কিছু ভাল ছবি তুলেছে কাঞ্চনঝঙ্গার।

মেঘমা থেকে গুরাসাই যাবার পথে মেঘ এমনভাবে চেপে ধরল যে লেন্সে ফাংগাস পড়ে যাবার ভয়ে আর ক্যামেরা বের করা বন্ধ করে দিলাম, গুরাসাই পার হয়ে তুমলিং এর পথে সেই আমেরিকানের সাথে আবার দেখা, এইবার তার কাছে কিছু জানার চেষ্টা করলাম, তার বৌ হল কলকাতার অরিজিন কিন্ত জন্মসুত্রে আমেরিকান, তাই তার বৌ তার মেয়েকে আর স্বামীকে একপ্রকার নাড়ী’র টানেই এখানে ট্রেকিং করতে নিয়ে এসেছে। মেয়েটা ওর বাপের হাত ধরে হাঁটছিল, আমি চিন্তা করলাম বাংলাদেশের বাপ গুলা কি করে, নিজেরা ত ভ্রমণ করবেই না উল্টা সন্তানদের করতেও দিবে নাহ, আর এদিকে ৮৩বছর বয়সীরাও ট্রেকিং করছে আর আমরা ৩০ পেরুলেই শেষ। তুমলিং টা নিশ্চয়ই অনেক বড় কারণ যত কাছে আসছই ততই মানুষের সারা পাচ্ছি, কিছু স্কুল ড্রেস পড়া ছেলে মেয়েরা আমাদের সাথে ওই হল্লা করে ট্রেইল ধরল। দেখলাম সেই আমদের ছেলেবেলার মত একটি নাটাই থেকে সুতো ছেরা ঘুড়ির পিছনে তারা দৌড়ুচ্ছে, আবার একটু পরে ঘুড়ির সুতা ধরে কোথায় কোথায় চলে গেল।

শিখার লজ, তুমলিং

শিখার লজ, তুমলিং

বাচ্চাকাচ্চা দের এইসন কাণ্ড কারখানা দেখতে দেখতে তুমলিং পৌছালাম, এখানে এসে দেখলাম ট্যুরিস্ট হসপিটালিটি কাকে বলে, বসা মাত্র পাপড় আর কফি, আর টয়লেটে তো হাই কমোডও পেলাম। এখানে কফিগুলো আসলে ঠিক সেই রকম নাহ মানে ২০ রূপি দিয়ে খাওয়ার মত না, অর্থাৎ কফির পরিমাণ কম । এর চেয়ে ৩ রূপি দিয়ে ৫ কাপ চা খাওয়া ভালো। কফির অপেক্ষায় বসে থেকে আমার বাসা থেকে নিয়ে আসা বাদাম চাবাচ্ছিলাম, দেখি সেই জার্মানদ্বয়ের একজন সামনে দিয়ে যাচ্ছে । তাকে বাদাম সাধার সাথে সাথেই নো সল্ট নো সল্ট বলে উঠলেন, অমি বললাম সল্ট ছাড়াই তবে কিছু জিরা আর ধনিয়ার গুরা মিক্স আছে। ভদ্রলোক বেশ আগ্রহ নিয়ে এক মুঠ বাদাম খেলেন, তার চেহারার তৃপ্তি বেশ লক্ষণীয় ছিল।

গাইরিবাস থেকে কাইয়াকাঠা
গাইরিবাস:-

২৯৭০মিটার থেকে নেমে ২৬২১ মিটারে অবস্থিত গাইরিবাস এ নেমে এলাম এবং এর পর ও প্রায় ২ ঘন্টা ট্রেকিং করার আলো ছিল। নেমে এলাম বলতে আসলে বলা যায় ট্রেকের সবচাইতে বিরক্তিকর জায়গাটা পার হয়ে এলাম। শুধু নামা আর নামা আর এই নেমে যাবার রাস্তায় কোন পাথর ই জায়গা মত নেই, সব পাথর আলগা আর ভুল করে কোন পাথরের কোনায় পারা দিয়ে উস্টা খাওয়ার ভয়ে পা টিপে টিপে নেমেছিলাম আর পা টিপে টিপে প্রায় ৬০০ মিটার নামাটা যে কি কষ্টের তা ট্রেকার রাই অনুমান করতে পারেন। তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে চারিদিকে চাপ চাপ কুয়াশা কিচ্ছু দেখা যায় না । গাইরিবাস টা আসলে হচ্ছে দুটো পর্বতের মাঝের ভ্যালি এবং এখান থেকে সান্দাকফু ছাড়াও আরও দুটো রাস্তা গিয়েছে, একটি নেপালে আর একটি বোধয় সিঙ্গারিলা পার্কের দিকে। ভ্যালি হওয়ার মানে হল এখানে নেমে যখন এসেছি তখন আবার উঠতেও হবে সেই আগের মত।

গুগল ম্যাপে গাইরিবাস এর অবস্থান

গাইরিবাস আসার পথে গুরাসাই এ থেমেছিলাম একটু চা খাবার জন্য, চা এর সাথে কিছু বিস্কিটও খাচ্ছিলাম দেখি একটি কুকুর এসে উ আ করছে, বিস্কিট গুলো কেমন যেন দূর্বা ঘাসের মত কোন স্বাদের ছিল না তাই পুরো প্যাকেট কুকুরটাকে দিয়ে দিলাম । পরে অবশ্য জেনেছিলাম অমি মানেভাঞ্জান থেকে ওটা ডগ বিস্কিট ই কিনেছিলাম না জেনে। অমি চা এর সাথে একটি স্যুপেরও অর্ডার দিয়েছিলাম, স্যুপ আসার পরে বুঝলাম যত উপরে উঠবো তত বিলাসিতা ত্যাগ করতে হবে, এ ত স্যুপ না যেন হাল্কা বার্লি পানি তে লাল রঙ আর কিছুই না। এর পর থেকেই শুরু হয়েছিল সেই বিরক্তিকর নিচে নামা।

গাইরিবাস এ ট্রেকিং লজ খুব বেশী নেই আর এস.এস.বি.’র একটা ক্যাম্প আছে। আমরা পৌঁছাবার পর প্রায় ২ ঘণ্টা দিনের আলো ছিল এবং পরে ভেবেছি যে দ্বিতীয়বার আসলে এখানে না থেমে পরের ডেস্টিনেশান কাইয়াকাঠা কিংবা কালাপোখরি চলে যেতে পারব। পুরা একটা চারজনের ডরমেটরিতে দুজন লেপ কম্বল ডাবল রিডাবল করে ডিনারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। বলাবাহুল্য হাতমুখ ধুতে গিয়ে টের পেলাম পানি বরফের চেয়ে ঠাণ্ডা। মজার বিষয় হচ্ছে বিছানায় একবার গা এলিয়ে দিলে খাবার কেন দুনিয়ার কোন নেয়ামত ই কম্বল আর লেপের গুহা থেকে উঠাতে পারবে না। তার পরেও মন কে শক্ত করে দাতে দাঁত চেপে খেতে গেলাম। আমার আবার খাওয়ার পরে দাঁত ব্রাশ কারা অভ্যাস এবং সেটি যে আরও কত কষ্টকর ছিল ঠাণ্ডায় তা বলাই বাহুল্য। এখানেও সেই একই অবস্থা, দুজনের যেই খাবার দিল তাতে চারজন খাওয়া যায় । ডিম অমলেট আর ডাল দিয়ে কোনমতে ডিনার করেই ঘুম, এখানে আমি ৪টা পাপড় খেয়েছিলাম।

গাইরিবাস

গাইরিবাস

পরদিন সকালে গাইরিবাসএ কতগুলো পাহাড়ি কুকুরের সাথে পরিচয় হল, এরা দেখতে পুরা ভয়ঙ্কর সাইবেরিয়ান নেকড়ের মত কিন্ত আন্তরিকতায় একদম ট্যুরিস্ট ভক্ত, আপনার সাথে সাথে হাঁটবে ভাব নিবে খেতে দিলে খাবে মনে হবে কতদিনের পরিচয়। কটেজের বাইরে এক কাপ চা এর জন্য বসেছিলাম, কটেজের মহিলা বোধয় ফহুম থেকে দেরী করে উঠেছিল তাই চা দিতে দেরী হচ্ছিল, এই গাকে দেখলাম কটেজের মালিক বা ঐ টাইপের কেউ তার ট্রেকিং বুট বাধছে। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম যে বুটের ফিতার ফুটো গুলো শেষ হবার পরে ফিটা ঘুড়িয়ে পায়ের সাথে বেঁধে উপরে হুক গুলোর সাথে বাধলেন! এই তাহলে কাহিনী? আমার বুটেও এমন পিতলের হুক আছে কিন্ত অমি জানতাম ই না এগুলোর ব্যবহার এখন পর্যন্ত! এটি আমার আর একটি ট্রেকিং লেসান, এর পরে পুরো ট্যুর এবং তার পরবর্তী সব ট্যুরেই এমন ভাবে ফিতা বেধেছি এবং গুপ মেম্বার দের ও শিখিয়েছি, এবং এভাবে ফিতা বাধলে ট্রেকিং এ অনেক আরাম হয়।

 

কাইয়াকাঠা:-

গুগল ম্যাপে কাইয়াকাঠা’র অবস্থান

মানেভাঞ্জান থেকে যেমন খাড়া ৪০০ মিটার উঠে চিত্রে গিয়েছিলাম ঠিক তেমনি গাইরিবাস ২৬২১ মিটার থেকে খাড়া ৪০০+মিটার উঠে কাইয়াকাঠা। আগে জানলে রাত এখানেই কাটাতাম, এবং এই উঠার পথেই প্রথম দেখি রডোডেন্ড্রানের প্রাকৃতিক বাগান, ঝাকে ঝাকে রডোডেন্ড্রান ফুল। কত চেষ্টা করলাম ছবি তুলতে, তুলেছি ও কত কিন্ত পরে কম্পিউটারে নিয়ে দেখেছি সব ছিল ব্লারি – অর্থাৎ ঠাণ্ডায় হাত কাঁপছিল আর অমি তখন তেমন ভালো ছবি তুলতে পারতাম না , এখন ও পারি না। একটি পয়েন্ট এন্ড শ্যুট দিয়ে করলে হয়ত পারতাম অথবা লাইভ ভিউ মোডে তুললে পারতাম, আসলে ট্রেকিং এ হার কাঁপানো শীতে ফটোগ্রাফির ক্রাফটম্যানশিপ একটু কম কাজ করতেই পারে।

কাইয়াকাঠা

কাইয়াকাঠা

যাইহোক, সকালে না খেয়ে গাইরিবাস থেকে এসেছি, খুদা ছিল প্রচুর, তাই যখন একটা নুডুলসের স্যুপ বাটিতে করে দিল আমরা হাপুস – হুপুশ করে খেলাম আর স্বাদটা ছিল অসাধারণ – সত্যি সত্যিই অসাধারণ। অবশ্য অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরে এই নুডলস স্যুপ, খুব সকালে হাজির তাই হয় ত লাকড়ি দিয়ে চুলা ধরিয়ে সময় নেই বানাল আর স্বাদের কথা ত বললাম ই। অসাধারণ।

এখানে বসে আমরা কিছুক্ষন বিশ্রাম করে আবার রওনা দিলাম কালাপোখরি’র উদ্দেশে। কাইয়াঁকাঠা থেকে কালাপোখ্রি যাবার দুটো রাস্তা আছে, একটি দেখলাম ভাঙ্গা রিপেয়ার করছে আর একটি উপর দিয়ে, আমাদের গাইড পুরনো রাস্তাটা দিয়েই নিয়ে গেল কারণ এতে নাকি এলিভেশান কম, আসলেই তাই ছিল।

কালাপোখারি থেকে বিখেভাঞ্জান
কালাপোখারিঃ-

গুগল ম্যাপে কালাপোখারি’র অবস্থান

৩১৮৬ মিটার / ১০৪৫২ ফিট
কালাপোখারি মানে হচ্ছে পবিত্র পানি। এখানে একটি হাই আল্টিটিউড ওয়াটার স্যাক বা পন্ড আছে – এই পুকুরটাকেই এভাবে নাম করা হয়েছে সাথে এলাকারও। পুকুরের উপরে দেখি মন্ত্র পড়া কাপড় এবং পতাকা, দেখে বুঝলাম এইপুকুরের পানি ছোঁয়া বা খাওয়ায় নিষেধ । কাইয়াকাঠা থেকে কালাপোখারি’র রাস্তাটাই বোধয় পুরো ট্যুর এ সবচাইতে ভাল রাস্তা কারন এটা পুরটাই সমতল এবং উঠানামা খুবই সামান্য। কালাপোখারি পোঁছে আমরা প্রথমে এস এস বি ক্যাম্পে আমাদের পাসপোর্ট নাম চেকইন করে গাইডের পছন্দের একটি ট্রেকার্স লজে উঠলাম। আসলে উঠলাম না বলে বলা উচিত বসলাম দুপুরের খাবার খেতে।

এখানে দেখলাম আরও বেশ কিছু ট্রেকারস লজ আছে – একটাতে ত টাটা স্কাই এর ডিস এন্টেনাও দেখলাম। কিছু কিছু ট্রেকারস লজ ত প্রায় ১স্টার হোটেলের মত! দরজা জানালা টয়লেট দেখে বোঝার উপায় নেই এটি কতটুকু রিমোট জায়গা। রান্না হতে হতে এস এস বি থেকে একজন লোক এসে আমাদের সাথে বাংলায় কথা বলতে লাগলো – কলকাতার সবাই বুঝি সবাইকে তুমি করে বলে । সে তার এসএসবিতে জয়েন করার আগে পরে ২৪ পরগনা থেকে বর্ডার ক্রস করে বাংলাদেশে এসে যাত্রা পুজো ইত্যাদি অনুষ্ঠান দেখতে চলে আসার কাহিনী বলতে লাগলেন, এশিয়া কাপে ওরা নাকি বাংলাদেশ কে সাপোর্ট করে ছিল এবং আমাদের সাথে খেলার শেষে ওরাও নাকি কেঁদেছিল – ঠিক একই কথা অবশ্য বলেছিলেন মানেভাঞ্জানের এস এসবি তে যিনি প্রথম আমাদের নাম এন্ট্রি করেন – আমরা কি করি না করি এসব জানার সাথে সাথে তাদের অনুভুতি গুলোও তারা প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না। এখানকার থাকার ব্যাবস্থা অসাধারন এবং সেই আবার প্ল্যান করলাম যে পরবর্তীতে গাইরিবাস না থেকে এখানেই চলে আসব।

কালাপোখারি

কালাপোখারি

এখানে দেখলাম সিলিন্ডার গ্যাস আছে, চিত্রে এবং মেঘমা গাইরিবাসেও তাই। আমরা আমাদের মেন্যু অর্থাৎ সবজি ডাল ভাতের কথ অবলতে এরা দেখি সবে রান্না শুরু করল! তবে সেই এস,এস,বি বাঙ্গালী ভদ্রলোকের সাথে গল্প করে রান্নার সময়টা পার করে দিলাম, অবশ্য বের ও হয়েছিলাম কিছু ছবি তোলার জন্য। বাইরে বেড়িয়েই দেখি তীব্র থন্দা বাতাসের ঝাপটা, ক্যামেরার শাটারে আঙ্গুল রাখাই দায়। বলাবাহুল্য যে ডাবল উলের গ্লাভস পড়ায় শাটার বাটনে ঠিক মত চাপা যাচ্ছিল না, তাই ছবির জন্য হলেও ডান হাতের গ্লাভস খুলতেই হয় আর তার একটু পরে দেখি হাতের কবজি অবধি বরফ – অনুভূতিহীন হয়ে যাচ্ছে; কঠিন অবস্থা!
আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে বিখেভাঞ্জানের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

 

বিখেভাঞ্জানঃ-

গুগল ম্যাপে বিখেভাঞ্জানের অবস্থান

৩৩৫০ মিটার / ১০৯৯১ ফিট
কালাপোখারি থেকে বিখেভাঞ্জানে যাবার পথে আরো কতগুলো স্টপেজ পড়ে যেগুলর নাম মনে পড়ছেনা তবে বিখেভাঞ্জানের ঠিক আগের একটা পাড়া থেকে একটা মুরগি কিনে নিয়েছিলাম।অভ্যাস টি বান্দারবান ট্রেকিং থেকে এসেছে, অর্থাৎ আমারা সে পাড়াতেই যেতাম আগে মুরগি খুঁজতাম আর বগালেকে ত রুমাবাজার থেকে মুরগি হাতে করে নিয়ে উঠতাম। তেমনি প্ল্যান ছিল এখানে যে সান্দাকফু তে মুরগি নিয়ে উঠবো, মানে সেখানে রান্না করে খাব আর কি। এখন আমাদের গাইড সাহেব খুব ভালো করেই জানেন কোথায় মুরগি পাওয়া যায়। ত এই পাড়ায় এসেই দেখলাম বড় বড় মুরগি ঘরের আসে পাশে আর পাশের বাড়ির ভিতরে ঢুকে নিমাহ কি যেনও বলল – সাথে সাথে এক মহিলা বের হয়ে মুরগি দের খাবার দিয়ে কাছে ডেকে খপ করে একটাকে ধরে ফেলল। দাম নিয়েছিল ৪০০ রুপি /কেজি।

বিখেভাঞ্জান থেকে সান্দাকফু’র দুটি রাস্তা রয়েছে, একটি নেপাল হয়ে, একটি গাড়ির রাস্তা আর একটি হচ্ছে গাড়ীর রাস্তার মাঝে কৌণিক দূরত্বের শর্টকাট। আমরা গাড়ীর রাস্তা দিয়েই হাটা শুরু করলাম, কারন এই রাস্তাটা অনেকটা জায়গায় খাড়া উঠে গেলেও চওড়া অর্থাৎ গাড়ি চলার মত প্রসস্থ হয়ায় একটু মনস্তাত্ত্বিক ভাবে নিরাপদ।

বিখেভাঞ্জান

বিখেভাঞ্জান

এখান থেকেই শুরু হল আসল ট্রেকিং, খারা উঠছি আর উঠছি । দশ মিটার পর পরই ক্লান্ত হয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি এবং এভাবে অনন্ত কাল ধরে উঠতেই থাকা। ধৈর্য ধরে এক স্টেপ এক স্টেপ করে এগিয়ে যাওয়া আর প্রতি স্টেপে পিছনের পা কে সামনের দিকে এগিয়ে আনা আর মনে সান্ত্বনা দেয়া । এরকম খারা স্টিপে উপরের দিকে না তাকিয়ে নিজের পা এর দিকে চেয়ে হাঁটলে ভালো, তাতে মনস্তাত্ত্বিক এডভান্টেজ পাওয়া যায় যেমন আর কত দুর অথবা এইটুকুন মাত্র আসলাম ইত্যাদি ব্যাপার গুলো ভুলে থাকতে সাহায্য করে। কিন্ত আর কাহাতক সহ্য হয়? এমনিতেই শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার উপরে খাঁড়া স্টিপ এঁকে বেঁকে উঠেই যাচ্ছে , ১০ মিটার উঠা আর বিশ্রাম আবার ১০ মিটার এভাবেই ম্যারাথন ট্রেকিং চলতে থাকল প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ..

সান্দাকফু
সিঙ্গালিলা রেঞ্জের এবং পশ্চিমবঙ্গের সবচাইতে উচ্চস্থান এই সান্দাকফু এর উচ্চতা ৩৬৩৬মিটার / ১১৯২৯ ফিট।
বিখেভাঞ্জান থেকে খাড়া উঠতে উঠতে মাঝে মধ্যেই আমরা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম আর ক্ষণে ক্ষণে দেখছিলাম সান্দাকফু দেখা যায় কি না। আমি যখন সান্দাকফুর ট্রেকার্স লজের মাথাতা দেখলাম তখন নিমাহ কে ডেকে বললাম ঠিক এটার জন্যই এত কষ্ট করে আসা। রাস্তাটা খুবই খাড়া এবং আমি আনোয়ার ভাই এর শেখানো সিস্টেমে ট্রেকিং করে যাচ্ছি, এবং ধিরে ধিরে সাবলীল ভাবেই উঠে যাচ্ছি।

গুগল ম্যাপে সান্দাকফু’র অবস্থান

ঠিক সান্দাকফু’র মাথায় উঠে আমি কিছুক্ষণ হু-হা করে দেখি রুবেল ভাই এখনও পৌঁছায়নি। আমি গাইড কে পাঠালাম একটু নিচে নেমে দেখে আসতে কি হয়েছে, বেশ কিছুক্ষণ পরে রুবেল ভাই পৌঁছাল অনেকটা খোঁড়াতে খোঁড়াতে। জানতে পরলাম সান্দাকফু উঠার ঠিক আগের খাড়া ঢালে হাটার সময় ডান পায়ের’র পেশিতে টান পড়ে প্রচণ্ড ব্যাথা নিয়ে ধিরে ধিরে উঠে এসেছেন।

এই সেই স্বপ্নের সান্দাকফু …
সান্দাকফু উঠেই আমার প্রথম অনুভুতি হল – আমি মাত্র ডিপ-ফ্রিজের দরজা খুললাম এবং ১২০কিমি বেগে সেই ঠাণ্ডা বাতাস আমার উপরে ব্যে যাচ্ছে। ঠাণ্ডাটা স্থির থেকে কিছুটা মকাবিলা করা যায় কিন্ত ১২০কিমি বেগে বাতাসের সাথে যদি আসে তাহলে এটা কি ভয়ঙ্কর হতেপারে তা বলে বোঝানো সম্ভব না। কিন্ত আশ্চর্য আমি সব কিছু আনুভুতি ছাপিয়ে সান্দাকফু’র চুড়ায় উঠা শুরু করলাম এবং সান্দাকফু উঠার মুল উদ্দেশ্য ‘কাঞ্চনঝঙ্গা’ আর এভারেস্ট দৃষ্টি দিয়ে খুজতে থাকলাম, কিন্ত আবহাওয়া এতটাই খারাপ যে ৩০সেকেন্ড পর পর মেঘ আর কুয়াশা এসে দৃষ্টি সীমা ১০ফিটে এনে দিচ্ছ।

আমাদের গাইড নিমাহ আমাদের জন্য সস্তায় একটি সরকারি ক্লাস সি লজ ভাড়া করল এবং আমি আর রুবেল ভাই চেক ইন না করেই লজের রুমে ঢুঁকে গেলাম। রুমে ঢুঁকে বুঝতে পারলাম বাইরের চাইতে ভিতরে ঠাণ্ডা বেশি কেন জানি, হয়ত এটা মনের বাতুলতা। এখানে আমার পয়েন্ট এন্ড শুট কোডাকের কামেরাটা আর চালুই হলনা, কিন্ত আমার ডি ৫১০০ তা ঠিক কাজ করছে। এখানে কাপড় চেঞ্জ করে চেকিং করে আবার চুড়ার কাছাকাছি ঘুরাঘুরি করতে থাকলাম যদি কাঞ্চনের দেখা মিলে। প্রায় ৩০ মিনিট সেই ১০০কিমি বেগের ডিপ ফ্রিজের বাতাসে থেকে পরিশেষে আজ আর কাঞ্চন দেখা কপালে নেই মেনে নিয়ে আমাদের লজে ফিরে এলাম।

বিখেভাঞ্জানের ঠিক  আগে থেকে কিনে নেয়া মুরগিটা এবার লজের কেয়ারটেকার কে দিয়ে রান্না করতে বললাম, শুনে সে বলে সে এটা কাটতে পারবে না, (বৌদ্ধ)। আমি আর রুবেল ভাই জবাই করে দিলাম আর রুবেল ভাই মুরগিটা পুরা টুকরো টুকরো করে দিল রান্নার জন্য। সন্ধ্যার আগে আবার চেষ্টা করলাম দেখি কিছু দেখা যায় কি না, কিন্ত না পুরো আকাশ মেঘে ঢাকা আর তীব্র বাতাস। ত কি আর করা ডরমেটোরি তে বসে আছি আর দুজনে গল্প করতে করতে সময় কাটাচ্ছি। সন্ধায়র কিছু পরে নিমাহ সেই মুরগির রান্না করা তরকারি আর খাবার নিয়ে এল সাথে সেই কটেজের কেয়ারটেইকারের বউ। অমি বললাম আপনারা মুরগি খান না? বলে খাই! তাহলে ?!!! পরে বুঝলাম , এরা জবাই করবে না – কাটবে না আবার কেউ বারবাকিউ করতে চাইলেও মন্দির আছে বলে করতে দিবে না, অথচ খাবে ঠিক ই … আমরা সেধে কিছু মুরগির তরকারি ওদের দিয়ে দিলাম। রাতে সেই মুরগী দিয়ে ডিনার করে ডাবল-রিডাবল কম্বল দিয়ে গুটিসুটি মেরে ঘুম। প্ল্যান ছিল পরদিন সকালে খুব ভোরে উঠে দারিয়ে থাকব মনি-কাঞ্চনের প্রত্যাশায়।

সান্দাকফুর সকালঃ-
রাতে ডাবল লেপ আর কম্বলে চেপে এমন যবুথবু প্যাক্ট হয়ে ঘুমিয়েছিলাম যে শোয়া অবস্থায় এপাশ ওপাশ ও করিনি ঠিকমত পাছে যদি কোল্ড-প্রোটেকশান ভেঙ্গে যায়! একবার শুধু মনেপরে ‘পি’ করার জন্য বাধ্য হয়ে ছিলাম উঠতে, আল্লাহ – এত ঠাণ্ডা বরফ না পড়েই! বরফ পড়লে না জানি কেমন হত, এই চিন্তা করতে করতে কাজ সেরে আবার লেপ-কম্বলের ক্রিমরোলে সেঁধিয়ে গেলাম।

ঘুম ভাঙ্গা মাত্রই সচেতন হয়েই জানালার দিকে তাকালাম সূর্যের আলোর প্রত্যাশায়, সূর্যের আলো পাইনি কিন্ত পরিষ্কার আবহাওয়ার পরিস্কার আলোর দেখা পেলাম। গাইড এসে আমাকে জাগা দেখে বলল এখনই সময় সান্দাকফুর উপর থেকে সূর্যদয় দেখার, আমিও তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে গেলাম ১১৯২৯ ফিট থেকে সূর্যদয় দেখার জন্য। বলাবাহুল্য রুবেল ভাই তখন বেঘোড়ে ঘুমাচ্ছিল, তাকে ডেকে তুল্লাম, যেহেতু সে পায়ের ব্যাথায় আক্রান্ত তাই তাকে একটু ধাতস্ত হবার সময় দিয়ে আমি আগেই বের হয়ে গেলাম, সান্দাকফুর যে পাশটায় সূর্যের অবস্থানটা পরিস্কার দেখা যায় সেখানে গিয়ে দেখি কলকাতা থেকে আসা এক গ্রুপের টিম লিডার একটা ক্যানন ৫৫০ডি নিয়ে বসে আছে আমার মত। আবার সেই ক্যামেরা কাহিনী… এতটাই ঠাণ্ডা যে গ্লাভস থেকে হাত বের করা খুব কষ্টকর, কারন বেশিক্ষন খোলা হাত বাইরে রাখলে হাত একটু পরেই অবশ হয়ে যায়, কিন্ত ক্যামেরাটা ভালভাবে অপারেট করতে হলে হাত খোলা ছাড়া বিকল্প নেই। গতকাল চেষ্টা করেছিলাম সেই মোটা গ্লাভস এর উপরদিয়ে ছবি তোলার, কিন্তু প্রতিবার শাটার বাটন খুঁজে পেতেপেতেই সারা।

কলকাতার ঐ ছেলেটা একের পর এক সিগারেট খাচ্ছে আর আমি তাকিয়ে আছি কখন সূর্য উঠবে। ধিরে ধিরে একটা হলুদ-কমলা-লাল ঝলকানি দিয়ে সূর্য উঠা শুরু করল, আমরাও ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক ক্লিক, এর পরে আমরা ঐ যায়গা থেকে সরে আসলাম এমন একটা উচু জায়গায় যেখান থেকে কাঞ্চনঝঙ্গা আর এভারেস্ট পরিস্কার দেখা যায়।

ঠিক এই সময় রুবেল ভাই এসে হাজির, সবাই রেডি কাঞ্চনঝঙ্গার ছবি তোলার জন্য এমন সময় রুবেল ভাই বলে উঠলেন তার ক্যামেরা অনই হচ্ছে নাহ, অর্থাৎ ক্যামেরা ডাউন ঠাণ্ডায়!

ধিরে ধিরে কাঞ্চনঝঙ্গা আলকিত হয়ে উঠল আর আমার ১৮-৫৫এমএম লেন্স দিয়ে যতটুকু – যেভাবে পারি ছবি তোলা শুরু করলাম। ততক্ষনে কলকাতার গ্রুপের আরও কিছু ছেলে চলে এসেছে, চারিদিকে শুধু শাটারের শব্দ, দেখলাম সেই দুই জার্মানও চলে এসেছে ভিডিও করতে করতে। সে এক বর্ণনাতীত মুহূর্ত – সত্যি সত্যি যদি আপনার কোন স্বপ্ন আপনার চোখের সামনে সত্যি হয়ে যায় তার অনুভূতিটাই অন্যরকম, ভাষায় প্রকাশ করা আমার মত সামান্য ভাষাজ্ঞান জানা লোকের পক্ষে তো কোনভাবেই সম্ভব না। গ্লাভস খুলে শাটার চাপতে চাপতে যখন হাত অবশ হয়ে যায় তখন ক্যামেরা রেখে বসে বসে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকি আল্লাহাপকের এই অপূর্ব নিদরশনের দিকে, সুবহানআল্লাহ সুবহানআল্লাহ। ডানে-বামে দেখলাম সবারই একই অবস্থা, ঠাণ্ডার জন্য যতক্ষন পারে ছবি তোলে আর হাত অবশ হয়ে আশার আগেই হাতে গ্লাভস ঢুকিয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।

রুবেল ভাই বললেন তিনি ক্যামেরা হিট দিয়ে আসবেন, আমিও উনার সাথে নিচে নেমে আসলাম। কিন্তু বসে থাকতে পারলাম নাহ, সূর্যের আলো আরও প্রখর হচ্ছে, আমি আবার বের হলাম, বলা বাহুল্য আমার কাছে একটা ব্যাটারি গ্রিপার ছিল (ধন্যাবাদ আলিমকে যে আমাকে টাকা ধার দিয়েছিল গ্রিপার কিনার জন্য এবং আমি প্রথমে কিনতে চাইনি কিন্ত সেই আমাকে অনেকটা জোর করে কিনে দিয়েছিল) তার সাথে দুটো পাইরেটেড চাইনিজ ব্যাটারি, একটা ব্যাটারি রেখেছিলাম শুধু সান্দাকফুর জন্যই, তাই আবার বেরিয়ে পড়লাম, এবার ভিডিও করা শুরু করলাম আর ক্লিক ক্লিক ক্লিক, একটা মোক্ষম জায়গার এসে দেখলাম আমি শুধু একা, এখানে কোন ট্যুরিস্ট নেই, একা একা ভীষণ নস্টালজিক হয়ে পড়লাম, অনুভূতিটা প্রকাশ করার মত নয়, শুধু চেয়ে থাকা ঘুমন্ত বুদ্ধের দিকে।

অনেক্ষন থাকার পরে আবার নিচে নেমে এসে দেখি রুবেল ভাই রোদের আলোতে জানালার কাচের পাশে ক্যামেরা আর ব্যাটারি সাজিয়ে রেখেছেন। আমি বললাম রুবেল ভাই ‘দিস ইস দ্যা মোমেন্ট’ রুবেল ভাই চেক করে দেখলেন ক্যামেরা আবার কাজ করছে, যথাস্তু আবার উঠে ছবি তোলা। রুবেল ভাই সেই শিলিগুরি থেকে একটা ‘মাউন্টেইনডিউ’ নিয়ে এসেছিল সান্দাকফুর উপরে দাড়িয়ে খাবেন বলে, পথে সেটা শেষ হয়ে মানেভাঞ্জান থেকে আরও দুটো নিয়ে ছিল, আবার কালাপোখারি থেকে ঐ দুটো শেষ করে আরো দুটো এবং সেই দুটোর একটা বোতল অবশিষ্ট ছিল, সেটা নিয়েই সে উঠল।

সান্দাকফু থেকে দেখা কাঞ্চনঝঙ্গা

সান্দাকফু থেকে দেখা কাঞ্চনঝঙ্গা

বর্ষাকালে একবার বান্দারবনের বাকলাই পাড়া পার হয়ে হেডম্যান বোর্ডিং পাড়া দিয়ে থাঞ্চি যাবার সময় আনোয়ার ভাই পথের ক্লান্তি দূর করার জন্য একটা সমতল পথে হাত বাড়িয়ে বলে উঠেছিলেন ‘ওয়েলকাম টু থাঞ্চি’ যদিও আরও দুটো খাঁড়া খাঁড়া মান্দার গাছের রেলিং ছাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠা বাকী ছিল, কিন্তু শ্রেফ সাহস আর আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য তিনি এই কাজটা করেছিলেন, আমিও আজ সান্দাকফুর চূড়ায় উঠে আসে পাশের সব ট্যুরিস্ট কে ‘ওয়েলকাম টু থাঞ্চি উপস সান্দাকফু’ বলে হ্যান্ডশেক করা শুরু করলাম, এবং কাজটা করেতে গিয়ে বুঝলাম তারাও আমার মতই আবেগাপ্লুত।

ছবি – ভিডিও – ধারা বর্ণনা – সব কিছু করে আর মন ভরে না, ইচ্ছা করে আরও একটা ছবি তুলি – আরও একটা ভিডিও করি – আরও কিছু করি –পারলে কাঞ্চনের অথবা এভারেস্টের নিচে চলে যাই। সত্যি সেই মুহূর্তটা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব, যারা আমার এই লিখা পড়ছেন এবং সেখানে গিয়েছেন তারা বুঝতে পারবেন কথাটা কতটুকু সত্যি, আর যারা যাননি তাদের বলছি – আল্লাহর এই দুনিয়াটা মানুষকে নিদর্শন রুপে দিয়েছেন, অল্প সময়ের এই জীবদ্দশায় একটু দেখে আসুন, নিজের জীবনটাকে প্রকৃতির কাছে কিছু সময়ের জন্য সঁপে দিন।

সাবারগ্রাম
আমাদের পরবর্তী প্ল্যান ফালুট যাওয়া, তাই নেমে এসে সকালের খাবারটা গতকালের রেখে দেয়া মুরগী দিয়ে সেরে ফেললাম, খাবার গুলো টেবিলের উপরেই ছিল সারা রাত, শুধু গরম করে নিলাম, কারন আমরা একটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১১৯২৯ ফিট / ৩৬৩৬ মিটার উপরে জীবন্ত ফ্রিজের ভিতরেই আছি তাই এখানে খাবার নষ্ট হবার সুযোগই নেই।

 

সান্দাকফু থেকে

সান্দাকফু থেকে ফালুটের দূরত্ব ২১ কিলমিটার আর ফালুটের উচ্চতা প্রায় ৩৬০০ মিটার। ফালুট ট্রেকের বিশেষত্ত হচ্ছে এই ট্রেইলের কোথাও পানি নেই। শুধু ১৪ কিলো দূরে আছে সাবারগ্রাম নামে একটা জায়গা যেখানে ছোট্ট একটা এসএসবি ক্যাম্প আছে, এখানে ট্যুরিস্ট দের জন্য খাবার-পানি আর রেস্টের ব্যাবস্থা আছে, এখান থেকে একটা পথ নিচে ‘মলে’ নামক একটা জায়গায় নেমে গিয়েছে সেটা দিয়ে রামাম যাওয়া যায় এবং রামাম থেকে রিম্বিক হয়ে বের হওয়া যায় – রিম্বিক থেকে সরাসরি গাড়ি দিয়ে দার্জিলিং অথবা শিলিগুড়ী চলে যাওয়া যায় অথবা মলে থেকে আবার গুরদুম হয়ে শ্রীখোলা যাওয়া যায়। পথটা অনেক খাঁড়া নিচের দিকে নামা, যদিও আমরা এই ট্র্যাকে যাবনা তবুও যদ্দুর জানি এটা ৩৬৩৬ মিটার থেকে একটানে খাঁড়া মানেভাঞ্জানের উচ্চতায় নামিয়ে আনে।

বাংলাদেশ থেকেই আমরা প্ল্যান করে ছিলাম সান্দাকফু থেকে দুজনে প্রত্যেকে দুই দুই চার লিটার পানির বোতল বহন করব, যথাস্তু তাই করেছিলাম। সান্দাকফু থেকে সব গুছিয়ে রওনা দিতে দিতে

সান্দাকফু থেকে সাবারগ্রাম যাবার ট্রেইল

সান্দাকফু থেকে সাবারগ্রাম যাবার ট্রেইল

আমাদের সাড়ে দশটা বেজে যায়, যাবার সময় বার বার চেয়ে থাকি কাঞ্চন আর এভারেস্টের দিকে, ক্ষনে ক্ষনে ফিরে ফিরে চাই। অবশ্য সাবারগ্রামের রাস্তাটা সোজা অনেকটা কাঞ্চনঝঙ্গার দিকেই এগিয়ে গিয়েছে, বলাবাহুল্য সান্দাকফু থেকে কাঞ্চনঝঙ্গার দূরত্ব ৪০ কিলো আর ফালুট থেকে ২০ কিলো, সুতরাং যতই এগুচ্ছি ততই কাঞ্চনঝঙ্গা বড় হয়ে উঠছে। আমি আর রুবেল ভাই থেকে থেকে থেমে থেমে ডানে বামে সামনে পিছনে বিভিন্ন ভাবে কাঞ্চনঝঙ্গা আর এভারেস্টের ছবি তুলতে তুলতে যাচ্ছিলাম, কিন্ত আমাদের গাইড ‘নিমাহ’ তাড়া দিল যে ফালুটে থাকার জায়গা মাত্র ২০ জনের এবং একটা ১৪ জনের নেপালি টিম আমাদের আগেই রওনা হয়ে গিয়েছে আর বিদেশী ট্যুরিস্ট টিমের রিজারভেশান ত আছেই, তাই আগে আসলে আগে পাবেন টাইপের সুযোগ নেয়ার উপায় খুজছে আমাদের গাইড। কিন্ত এতে আমার আর রুবেল ভাই এর টনক না নড়ায় সে বলে উঠল ৩৬০০ ফিট উপরে মেঘের রাজ্যে হিমাঙ্ক ঠাণ্ডায় ফালুটে পাকা সিমেন্টের ফ্লোরে – ফ্লোরিং করতে হবে যদি সিট না পাই ! মাথার উপরে তখন খাঁড়া রোদ আর আমরা তখন পাতলা একটা টি-শার্ট পরে হাঁটছিলাম – নিমাহ’র কথা শোনা মাত্র একটা হার কাঁপুনি দিয়ে উঠল। খোদ বিছানাতেই ডাবল কম্বল-লেপ দিয়েই কাপাকাপি আর ফ্লোরিং ?! কিছুটা আতঙ্কের ভিতরে চিন্তা করতে লাগলাম কি করা যায়।

ফালুট ট্রেইলের বৈশিষ্ট হচ্ছে আমেরিকার প্রেইরি’র স্বাদ আপনি এখানে নিতে পারেবেন, শুধু ফসলের গমের গাছ গুলোকে ঘাস মনে করবেন। এরকম বিরান – বিধুর – ঘাসে ঢাকা অনন্ত দিগন্তের দিকে চলে যাওয়া পর্বত আমি কোথাও দেখিনি – অবশ্য কয়টা পর্বতই বা গিয়েছি (লোল)। মজার বিষয় হচ্ছে এই পর্বতে কোন জীবিত গাছ দেখতে পাওয়া বিরল, যদিও পুড়োটা পর্বতই সবুজ দূর্বা ঘাসে ঢাকা। গাছ নামে খাঁড়া যদি কিছু দেখি তাহলে সেটা হচ্ছে গাছের পোড়া কঙ্কাল। এর কারন হচ্ছে এই এলাকায় প্রচুর বজ্রপাত হয়, এত বেশী পরিমানেই হয় যে বেচারা গাছ গুলো বেশিদিন খাঁড়া হয়ে জীবিত থাকতে পারে না, আর এখানে বাতাসের বেগটা এত বেশী ক্ষেত্র বিশেষে ১২০-১৮০ ও ছাড়িয়ে যায় (সুত্রঃ এসএসবি)। সর্বক্ষণ এই বাতাসের বেগ সহ্যকরে বেচেথাকা গাছের প্রজাতিই ত কম তার উপরে আছে বজ্রপাত।

সামনেই কিছুদুর যাবার পর সেই জার্মানদের পেলাম, দেখি একটা উচু ঢালের উপরে বিশ্রাম নিচ্ছে ওরা, আমরাও বসে পড়লাম, আমাদের কাছে থামা মানেই ছবি তোলা। এখানে আমি কিছু চকোলেট খেলাম এবং অভ্যাস বশত চকোলেটের র্যাপার ছুঁড়ে ফেলে দিলাম, ছুঁড়ে ফেলা মাত্রই দেখলাম সেই জার্মানদের গাইড দৌড়ে র্যাপারগুলো টুকিয়ে নিজের পকেটে ভরে রাখল। এটা দেখে এতটাই লজ্জা পেলাম যে বাকী পুরো ট্রেইলে কোথাও চকোলেটের খোসা ফেলিনি – পকেটে গুজে রেখেছি। আর ফালুট ট্রেইলে বিরান কোন জায়গাতেও দেখা যায় একটা বড় টিনের কন্টেইনার কেটে ডাস্টবিন বানিয়ে বাশ দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, এর পর থেকে একদম সুবোধ বালকের মত পকেটে জমিয়ে রাখা সেই খোসা গুলো এই ডাস্টবিন খুঁজে খুঁজে তাতে ফেলেছি। কথা প্রসঙ্গে বলি – আমার মনে হয় বান্দারবনের বগালেক অচিরেই একটা ডেমরার ডাস্টবিনে পরিনত হবে, যদি কেউ এগিয়ে এসে কেউক্রাডং ট্রেইলে এই ব্যাবস্থা না করে অথবা আমরা সচেতন না হই।

সাবারগ্রাম যাবার পথে উচু নিচু ট্রেইলে হেঁটে যাবার সময় থাইকুন পারার একজনের কথা মনে করল, তার নাম ‘চৌথাও’, আল্লাহপাক তার মাধ্যমেই বাকলাই পাড়া ট্রেইলে আমাকে একবার নির্ঘাত ৫০০ফিট নিচে পড়ে যাবার হাত থেকে উদ্ধার করেছিলেন। সে আমার ক্লান্তি আর বার বার তাকে আর কতদুর – সামনে কি আরও উঠা ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন – ‘উঠা আর নামা – এইত পাহাড়ি পথ’। এই ট্রেইলে উঠা নামার সময় রুবেল ভাইকে বললাম ভাই আমারতো নামলেই ভয় করে, কারন এই মজার নামাটা আবার উঠা দিয়ে পুরন করতে হবে। এদিকে রুবেল ভাইএর সেই পা এর ব্যাথাটা আবার চূড়ান্ত ভাবে ফিরে এসেছে কিন্ত মুখে প্রকাশ করছে না। তাকে একটু লক্ষ করে দেখলাম বা পা’টা সে পুড়ো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে (ভাজ করলেই ব্যাথা তাই ভাজ করার হাত থেকে রেহাই পেতে) সামনে বাড়ছে। জার্মানরা এটা দেখে যে ইংরেজি বলতেপারে সে রুবেল ভাই কে ধরে বলছে You should be at the hospital, why are you walking ? you should be at the hospital আমি মনে মনে বলি কি যে করি। সাবারগ্রামের শেষে উঠার সময় খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার, এমনকি ব্যাথার পা নিয়ে রুবেল ভাই ও আমাকে অতিক্রম করে চলে গিয়েছিল, মাথার উপরে ছিল গনগণে সূর্য, একটুতেই ঘামে হাপিয়ে উঠছিলাম আর থেমে থেমে ত পানি খাচ্ছিলামই।

একটা ছায়া শিতল চিপায় এসে আমরা একটু বিশ্রাম নিলাম, দেখি জার্মানরাও বসে পরল। এদের দেখেই মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি চাপল, ওদের গাইড কে জিজ্ঞেস করলাম যে ফালুটে ফ্লোরিং করার কাহিনি জার্মানরা জানে কি না, এটা শুনে সে আমাকে বলল ব্যাপারটা ওদের ইংরেজিতে বুঝিয়ে বলতে, আর আমি যথাসাধ্য আতঙ্ক মিশিয়ে ব্যাপারটা ওদের বললাম, শুনেই দেখি ওরা গাইডের সাথে রাগারাগি শুরু করল কেন আগে রিজারভেশান দেয়নি। আমি আর রুবেল ভাই মুচকি হেসে রওনা দিলাম।

 

সাবারগ্রামঃ-

গুগল ম্যাপে সাবারগ্রাম এর অবস্থান

৩৫৩৬ মিটার। সাবারগ্রাম এসে পৌঁছালাম দুপুরে, সময়টা মনে নেই, হয়ত ২টা বা তার বেশী হবে। সাবারগ্রাম এসে আমার পিছনে রানের নিচে হাঁটতে হাঁটতে চামড়ায় কুঁচকি পরে যাওয়ায় এবং তাতে ঠাণ্ডা লাগায় প্রচণ্ড ব্যাথা করছিল। টিনের হাটের এক চিপায় গিয়ে ‘মুভ’ দেয়া মাত্রই জলুনি – আমি আ আ আ করতে লাগলাম – দেখি জার্মানরা হাসে।

সাবারগ্রাম এসে লামেধুরাতে আর একটা জার্মান টিমের সাথে যে দেখা হয়েছিল তাদের দেখা পেলাম – এদের ভাব-সাবই অন্যরকম – মানে এশিয়ানদের একটু ভাবের নিচু দৃষ্টিতে দেখে। এদের জিজ্ঞাস করলাম ভাই আপনেরা কি ফালুটে রিজারভেশান দিয়েছেন – না হলে কিন্ত ফ্লোরিং করতে হবে – কথাটা শুনে দেখি সবাই চিন্তিত – নিজেদের ভিতরে শলা পরামর্শে ব্যাস্ত হয়ে উঠল। আমি মুভের জলুনি থেকে রক্ষাপেতে নিজের পশ্চাৎদেশ রোদের দিকে রেখে আমার ডাবল নুডুলস স্যুপ খেয়ে নিলাম – এখানেই দেখলাম এরা প্যান কেকও বানায় যেটা আমি জানতাম না, জানলে আর ও আগেই ট্রেইলের কোন লজে অর্ডার দিতাম। রোদের দিকে ফিরে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে রসিয়ে রসিয়ে সেই নুডুলস স্যুপ খাওয়ার মুহূর্তটা আমি কখনো ভুলব না। এভাবে স্থির হয়ে যাওয়া সময়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখি দুটো অপ্সরী – স্কিন টাইট জিন্স আর হাফ-স্লিভ টিশার্ট পড়া – কানে হেডফোন ধিরে ধিরে হেঁটে আসছে লজের দিকে – পরে জিজ্ঞাস করে জানলাম এরা সুইডিশ। এরা স্কিন-টাইট জিন্স পরে ট্রেকিং করে আর আমাদের কতই না প্রস্তুতি – অবশ্য মুন্তাসির মামুন ভাই ও একই কথা বলে ছিলেন – তিনি নাকি ২০০১ জিন্স পরেই উঠেছিলেন – বগালেকের সিয়াম দিদিও নাকি ‘তার সময়ে’ স্কিন-টাইট থ্রি-কোয়াটার পরে বান্দারবানের সব পাহাড় ঘুরে বেড়াতেন।

সাবারগ্রাম

সাবারগ্রাম

স্যুপ খাওয়া শেষ করে ক্যান্টিনের ভিতরে গিয়ে দেখি দুই জার্মান টীম ই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ফ্লোরিং করার চাইতে তারা ফালুট না গিয়ে সাবারগ্রাম থেকে ‘মলে’ চলে যাবে – এটা শুনে চেহারায় প্রতিক্রিয়া গোপন রেখে যতটুকু পারি আনন্দে নেচে উঠলাম – মনে মনে অনেকটা ভিলেনের হেঃ হেঃ হেঃ হাসি দিলাম। সাবারগ্রাম এ দেখলাম পাহাড়ে বাধ দিয়ে দিয়ে পানি সংরক্ষন করা হয়, তাই বুঝলাম এই ট্রেইলের কাঠিন্য।

ফালুট
ফালুটের উচ্চতা প্রায় ৩৬৫৮ মিটার

সাবারগ্রাম থেকে খেয়েদেয়ে আমরা সম্ভবত ৩টার দিকে রওনা দিলাম, সাবারগ্রাম ক্যাম্পে একটা কালো-বাদামি রোমশ কুকুর দেখেছিলাম, আমার রওনা দেবার সাথে সাথেই দেখি সে ও আমাদের সাথে চলে আসছে, আমি ভাবলাম এটা কিছুদুর গিয়েই হয়ত ফিরে যাবে।

গুগল ম্যাপে ফালুট এর অবস্থান

ফালুটের ট্রেইলে একদম গাড়ী চলার মাটির পথ এবং কোথাও পাথরের খাজ করা পথ, মজার বিষয় হচ্ছে এই ট্রেইলটা যে কেন ভাল লেগেছে তার কোন যৌক্তিক কারন আমি বলতে পারব না – হয়ত ট্রেইলের উপরে বিকেলের সূর্যের আলোর খেলা, হয়ত সেই কুকুরটার সাথে আমাদের ভাব নিয়ে চলা – হয়ত বিকেলের সাভাবিক নস্টালজিয়া – হয়ত বার বার মেঘের খাবি খাওয়া।

কুকুরের কাহিনীটাই বলি – সে নিশ্চুপ ভাবে আমাদের পিছনে পিছনে আসছে, মাঝে মাঝে আমি থেমে যাই ছবি তুলতে, তখন রুবেল ভাই আর নিমাহ অনেক সামনে চলে যায়, কিছু দূর হাঁটার পর দেখি কুকুরটা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি প্রথমে বুঝিনি, মনে করেছিলাম সে বুঝি এখানেই শেষ, ফিরে যাবার জন্য দাঁড়িয়েছে, ও মা আমি কাছে যাবার সাথে সাথে সে আবার সামনে হাটা দিল এবং একজন প্রশিক্ষিত গাইড যেভাবে কিছুক্ষণ পর পর ট্রেইলের পিছনে যায়, সে ও পিছুক্ষন পর পর পিছনে ফিরে দেখে নিচ্ছে আমি তাকে ফলো করছি কি না।

ব্যাপারটা পরিক্ষা করার জন্য আমি ইচ্ছা করে এক জায়গায় দাড়িয়ে গেলাম – চামে ছবিও তুল্লাম, দেখি সে সামনে চলে গিয়েছে। হেঁটে একটা বাঁক ঘুরেই দেখলাম সে হলিউডের ছবির নেকড়েদের মত মাথা উছু করে বসে আছে। তাকে মাশ কাটিয়ে হেঁটে যাওয়া মাত্রই সে আবার আমাকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেল। কিছু কিছু জায়গার নিমাহ আমাদের শর্টকাট দিয়ে নিয়ে গেল, কিন্ত আমি দেখলাম সেই কুকুরটা রেগুলার ট্রেইলেই দৌড়ে আমাদের আগেই পৌঁছে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আগে কোথাও একা হয়ে গেলে আগে নিমাহর লাল জ্যাকেট খুজতাম দৃষ্টি সিমানায়, এখন খুঁজি সেই চার পেয়ে গাইডকে। এমনকি একবার কুকুরটাকে দেখতে না পেয়ে আমি উল্টা নিমাহকে জিজ্ঞেস করলাম সে কই, নিমাহ হেসে হেসে বলে আছে সামনেই আছে, জায়গা মত কোন এক বাঁকের মাথায়, এবং ঠিক তাই।

যেই পানির আতঙ্কে ফালুট ট্রেইলে আজাইররা ৩লিটার পানি বহন করলাম সেই ট্রেইলেই সত্যি কথা বলতে পানি খেয়েছি মাত্র একবার। আসলে ট্রেইলে একটু পর পর মেঘ এসে ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, মেঘ চলে গেলেই রোদ, আবার মেঘের ঝাঁপটা, সে জন্যই হয়ত ঘেমেছি কম তাই পিপাসা ও লাগেনি আর অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেখতে যাওয়ার মাঝে হয়ত ওটা একটা মামুলি বিষয় হয়ে দাড়িয়েছিল। আমাদের একটা তাড়া ও ছিল, অন্ধকার নামার আগেই ফালুট পৌঁছান তাই এখানে ছবি কম – দ্রুত হাটা স্ট্র্যাটেজিতে হেঁটেছি – আর কুকুরটা পাশে থাকায় একটা এক্সট্রা এনার্জি পেয়েছিলাম, যদিও মনস্তাত্ত্বিক।

সান্দাকফু ট্রেইলে লোকালয়য়ের চিহ্ন হচ্ছে কোথাও গবাদি পশু চড়তে দেখা, ফালুটের আগে একটা যায়গার দেখলাম গলায় ঘন্টা বাধা ইয়াক, দেখেই মনটা আনন্দে নেচে উঠল, যাক হয়ত আর বেশী দূর না, কিন্ত না … (চৌধুরী জাফরুল্লাহ শরাফত)। হাঁটার এক পর্যায়ে ডানপাশে অনেক উচুতে একটা টিনের চালা ঝিক দিয়ে উঠল, নিমাহ বলল ঐটাই ফালুট। থেকে থেকে ডানদিকে থাকিয়ে দেখি ঐযে ফালুট আর রুবেল ভাই কে দেখিয়ে বলি, কিন্ত ফালুট আর শেষ হয় না। একটা একটা করে পর্বতের ঢাল পার হই আর মনে হয় এটাই ফালুটের পর্বত, কিন্ত না মাঝে আর একটা – আর একটা পার হলে আবারও একটা।

এভাবে ফালুট পৌঁছাবার ঠিক আগে একরাশ ঠাণ্ডা ঝড়ো গতির মেঘ এসে আমাদের ঢেকে দিল, ঠাণ্ডায় পুরা কনকনানি অবস্থা, আমি ধিরে ধিরে উঠে যাচ্ছি, কিন্ত রুবেল ভাই অনেক পিছনে। শেষে রুবেল ভাই বলল আমাকে এগিয়ে যেতে, আগে বেডিং বুকিং দিতে। ফালুটের লজে আসার পর এতটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম যে ঘরের ভিতরে না ঢুকে বাইরেই দেয়ালে ঠেশ দিয়ে দাড়িয়ে থাকলাম, আর রুবেল ভাই এর জন্য অপেক্ষা।

ফালুট

ফালুট

ফালুটের ট্যুরিস্ট লজে ঢুকে দেখি ফ্লোরিং ত দুরের কথা – যেমন খুশি তেমন সাজো অবস্থা – সেই ফ্লোরিং এর ভয়ে কেউ আসেনি – পুড়ো লজে আমরা আর একটা সুইডিশ কাপল। যাক সবাইকে ফ্লোরিং এর জুজুর ভয় দেখানোটা কাজে লেগেছে (লোল)।

এখানে ডিনার করার পর দেখলাম রিতিমত শিলা বৃষ্টি নামল, টিনের চালে ঠাশ ঠাশ আওয়াজে মন চলেগেল আমাদের ময়মনসিং এর বাসায় যেখানে টিনের চালের সেই বৃষ্টি-শিলার আওয়াজে কাথামুড়ি দিয়ে জেঁকে ঘুমাতাম। মনে মনে একটা আশা নিয়ে ডাবল-রিডাবল লেপ আর কাথামুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম, কিন্ত আবার সেই না … ট্যুরিস্ট লজের সামনের দিকের রুমে আমাদের থাকা এবং জানালা গুলোতে কাচের শার্শি কাপিয়ে একটু পর পর সাইরেনের মত শব্দ করে ঝড়ো বাতাসের এক একটা ঢেউ একদম পাগল করে দিচ্ছিল আমাদের কারন কোন কাঠের জানালাইত এয়ার টাইট না, সুতরাং যখন বাতাসের তোড় আসে তখন রুমের ভিতরেও ঠাণ্ডার একটা হিমেল স্রোত বয়ে যায় যেটা ডাবল-রিডাবল কম্বলের ক্রিম-রোলকেও মামুলি পাতলা কাঁথা বানিয়ে দেয়। কেবল মাত্র শারীরিক ক্লান্তি ছাড়া সেই শোঁ শোঁ শব্দের হার-কাপানো ঠাণ্ডায় ঘুম আসা সম্ভব না, মনে মনে চিন্তা করলাম … যদি সত্যই ফ্লরিং করতে হতো তাহলে …!

ঘুম থেকে উঠে ঝটপট রেডি হয়ে ক্যামেরা নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। ফালুট ট্রেকারস লজটা ফালুট পর্বতের চূড়ার একটু নিচে রাস্তার সাথে লাগোয়া করে বানানো, তাই সাত-সক্কালেই আবার ট্রেকিং করে উপরে উঠা। এখানেও একটি রাস্তা পাথর দিয়ে সাজিয়ে একেবেকে উপরের দিকে উঠে গিয়েছে, কিন্ত আমি আর ট্রেইল ফলো করলাম না, সোজা শিশির ভেজা সবুজ ঘাস মাড়িয়ে শর্টকাটে উঠে শুরু করলাম। কিছুদুর যাবার পর প্রচণ্ড পানি পিপাসা লাগলো কিন্ত পানি ত সাথে নিয়ে উঠিনি! পিছনে গাইড আর রুবেল ভাই অনেক দূরে … চিন্তা করতে করতে আশেপাশে তাকিয়ে দেখি এতক্ষন ঘাসের উপরে সেই সাদা সাদা বড় বড় জিনিস গুলো মাড়িয়ে এসেছি – এগুলো আসলে গতকালের শিলা বৃষ্টির বরফ, ঠাণ্ডার জন্য একদম অবিকৃত অবস্থায় আছে। আর যায় কই, একে একে টপাটপ বরফ মুখে পুড়ে দিয়ে তেষ্টা কমালাম।

কিছু উপরেই একটা সিমানা পিলার যার একপাশে নেপাল – যেদিকে আমি যাচ্ছি কাঞ্চনঝঙ্গার দিকে, ডান পাশে সিকিম আর পিছনে-বামে ভারত – অবশ্য সিকিম ত ভারতেরই অংশ তার পরও সিমানা পিলারে লিখা আছে। এর কাছেই একটা ছোট্ট বৌদ্ধ মন্দির – আলগা পাথর দিয়ে ছোট্ট একটা তাবুর মত করে বানানো – এর পাশে এক পাহাড়িকে দেখলাম মবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়ার চেষ্টা করছে, এখান থেকেই হয়ত নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। এর একটু সামনে গিয়ে দেখলাম ফালুট পর্বতের মাথায় সেই সুইডিশ কাপল একে-অপরকে কাভার করে বসে বসে চা খাচ্ছে আর কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে আছে যদি দেখা দেয়, আমিও পাশের ঢালে ক্যামেরা নিয়ে রেডি … মিনিটের পর মিনিট চলে গেল খোদ এক ঘন্টার মত দাড়িয়ে ছিলাম সেখানে কিন্ত ৪০ কিলো দূর থেকে কাঞ্চনের দেখা আর পেলাম নাহ, সবার সব আশাই পুরন হয় নাহ ।

গোরখে থেকে রামাম হয়ে রিম্বিক
গোরখেঃ-
ফালুট থেকে প্যানকেইক দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে আমরা গোরখের দিকে রওনা দিলাম। এই ট্রেইলটা ফালুট ৩৬০০ মিটার থেকে আমাদের সিঙ্গারিলা ন্যাশনাল পার্কের পাশ দিয়ে ২২০০ মিটারে অবস্থিত গোরখে তে নিয়ে যাবে। যাবার পথে এস-এস-বি ক্যাম্পে আমাদের পাসপোর্ট এন্ট্রি করার সময় আমরা মুসলমান দেখে তারা একজনকে ডেকে আনল – লোকটা বোধয় সেই ক্যাম্পে একমাত্র মুসলমান – আমাদের সাথে অনেক্ষন কথা হল, সে তার কাশ্মীরে থাকার কাহিনি আমাদের সাথে শেয়ার করল। ইচ্ছে করেই গল্প করে এখানে একটু বেশি সময় ব্যায় করেছিলাম এই উদ্দেশ্যে যদি কুয়াশা ফুঁড়ে কাঞ্চনঝঙ্গা দেখা যায়!

গুগল ম্যাপে গোরখে এর অবস্থান

সিঙ্গারিলা পার্ক ধরে গোরখের দিকে নেমে যাওয়া রাস্তাটা অসাধারন, ঘন-গহিন-বনের ভিতরে কোথাও মাটিকাটা – কোথাও পাথর সাজিয়ে ৬/৮ ফিট প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে হাঁটার আনন্দটা পরিপূর্ণ ভাবে নিতে পারছিলাম না, কারন রুবেল ভাই এর ব্যাথার পায়ে হাঁটার কথা চিন্তা করে। এই বনের ভিতরে নামার রাস্তা দিয়েও কৌণিক শর্টকাট আছে, আনোয়ার ভাই এর কুইক স্টেপ – কুইক রিলিস স্ট্র্যাটেজিতে খাঁড়া নেমে আমি মুল রাস্তার কিছুক্ষণ বিশাম নেই, ততক্ষণে রুবেল ভাই মুল রাস্তা ধরে চলে আসে। অসাধারন অসাধারন এক অনুভুতি এই বনের ভিতর দিয়ে ট্রেকিং করার, আর রাস্তাটা এতটাই মসৃণ যে কেউ ফালুট থেকে সাইকেলে উঠলেই হবে, তার আর প্যাডেল দিতে হবে না, মুল রাস্তাটা ধিরে ধিতে ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমে গিয়েছে।

গোরখে নামার ঠিক আগে একটা খাঁড়া জিক-স ZzZ কৌণিক রাস্তা নেমে গিয়েছে, এই নামাটা একটু অন্য রকম ছিল। নামছি আর পাইন বনের ভিতরে একটি ঝরনার ধারে গরে উঠা গোরখে কে চেটে চেটে দেখে ছবি তুলছি, মিরিকের মত এই জায়গাটাতেও আমি পূর্ণ একদিন থাকার ভবিষ্যৎ প্ল্যান করে ফেললাম।

গোরখে

গোরখে

নিচে নেমেই আমি ঝরনার ছবি তুলতে ব্যাস্ত হয়ে গেলাম কিন্ত খাবার জন্য লজে ফিরে এসেই দেখি রুবেল ভাই ব্যাথায় শুধু খালি শব্দ করছে না, কিন্ত চেহারাই বলে দিচ্ছে ব্যাপারটা কতটুকু মারাত্মক। আমরা নিমাহ কে অনুরোধ করলাম একটা ঘোড়ার ব্যাবস্থা করে দিতে, সে ৫০০ রুপি দিয়ে রুবেল ভাই এর জন্য একটি ঘোড়ার ব্যাবস্থা করে দিল, যেটি আমাদের পরবর্তী ডেস্টিনাশান রামাম পর্যন্ত নিয়ে যাবে। খেয়েদেয়ে আমরা হাটা আর রুবেল ভাই ঘোড়ায় চড়ে রামামের দিকে উঠে যাওয়া, পথটা সত্যিই অসাধারন, কত আর ছবি তুলব আর ক্যামেরায়েই বা কটটুকু আসবে, কিন্ত জান্তব চোখে দেখে দেখে সুবহানআল্লাহ পড়তে পড়তে সিঙ্গারিলা রেঞ্জের ভিতর দিয়ে – বিশাল বিশাল পাইন বনের মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলার বর্ণনা লিখে ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই।

 

রামামঃ- ২৫৬০মিটার

গুগল ম্যাপে রামাম এর

আমরা রামাম পৌঁছালাম সন্ধ্যা এক/দেড় ঘণ্টা আগে, রামাম ট্রেকিং লজের ভিতরে যাওয়া মাত্রই শুরু হল বৃষ্টি, অঝোর ধারায় বৃষ্টি। বৃষ্টির পরে একটু আলো আধারিতে চিন্তা করলাম ট্রাইপড দিয়ে কিছু দিগন্তের ছবি তুলি, কটেজের দোতলায় গিয়ে তিন-কোনা চিলে কোঠার চিপায় একটি জানালা দিয়ে দু জনে মিলে সেকি চেষ্টা অন্ধকারের পর্বতের ছবি তোলা। অবশ্য করার কিছুই ছিল না তাই কিছু করে সময় ব্যয় করা। অন্ধকার হবার পর ডিনারের আগে রুবেল ভাই এর পাশের জানালা দিয়ে দেখলাম পাহাড়ের এক কোনায় অনেক অনেক আলো ছড়িয়ে আছে, নিমাহ কে জিজ্ঞাস করলাম এটা কোথায় ? বলল এই আলো দারজিলিং এর, আমরা ত তাজ্জব, আমরা দারজিলিং এর এত কাছে! ডিনার ডাক পড়ার আগেই কিচেনে চলে গেলাম – কিচেনে যেতে কটেজ থেকে ২০ফিট উঠোন পার হয়ে যেতে হয় আর এই হাটায় আবার গা কাটা দিয়ে ঠাণ্ডা। কিচেনে গিয়ে চুলোর কাছে গুটিসুটি মেরে নিমাহ’র সাথে হিন্দি-ইংরেজি মিলিয়ে গল্প করতে থাকলাম। এরা দেখি লম্বা কেতলির আকৃতির পাত্রে লোকাল চোলাই বানায় আর গাইড বা লোকাল কাউকে পেলে সেধে দেয়, নিমাহ খেয়ে দেখি উহ হাহ করছে। কিছুক্ষণ পড়েই খাবার রেডি এবং আমারদের কটেজে দিদি খাবার নিয়ে গেলেন কষ্ট করে। ডিনার করে খুব একা একা লাগছিল মনে হচ্ছিল আরও কয়েকজন হলে আড্ডা দিয়ে এই রাতের কিছু সময় পার করা যেত … দুজনে দুজনে আর কত কথা …।

এখানে প্রথম দেখলাম স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ঘের দিয়ে গ্রিন হাউজের মত করে ছোট ছোট ফুলের বাগান করা । সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথম কাজ হচ্ছে ফুল কে ফোকাসে নিয়ে বোখে প্র্যাকটিস করা । এগুলো করতে করতে দেখি রোদ উঠে এক মায়াময় পরিস্থিতি। উঠনানের এক পাশে রোদ অন্যপাশে কটেজ কিচেনের পাশে ঝরনার কল আর পিছনে পাইনের বন … এখানেই কেন থেকে যাই না সারাটি জীবন। একটু পরে দেখি রুবেল ভাই উঠানের মাঝখানে টেবিল নিয়ে নাস্তা সহকারে বসে আছে, চেহারা দেখে বুঝলাম পা এর ব্যাথা লোকটাকে চরমভাবে ভোগাচ্ছে।

রামাম এ গ্রিন হাউজে ফুলের বাগান

রামাম এ গ্রিন হাউজে ফুলের বাগান

গতকাল বিকেলে রামাম পৌঁছে আমাদের প্রথম দেখা হল এক কলকাতার পরিবারের সাথে। কটেজে ঢুকার আগেই দেখি যথেষ্ট লম্বা একটি মোটাগাটা মেয়ে স্কুলের ছোট্ট একটি ফ্রক পরে আমাদের কাছে এসে বলছে – তোমাদের কাছে কোন এন্টিসেপ্টিক আছে ? – তুমি সম্বোধন শুনে পূর্বের মত কিছুটা ভরকে গেলাম। অবশ্য কলকাতার ট্রেন্ড এটি যে আগন্তক কে তুমি বলে সম্বোধন করা। আমরা কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বললাম না নেই। তখন বুঝলাম আসলে অন্তত হেক্সাসল টাইপের কিছু সাথে আনা উচিত ছিল। না, সেই ক্যালকেশিয়ান কিশোরীর জন্য নয় – নিজেদের জন্যই।

এই পরিবার দেখলাম রাতে বেশ হল্লা করে ডিনার করছে – আমর তখন চুলোর পারে নিমাহ্ র গল্প শুনছি । সকালে পরিবারের হোতা বেশ বয়স্ক কিন্ত দেখে বোঝা ভার স্মার্ট ভদ্রলোক এসে বললেন দাদা আপনারা কোথায় যাচ্ছেন – বললাম রিম্বিক হয়ে দার্জিলিং । শুনেই প্রস্তাব দিলেন উনি যে আমরা যেন শেয়ারড গাড়িতে তাদের নিয়ে দার্জিলিং যাই তাতে সবার খরচ একটু কম হয়। রাজি না হবার কিছু নেই তবে যা হল তা হচ্ছে এদের সাথেই ট্রেকিং করে রিম্বিক পর্যন্ত যেতে হবে, মনে মনে প্রমাদ গুনলাম – কি জানি কি হয়।

 

রিম্বিকঃ-

গুগল ম্যাপে রিম্বিক এর অবস্থান

রামাম থেকে সকালে বাকরখানি ডিজাইনের নরম পুরি টাইপের রুটি আর ডিম অমলেট খেয়ে রিম্বিকের পথে রওনা দিলাম।
সাথে সেই কলকাতার ফ্যামিলি, সবার আগে চলছে সেই কিশোরী যিনি ক্লাস ৭ এ পড়েন, ট্রেকিং করছেন ঢোলা একটি ট্রাউজার আর একটি লম্বা কামিজ পড়ে হেঁটে চলেছেন সবার আগে। গ্রুপের সবার আগে অমি তারপরে হ্যা মেয়েটার নাম তনু আর পরে রুবেল ভাই নিমাহ আর তনুর পরিবার । কিছুদূর ট্রেকিং করার পরে দেখলাম অমি রুবেল্ভাই আর তনু আর নিমাহ ছাড়া আশে পাশে আর কেউই নেই , বাধ্য হলাম থামতে। এইটাকে নিয়ে গেলে হবে পরিবারের সাথে বিশাল দূরত্ব থামলে সময় নষ্ট। কিন্ত কি আর করা পুরো পরিবার এলো এবং আবার ট্রেকিং।

শ্রীখোলা

শ্রীখোলা

রিম্বিক যাবার পথে কিছু ছোট ছোট গ্রাম ক্রস করেছি আমরা – আর সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে আমরা যেই পাহাড়টা ধরে নেমে যাচ্ছি তার পাশের পাহাড়টাই সিকিম, অনেক লোকালয়, মোবাইলের টাওয়ার একটু ভিন্ন ভাবে তৈরি করা ঘর বাড়ি দেখে দেখে নেমে যাচ্ছি শ্রীখোলা ঝরনার দিকে, এই ঝরনার উপর দিয়ে একটা কাঠের তার টানা ব্রিজ আছে যার উপরথেকে পুরো ঝরনাটা আর উপত্যকাটার একটা বর্ণনাতীত দৃশ্য পাওয়া যায়। রামাম থেকে রিম্বিক যাবার দুটি পথ আছে, একটি শর্টকাট আর একটি শ্রিখোলা হয়ে । নিমাহ আমাদের শর্টকাট দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে , যাবার পথে দেখি ছোট ছোট ঘর বাড়ি কটেজ আর কি সুন্দর সুন্দর ফুলের বাগান, ছবি তুলে চুলে আর শেষ হয় না, মনে হয় আর একটা তুলি – আর একটা তুলি।

কিছুদূর যাবার পরে এলো সেই শর্টকাট যা জিক স পাজলের মত নেমে গিয়েছে শ্রিখোলা ঝরনায়। এবার রুবেল ভাই এর পা এর উপরে প্রেশার শুরু হল এবং নিমাহ্র সাথে অনেক আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে নেমে আসলেন। এত আস্তে এত সময় ব্যয় করে নিচে নামার পরেও দেখি তনুর ফ্যামিলির খবর নেই। পাক্কা ৩০ মিনিট অপেক্ষা করার পরে দেখি তনুর চাচা সবার আগে এলেন – উনাকে বুঝিয়ে দিয়ে আমরা হাফ ছেড়ে সিপ্পির দিকে উঠা শুরু করলাম। সিপ্পি উঠে প্রথম দেখলাম থামস আপ – স্লাইস আর বাংলাদেশে পাওয়া যায় না এবং সব কোমল পানীয় নিয়ে এক কটেজের দোকান – অমি নিলাম থাম্বস আপ আর রুবেল ভাই লিমকা।

শ্রীখোলা থেকে উপরে উঠলেই সিপ্পি অবস্থান, দেখলাম সেখান থেকে একটা পুরোদস্ত গাড়ীর রাস্তা সোজা রিম্বিকের দিকে গিয়েছে। নিমাহ সেই রামাম থেকেই একটা গাড়ী আমাদের জন্য রিজার্ভ করে রেখেছিল যেটা আমাদের রিম্বিক থেকে মানেভাঞ্জান হয়ে দারজিলিং নিয়ে যাবে, কিন্ত আগে জানলে গাড়িটাকে সিপ্পি পর্যন্ত এনে চড়ে বসতাম।

সিপ্পি থেকে রিম্বিক যাবার পথে একটু পরে পরেই অসংখ্য ট্রেকারস লজ দেখলাম, রিতিমত অত্যাধুনিক স্থাপনা। বোঝাগেল অসংখ্য ট্যুরিস্ট আসে এখানে। রিম্বিক পৌঁছে আমরা আবার এন্ট্রি করলাম এবং এখানেও কোন বাংলাদেশির এন্ট্রি পাইনি। এখানেই লাঞ্চ হিসেবে পেলাম ‘মোমো’ নামে একটি খাবার। অনেকটা D আকৃতির সমুচার ভিতরে বাধাকপি ভেজে হালকা ভাপে সিদ্ধ করা ৭ পিস আর সাথে একটা অমৃত স্যুপ। খেতে এতটাই সুস্বাদু লেগেছিল যে গাড়ীর তারা না থাকলে আমি আরও দুই তিনটা প্লেট মেরে দিতাম।

 

রিম্বিক

রিম্বিক

দার্জিলিং
রিম্বিক থেকে দার্জিলিং যেতে গেলে আপনাকে আবার মানেভাঞ্জান হয়েই যেতে হবে আর এই পথ টুকু রোমাঞ্চে ভরা। বর্ণনা করে কোন ভাবেই বোঝানো সম্ভব নয় যে এই উঠা এই নামা ঘন গহিন পাইন বনের ভিতরে চলা আর সাথে রোমান্টিক সব গান। মানেভাঞ্জান পৌঁছে নিমাহ কে নামিয়ে দিলাম এবং শুঁকিয়া পোখারি পৌঁছাবার পরে দেখলাম এমন কুয়াশা জেঁকে বসল যে গাড়ির ভিতর থেকে ১০ ফিটের পরে কিছু দেখা যায় না অথচ গাড়ি চলছে ৫০/৬০ কিলো তে । দোয়া দুরুদ কালিমা যা আছে মনে সব পড়তে থাকলাম মনে মনে আর বাইরে চেহারায় I am enjoying টাইপের ভাব নিয়ে থাকলাম।

গুগল ম্যাপে দার্জিলিং এর অবস্থান

অবশেষে দার্জিলিং এলাম কিন্ত রুবেল ভাই এর পা এর ব্যাথা চূড়ান্ত পর্যায়ে – বেচারা গাড়ি থেকে নামতেও পারছিল না। ড্রাইভার কে বললাম ভাই কোন ফার্মেসির কাছে নামিয়ে দিতে – শুনে বললেন যে দার্জিলিং এ সব জায়গায় সব গাড়ি ঢুকতে পারে না – আসলেও তাই । ফার্মেসি খুঁজতে গিয়ে পড়লাম এক দালাল এর খপ্পরে – সে আমাদের অবশ্য উপকার ই করছে। কাছের ফার্মেসি কে গিয়ে ডাক্তার খুঁজে পাইনি তাই হোটেলে চলে এলাম – হোটেল নিউ সাথী  – নেপালি মালিক কথা বলেন হিন্দি তে। একটি ডাবল রুম ভাড়া নিলেন ৮০০ রুপি। আসলে পরিস্থিতি এমন যে অন্য কোথাও চেক করার উপায় নেই তাই উঠেই পড়লাম। ফ্রেশ হয়ে ফের গেলাম ডাক্তারের কাছে, ডাক্তার সাহেব দেখি পুরোদস্তর বাংলা বলেন ! সব কিছু দেখে তিনি ব্যাথা নাশক ট্যাবলেট আর একটি বায়োটিক দিলেন – একটি টেস্টও দিয়েছিলেন। অবাক ব্যাপার হচ্ছে সেখানে একটা সিপ্রো টাইপের এন্টি বায়োটিকের দাম ৬০ রুপি আর ঔষধের মোড়ক দেখলেও আপনার কিনতে ইচ্ছা করবে না, বাংলাদেশ সত্যি ঔষধ শিল্পে অনেক এগিয়ে।

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙ্গে, আর আমরা খাদক খুঁজে বের করলাম ইসলামিয়া হোটেল যেখানে হালাল খাবার পাওয়া যায় – মানে গরু। পুরো প্লেট ভরে গরুরগোস্তের বাসমতী চালের বিরানির দাম বলে ৪০ রুপি ! আবার জিগায় দু জনে চার প্লেট মেরে দিলাম। আমাদের খাওয়ার বহর দেখে দেখি এক ওয়েটার আমাদের টেবিলের পাশেই অবস্থান নিয়েছে – কখন কি অর্ডার দেই – দিচ্ছি ও যা মনে আসছে। দুর্ভাগ্য দুজনে পেট ফাঁপিয়ে খেয়েও ৫০০ রুপি বিল করতে পারলাম না।। আফসোস।

হিমালয়ান মাউন্টেইনিয়ারিং ইন্সটিটিউট, দার্জিলিং

হিমালয়ান মাউন্টেইনিয়ারিং ইন্সটিটিউট, দার্জিলিং

রুবেল ভাই এর পা এর ব্যাথা কিছুটা কমলে বের হলাম হোটেলের নিচের আশে পাশের জায়গায়। বিগ বাজার এর পশে দিয়ে নিচে নেমে দেখি সব  বন্ধ আর অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে ! কাহিনী হচ্ছে সন্ধ্যা ৭ টার পরে সব বাণিজ্যিক স্থাপনা বন্ধ, এটাই নিয়ম। আর যেই মাত্র মার্কেট বন্ধ সেই মাত্র রাস্তার ইটালিয়ান হকার গুলো জাঁকিয়ে বসেছে , এক একটি বিশাল তাওয়ার নুডলস, চিকেল পরোটা – ডিম বার্গার চিওমিন আরও কত কি। অমি গোগ্রাসে কিছু খেয়ে নিলাম। স্বাদ আহামরি কিছু না কিন্ত খারাপ লাগে নি। রাতে আবার ইসলামিয়া হোটেলে গেলাম – আমাদের দেখেই দেখি ওয়েটার একজন টেবিলের পাশে এসাইন্ড ! এবার খেলাম টিক্কা কাবাব ইত্যাদি তা ও বেশি বিল করতে পারিনি। হোটেল থেকে বের হয়ে ত পুরো অবাক ! রাস্তা চিনা না থাকলে আপনি পুরা ধরা – দোকান-পাট মার্কেট সব বন্ধ, রাস্তার লাইট ছাড়া সব অন্ধকার – মানে মনে হল রাত ১ টার কোন মফস্বল এলাকায় ঢুকে পড়েছি – অথচ রাত বাজে মাত্র নয়টা । যাই হোক ট্রেকিং বৈশিষ্ট্যে রাস্তা অনুমান করে হোটেলের দিকে হাটতে থাকলাম। গিয়ে দেখি হোটেলের শাটার লাগানো – কিঞ্চিত ভয় ই পেয়ে গেলাম – পরে দেখি না শাটারের নিচ থেকে আলো আসছে আর একটা ছোট ছেলে দাড়িয়ে আছে । আমাদের জন্যই নাকি শাটার এরকম করে বেচারা ২ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছে।

দার্জিলিং নিয়ে মনে হয় আমার চাইতে অনেক অনেক বেশি তথ্য সবার জানা আর হয়ত অনেকেই লিখেছেন তাই এর বিশেষ বর্ণনায় আর গেলাম না তবে সকালে আমরা HMI তে গিয়েছি পরে কেবলকার এ চড়েছি এবং রাতে চৌরাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছি। পরের দিন শেয়ারে ১২০ রুপিতে জিপে শিলিগুড়ি পৌঁছে ২টার শ্যামলীর বাসে করে বাংলাদেশ প্রত্যাবর্তন করেছি।

এই ট্যুরের কাহিনী ২০১২ সালের এবং লিখা সেই বছরই- সামহোয়্যার ইন ব্লগে প্রথম প্রকাশিত হয়  আর এর পরে এই লিখায় অনেক সংযুক্তি করেছি ধারা বর্ণনায় কিছু যোগ করে। আসলে সময়ের সাথে সাথে স্মৃতি মুছে যেতে থাকে তাই শেষ এডিটিং ২০১৪ এর সেপ্টেম্বারে এসে হয়ত অনেক কিছু মনে পড়ছে না – তবে তার জন্য আফসোস নেই । ট্রেকের কিছু স্মৃতি ট্রেকেই থাকা ভালো যাতে বার বার গিয়ে তা রোমন্থন করা যায়।

আবার বলছি মুল লিখাটি ২০১২ সালে লিখা তাই অনেক ইনফরমেশান পুরনো, সুতরাং নতুন করে তথ্য যাচাই করে নিতে পারেন অথবা কমেন্টে উল্লেখ করতে পারেন। অসংখ্য বানান ভুল আছে, থাকাই স্বাভাবিক কারণ এই লিখা কাউকে দিয়ে প্রুফ রিডিং করিয়ে নেই নি বা প্রয়োজন মনে করিনি, অমি মনে করি আমার নিজের ভুল-ভাল অলঙ্করনহহীন বর্ণনা তে সহজ স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় যা বলতে চেয়েছি তাই হয়ত আপনাদের স্পর্শ করে যাবে। আর লিখার ভিতরে তথ্য বিভ্রাট থাকলে দয়া করে কমেন্টে লিখে দিবেন, অমি অবশ্যই শুধরে নিব।